বিজ্ঞাপন

কলম্বিয়ায় যেভাবে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছেন মুসলিমরা

কলম্বিয়ায় যেভাবে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছেন মুসলিমরা

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এক সোনালী ব্যবসায়িক সময় পার করার পর তীব্র মন্দার মুখে পড়েছিল কলম্বিয়ার আরব সম্প্রদায়। আমদানি পণ্যের ওপর সরকারি কড়াকড়ি এবং সীমান্ত পারাপারে কড়াকড়ি আরোপের কারণে একসময় তাদের ব্যবসায়িক আধিপত্যে ধস নামে। তবে দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে কলম্বিয়ার মুসলিম ও আরব জনগোষ্ঠী এখন আবারও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।

পশ্চিম বোগোতার এক তপ্ত শুক্রবারের দুপুর। আবাসিক এলাকার একটি সাধারণ ভবনের ওপর তলায় ছোট্ট একটি মসজিদে স্থানীয়দের স্বাগত জানাচ্ছিলেন তরুণ ইমাম আহমদ জিয়ান জিমেনেজ। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতার এই ‘আল-কুরতুবি সেন্টার অব ইসলামিক স্টাডিজ’ মূলত একটি সাধারণ বাসা, যা এখন ব্যবহৃত হচ্ছে মসজিদ হিসেবে। জুমার নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লিদের উপস্থিতিতে নীল রঙের ছোট্ট ঘরটি কানায় কানায় ভরে ওঠে। ইমাম যখন খুতবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখন ভবনের চারপাশজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল আজানের সুমধুর ধ্বনি।

২২ বছর বয়সী তরুণ ইমাম জিমেনেজ মিম্বরের সামনে একটি রিং লাইট বসিয়ে তার স্মার্টফোনটি সেট করলেন, উদ্দেশ্য জুমার খুতবাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করা। চোখ বন্ধ করে আরবি ভাষায় খুতবা দেওয়া শুরু করলেন তিনি। তার সামনে বসা মুসল্লিদের কাতারটি ছিল বৈচিত্র্যময়—সেখানে ছিলেন ভেনিজুয়েলা, জর্ডান, কলম্বিয়া, আফগানিস্তান, আর্জেন্টিনা ও পাকিস্তানের নাগরিকরা। তবে জিমেনেজ যখন আরবি ছেড়ে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলা শুরু করলেন, ঠিক তখনই মুসল্লিদের মনোযোগ আরও বেড়ে গেল। খুতবার একপর্যায়ে জিমেনেজ প্রশ্ন ছুড়ে দেন, কলম্বিয়ায় কেন মুসলমানরা বসবাস করছেন?

শতভাগ ক্যাথলিক প্রধান দেশ কলম্বিয়ায় মুসলিমরা অত্যন্ত সংখ্যালঘু হলেও এই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা এখন নিয়মিতভাবে বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ রাজধানীর মসজিদের সংখ্যা। ২০০৭ সালেও বোগোতায় মাত্র একটি মসজিদ ছিল, অথচ আজ শহরের প্রধান প্রধান এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে আছে ছয়টি মসজিদ।

প্রথাগত থব এবং মাথায় ইমামাহ পরিহিত তরুণ ইমাম মিডল ইস্ট আইকে বলেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও কলম্বিয়ার অধিকাংশ মুসলিম ছিলেন অভিবাসী। কিন্তু আজ এখানকার মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই স্থানীয় বা কলম্বিয়ান বংশোদ্ভূত।

কলম্বিয়ায় আরব অভিবাসনের ইতিহাস

কলম্বিয়ায় আরবদের আসার ইতিহাস বেশ পুরোনো। উনিশ শতকের শেষের দিকে যখন মধ্যপ্রাচ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়, তখন প্রথম দফায় আরবরা কলম্বিয়ায় আসতে শুরু করেন। বর্তমান লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চল থেকে উন্নত জীবনের আশায় লাখ লাখ মানুষ জাহাজে চড়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলে এসে পৌঁছান। ধারণা করা হয়, ১৮৬০ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ আরব ভেঙে পড়া অটোমান সাম্রাজ্য ছেড়ে আমেরিকার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন।

তাদের একটি ছোট অংশ কলম্বিয়ায় প্রবেশ করেন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন লেবানিজ। তারা দেশটির উত্তরের শহর ব্যারানকুইলা ও মাইকাওতে বসতি স্থাপন করেন। ১৮৮০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ৩০ হাজার লেবানিজ কলম্বিয়ায় অভিবাসী হন।

ফরাসি ইনস্টিটিউট ফর অ্যানাটোলিয়ান স্টাডিজের গবেষক ডিয়েগো কাস্তেলিয়ানোস বলেন, অটোমান সাম্রাজ্যের শেষের দিকে কলম্বিয়ায় আসা আরব অভিবাসীদের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। ফলে তারা তাদের ঐতিহ্য ও রীতিনীতি অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেই সময়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মতো বড় কোনো গোষ্ঠী ছিল না।

