বিজ্ঞাপন

ইবনে বতুতা থেকে অটোমান যুগ

জাপানিরা যেভাবে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলেন

জাপানিরা যেভাবে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলেন

বিখ্যাত মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনিতে ‘তাওয়ালিসি’ নামে একটি দেশের উল্লেখ পাওয়া যায়। চীন ভ্রমণের পথে তিনি এই অঞ্চলের একটি বড় বন্দরে নোঙর করেছিলেন। সেখানে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল এক নারী যোদ্ধার সঙ্গে, যিনি তুর্কি ভাষায় কথা বলতেন এবং চীনের সঙ্গে তাদের চলমান যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছিলেন।

গবেষকদের মধ্যে এই ‘তাওয়ালিসি’র অবস্থান নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। কেউ মনে করেন এটি ফিলিপাইন, কেউ ভাবেন ভিয়েতনামের চাম্পা অঞ্চল, আবার অনেকের দাবি এটি আসলে জাপান। বিখ্যাত গবেষক আবদুল হাদি আল-তাজি তার দীর্ঘ গবেষণায় বিভিন্ন এশীয় সূত্র ব্যবহার করেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। তবে তিনি একটি মজার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। একবার মরক্কোর এক মন্ত্রী যখন জাপানি মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন, তখন জাপানি মন্ত্রী তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, ইবনে বতুতার পর আমাদের দেশে আসা দ্বিতীয় মরক্কোবাসী হিসেবে আপনাকে স্বাগত।

যারা তাওয়ালিসিকে জাপান বলে মনে করেন, তাদের যুক্তি হলো, ইবনে বতুতার সফরের প্রায় ৪০ বছর আগে চীনের সঙ্গে জাপানের বড় ধরনের সংঘাত হয়েছিল। ফলে ইবনে বতুতার হাত ধরেই জাপানের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল কি না, সেই রহস্য আজও কাটেনি।

বিচ্ছিন্নতার যুগ পেরিয়ে জাপানে ইসলামের আলো ছড়ালো যেভাবে

ইবনে বতুতা জাপানে গিয়েছিলেন কি না তা নিশ্চিত না হলেও, তার প্রাচ্য সফরের প্রায় দুই শতাব্দী পর জাপানে ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারকদের আনাগোনা শুরু হয়। বহির্বিশ্বের এই প্রভাব থেকে নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিন্তো ধর্মকে রক্ষা করতে ১৬৩৯ সালে তোকুগাওয়া শোগুনতন্ত্র পুরো জাপানকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে জাপানিদের জন্য দেশের বাইরে যাওয়া এবং বিদেশিদের জন্য ভেতরে আসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

১৮৫৪ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর কমোডোর পেরি এক শক্তিশালী নৌবহর নিয়ে জাপানি জলসীমায় হাজির হন এবং জাপানকে বাণিজ্য চুক্তি করতে বাধ্য করেন। এই ঘটনার পর শোগুনদের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ১৮৬৮ সালে সম্রাট মিতসুহিতোর (সম্রাট মেইজি) নেতৃত্বে জাপানে এক নতুন যুগের সূচনা হয়, যা মেইজি পুনর্গঠন নামে পরিচিত।

এই মেইজি সংস্কারের হাত ধরেই জাপানের সামনে আবার ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আসে। নিজেদের আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে ১৮৭১ সাল থেকে জাপান পশ্চিমা বিশ্বে বিভিন্ন প্রতিনিধি দল পাঠাতে শুরু করে। এই সময়েই জাপানি কূটনীতিক ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি করেন এবং মুসলিম সমাজের জীবনযাত্রা দেখে মুগ্ধ হন।

অটোমান সাম্রাজ্য ও জাপানের বন্ধুত্ব

১৮৮০ ও ১৮৮৭ সালে জাপানি রাজপরিবারের প্রতিনিধিরা ইস্তাম্বুল সফর করেন এবং সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যদিকে সুলতান আবদুল হামিদও দূর প্রাচ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব বিস্তার ও জাপানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী ছিলেন। এই উদ্দেশ্য নিয়ে ১৮৮৯ সালে ‘আর্তুগ্রুল’ নামের একটি যুদ্ধজাহাজ জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দীর্ঘ ১১ মাসের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শেষে ১৮৯০ সালের জুনে জাহাজটি জাপানে পৌঁছায়। জাহাজের ক্যাপ্টেন আলী ওসমান পাশা এবং তার দলবলকে জাপানে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানানো হয়।

