কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইসলাম একটি সংখ্যালঘু ধর্ম। মূলত তেল শিল্পে কর্মরত বিদেশি প্রবাসী কর্মী, বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের হাত ধরেই দেশটিতে ইসলামের বিস্তার ঘটেছে। ২০১২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির আদি বাসিন্দাদের মাত্র ২ শতাংশ মুসলিম।
হাই ইসলামিক কাউন্সিল অব কঙ্গোর দাবি, বিদেশি নাগরিকদের হিসাবসহ মোট ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশই মুসলিম। অর্থাৎ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চেয়ে বিদেশি শ্রম অভিবাসনের মাধ্যমেই সেখানে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানকার মুসলিমদের প্রায় সবাই সুন্নি মতাদর্শী। ঔপনিবেশিক আমলে পশ্চিম আফ্রিকান অভিবাসী ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটলেও খ্রিষ্টান এবং ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী বান্টু-সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাঝে এই ধর্মের বড় কোনো রূপান্তর ঘটেনি।
কঙ্গো একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। দেশটির সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ। হাই ইসলামিক কাউন্সিল অব কঙ্গোর মতো সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এখানকার মুসলিমরা রমজান পালনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। পাশাপাশি তারা খ্রিষ্টান সংগঠনগুলোর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের কিছু কড়া নিয়মও রয়েছে।
যেমন, আঞ্চলিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে জনসমক্ষে নিকাব বা বোরকার মতো পুরো মুখ ঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশি মুসলিমদের মসজিদে রাত কাটানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত হতে হয়। তবে দেশটিতে মুসলিমদের ওপর পদ্ধতিগত কোনো নিপীড়নের খবর পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশী দেশগুলোর সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তুদের একটি বড় অংশ মুসলিম, যা মোট আশ্রয়প্রার্থির প্রায় ১৫ শতাংশ।
সূচনা ও ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাস
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইসলামের আগমন ঘটে। ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে চাদের মতো মধ্য আফ্রিকান অঞ্চল এবং পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রথম ইসলামের আগমন ঘটে। প্রথমদিকের এই মুসলিমরা মূলত বাণিজ্যকেন্দ্র ও শহরাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) আরব-সোয়াহিলি বাণিজ্য রুটের মাধ্যমে ইসলামের যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল, তার চেয়ে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। এখানকার মুসলিমরা মূলত সাহেলীয় অঞ্চল থেকে স্থলপথে অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন।
ফরাসি ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ সেনেগাল, মালি বা বেনিনের মতো মুসলিম প্রধান অঞ্চল থেকে কঙ্গো-ওশেন রেলওয়েসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য শ্রমিক, সৈনিক ও কেরানি নিয়োগ করে। এই শ্রমিকরাই ব্রাজাবিল এবং পোয়াঁত-নোয়ারের মতো শহরগুলোতে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভিত্তি গড়ে তোলেন।
ফরাসি শাসকেরা ইসলামের প্রতি এক ধরনের বাস্তবসম্মত সহনশীলতা দেখালেও স্থানীয়ভাবে কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা করেনি। ফলে ২০ শতকের আগ পর্যন্ত নামাজ বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মূলত ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যদিকে খ্রিষ্টান মিশনারিদের ব্যাপক প্রচারণার কারণে ১৯৫০ সালের মধ্যেই দেশের একটি বড় অংশ খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে।
স্বাধীনতার পর ও বর্তমান পরিস্থিতি
১৯৬০ সালের ১৫ আগস্ট ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পরও কঙ্গোয় মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে সীমিত। ১৯৬৯ সালে মারিয়েন নগুয়াবির নেতৃত্বে দেশটিতে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সব ধরনের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর কড়া নজরদারি ও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, যা ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তবে ১৯৯০-এর দশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা এবং ১৯৯২ সালের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহালের পর মুসলিম জনসংখ্যায় কিছুটা গতি আসে। তেল শিল্পের বিকাশ এবং আরব দাতাদের সহায়তায় শহরাঞ্চলে নতুন নতুন মসজিদ গড়ে ওঠে।
কঙ্গোর মুসলিমরা মূলত ব্রাজাবিল এবং পোয়াঁত-নোয়ারের মতো বড় বড় শহরেই বেশি বসবাস করেন। গ্রামীণ অঞ্চলে মুসলিমদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। স্থানীয় মুসলিমদের চেয়ে মালি, বেনিন, টোগো, মৌরিতানিয়া ও লেবানন থেকে আসা অভিবাসীদের সংখ্যাই এখানে বেশি। এখানকার মুসলিমরা সুন্নি ইসলামের মৌলিক পাঁচ স্তম্ভ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।
হাই ইসলামিক কাউন্সিল অব কঙ্গো (সিএসআইসি) দেশটির মুসলিমদের প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ব্রাজাবিল মুসলিম নারী সমিতির মতো সংগঠনগুলো নারীদের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
কঙ্গোয় সুন্নি মুসলিমদের আধিপত্য থাকলেও শিয়া বা অন্য কোনো উপদলের উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। সামান্য কিছু মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও কঙ্গোয় শিয়া-সুন্নি কোনো বড় ধরনের সংঘাত বা সহিংসতার ইতিহাস নেই।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ
খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ধর্মীয় সহনশীলতা বেশ চমৎকার। মুসলিম, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে কোনো ধর্মীয় সহিংসতা ঘটেনি। তবে কঙ্গোয় খ্রিষ্টানরা যেভাবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নানা ক্ষেত্রে (যেমন সামরিক বাহিনী বা হাসপাতালে ধর্মযাজক নিয়োগ) বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে, মুসলিমদের ক্ষেত্রে তা এখনো অনুপস্থিত।
সূত্র : গ্রোকিপিডিয়া
এনটি