তবে সেই ধারাবাহিকতা ফিরে আসে ১৯৭০-এর দশকে, যখন লেবাননে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে বাঁচতে দ্বিতীয় দফায় বহু লেবানিজ কলম্বিয়ার পথ ধরেন। পূর্ব পরিচিত আত্মীয়-স্বজনদের সহায়তায় তারা মূলত কলম্বিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত শহর মাইকাওতে এসে জড়ো হন। কাস্তেলিয়ানোস ব্যাখ্যা করেন, মাইকাও শহরটি তখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, যা নতুন অভিবাসীদের কাছে দারুণ এক সুযোগ ছিল। সেখানে এসে দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হওয়া সহজ ছিল।

এক সমৃদ্ধশালী সমাজ

দখুব দ্রুতই মাইকাও হয়ে ওঠে কলম্বিয়ার মুসলিম ও আরব সম্প্রদায়ের মূল কেন্দ্র। লেবানিজদের এই আগমনী সময়টা কাকতালীয়ভাবে ভেনিজুয়েলার তেলের সুবর্ণ সময়ের সাথে মিলে যায়। ফলে সীমান্ত শহর মাইকাও দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে চাঙা হয়ে ওঠে। কাপড়ের ব্যবসা থেকে শুরু করে সুগন্ধি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজারে আরবদের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়।

নব্বইয়ের দশকে এই আরব সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা মাইকাও শহরে প্রায় ৫ থেকে ৮ হাজারে গিয়ে পৌঁছায়। ১৯৮৭ সাল থেকে মাইকাওতে থাকা লেবানিজ ব্যবসায়ী নাসের গেবারা বলেন, নব্বইয়ের দশকে মাইকাওতে মুক্ত বাণিজ্য ছিল, প্রচুর কাজের সুযোগ ছিল এবং আমাদের সম্প্রদায়টি ছিল অনেক বড়।

এই সমৃদ্ধিরই ফলশ্রুতিতে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় ‘ওমর ইবনে খাত্তাব’ মসজিদ, যা পুরো লাতিন আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি এই দৃষ্টিনন্দন মসজিদের মিনারটি শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে চোখে পড়ে। বলা হয়ে থাকে, এটিই কলম্বিয়ার একমাত্র মসজিদ যেখানে প্রকাশ্যে আজান দেওয়ার অনুমতি রয়েছে।

এর পাশাপাশি সেখানে গড়ে ওঠে ‘দারুল আরকাম’ স্কুল, যার পাঠ্যসূচিতে আরবি ভাষা ও ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। নব্বইয়ের দশকে এই স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছিল, যাদের প্রায় সবাই ছিল আরব সন্তান। এছাড়া ২০২০ সালে লেবানিজ-কলম্বিয়ান বংশোদ্ভূত মোহামাদ জাফর দাসুকি মাইকাওয়ের মেয়র নির্বাচিত হন, যিনি কলম্বিয়ার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র।

চোরাচালান ও পতনের ধাক্কা

অবাধ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাইকাওতে এক ধরনের আইনহীনতাও ডেকে এনেছিল। ভেনিজুয়েলা সীমান্তের অবাধ যাতায়াত এবং তদারকিহীন বাণিজ্যের কারণে আশির ও নব্বইয়ের দশকে শহরের ভেতরে চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও অর্থ পাচারের এক বিশাল অবৈধ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।

গবেষক কাস্তেলিয়ানোস বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি এমন ছিল যে সেখানে বৈধ ব্যবসার পাশাপাশি অবৈধ অর্থনীতির সমান্তরাল বিকাশ ঘটেছিল এবং রাষ্ট্র সেখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে। শুরু হয় ব্যবসায়ী ও আরবদের টার্গেট করে অপহরণ ও চাঁদাবাজি। এর পরপরই ২০০০ সালের শুরুতে ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি ধসে পড়লে মাইকাওয়ের বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। কলম্বিয়া সরকারও সীমান্তে কঠোর নজরদারি শুরু করে এবং আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে।

নিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আরবরা মাইকাও ছাড়তে শুরু করেন। তারা কলম্বিয়ার অন্য শহর, পানামা কিংবা ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে চলে যান। অনেকেই আবার লেবাননে ফিরে যান। এক সময়ের জমজমাট দার আল আরকাম স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৪৭ জনে। মাইকাওতে এখন মাত্র এক হাজারের মতো আরব বাসিন্দা অবশিষ্ট আছেন।

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা স্থানীয় গবেষক পেদ্রো দেলগাদো বলেন, আমি এখন এই সম্প্রদায়কে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে দেখছি। মাইকাও তার পুরোনো গৌরব এবং আরবদের প্রতিনিধিত্ব করার মর্যাদা হারিয়েছে।

তবে যারা এখনো এই শহরে রয়ে গেছেন, তারা হাল ছাড়েননি। লেবানিজ ব্যবসায়ী নাসের গেবারা আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, আমরা আশা করছি পরিস্থিতি আবার আগের মতো ভালো হবে। এই আশাই আমাদের এত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও এখানে টিকিয়ে রেখেছে। আশা করি এই শহর আবার প্রাণ ফিরে পাবে এবং আমরা আবারও বড় হব।

এনটি

বিজ্ঞাপন