তিন মাস অবস্থান শেষে ওলটপালট আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও জাহাজটি ইস্তাম্বুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দুর্ভাগ্যবশত এক ভয়াবহ টাইফুনের কবলে পড়ে জাহাজটি ডুবে যায়। এই দুর্ঘটনায় ৫৮১ জন তুর্কি নাবিক মারা যান এবং মাত্র ৬৯ জন অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। জাপানি উপকূলের বাসিন্দারা তাদের উদ্ধার করেন এবং জাপানি নৌবাহিনীর জাহাজে করে তাদের সসম্মানে ইস্তাম্বুলে ফেরত পাঠানো হয়।

এই উদ্ধারকাজে যুক্ত থাকা নোদা শউতারো নামের এক জাপানি যুবক পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি সেখানে জাপানি ভাষা শেখাতেন এবং সম্ভবত তিনিই প্রথম জাপানি মুসলিম যিনি ইসলামকে নিজের জীবনধারা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

বিশ শতকের ভূরাজনীতি ও ইসলামের প্রসার

বিশ শতকের শুরুতে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জাপান এই দুই দেশে বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়ের সংস্পর্শে আসে। কৌশলগত কারণেই জাপানি নীতিনির্ধারকেরা ইসলাম ও মুসলিম সমাজ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

১৯০৩ সালে তাতার মুসলিম নেতা ও প্রখ্যাত আলেম আবদুর রশীদ ইব্রাহিম জাপানে আসেন। তিনি জাপানের বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহলে ইসলামের সমতা ও ন্যায়ের বাণী ছড়িয়ে দেন। তার হাত ধরেই বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী জাপানি সামরিক কর্মকর্তা ও চিন্তাবিদ ইসলাম গ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে মিৎসুতারো ইয়ামাওকা (ওমর ইয়ামাওকা) অন্যতম, যিনি পরবর্তীতে হজ পালন করেছিলেন।

১৯৩০-এর দশকে জাপানে ইসলামী গবেষণার এক স্বর্ণযুগ শুরু হয়। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এই সময়েই কোরআনের প্রথম জাপানি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সালে জাপানি ব্যবসায়ী ও সরকারের সহযোগিতায় নির্মিত হয় ঐতিহাসিক টোকিও মস্ক বা টোকিও জামে মসজিদ। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে জাপানে ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব নিয়ে প্রায় ১৬ হাজার গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল।

বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগ এবং তোশিহিকো ইজুতসুর উত্থান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর এই রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও ইসলামের প্রতি জাপানিদের বৌদ্ধিক আকর্ষণ কমেনি। এই ধারায় সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তোশিহিকো ইজুতসু। আবদুর রশীদ ইব্রাহিম এবং মুসা জারুল্লাহর মতো তাতার আলেমদের সান্নিধ্যে এসে তিনি আরবি ভাষা ও ইসলামী দর্শনে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

ইজুতসু পবিত্র কোরআনের ভাষাতত্ত্ব ও দর্শন নিয়ে এমন কিছু কালজয়ী বই লিখেছেন, যা আজও আরব ও মুসলিম বিশ্বের গবেষকদের কাছে সমাদৃত। তার ‘গড অ্যান্ড ম্যান ইন দ্য কোরআন’ বইটি এই ক্ষেত্রে একটি অনন্য সৃষ্টি।

পরবর্তী সময়ে নোবুয়াকি নোতোহারার মতো জাপানি গবেষকেরা আরব বেদুইন সংস্কৃতি ও মরুভূমির জীবনযাত্রা নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন। নোতোহারা মনে করতেন, জাপানের সবুজ পাহাড় আর চেরি ফুলের স্নিগ্ধতার বিপরীত মেরুতে থাকা আরব মরুভূমির রুক্ষ প্রকৃতি মানুষের টিকে থাকার এক ভিন্ন দর্শন শেখায়, যা জাপানিদের গভীরভাবে টানে।

সূত্র : আল জাজিরা

এনটি