বিজ্ঞাপন

ব্রাজিলে দাসপ্রথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল যে ‘ইসলামী’ গণঅভ্যুত্থান

ব্রাজিলে দাসপ্রথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল যে ‘ইসলামী’ গণঅভ্যুত্থান

ঊনবিংশ শতাব্দীতে আধুনিক মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রস্থল থেকে হাজার মাইল দূরে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে ঘটে গিয়েছিল এক অভূতপূর্ব ‘ইসলামী’ গণঅভ্যুত্থান। ১৮৩৫ সালে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বাহিয়ার স্যালভাদর শহরে বন্দি মুসলিম আফ্রিকান দাসদের সেই পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত বিদ্রোহ ইতিহাসে ‘মহাবিদ্রোহ’ বা মালি বিদ্রোহ নামে পরিচিত। প্রখ্যাত ব্রাজিলীয় ইতিহাসবিদ জোয়াও হোসে রেইসের লেখা ‘স্ল্লেভ রেবেলিয়ন ইন ব্রাজিল’ গ্রন্থে আদালতের পুরোনো নথিপত্র ও বন্দি বিদ্রোহীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে, যা লাতিন আমেরিকায় দাসপ্রথার ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক।

১৮৩৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পবিত্র রমজান মাসের এক রাতে স্যালভাদরের একটি নির্দিষ্ট বাড়ি থেকে একদল আফ্রিকান দাস আকস্মিক বিদ্রোহ শুরু করে। তারা দ্রুত স্থানীয় পুলিশকে পরাস্ত করে শহরের রাস্তায় নেমে আসে। প্রায় ৬০০ বিদ্রোহীর এই দল রাতভর পুরো শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোয় আক্রমণ চালায়। বিদ্রোহের মূল নেতৃত্বে মুসলিম আফ্রিকানরা থাকায় অনেক ইতিহাসবিদ একে ‘জিহাদ’ হিসেবে আখ্যা দেন। তবে অন্য একদল গবেষকের মতে, এই বিদ্রোহের পেছনে ধর্মীয় উপাদানের চেয়ে বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্যের ক্ষোভই ছিল প্রধান নিয়ামক।

ফরাসি উপনিবেশের বিরুদ্ধে হাইতির সফল দাস বিদ্রোহের (১৭৯১-১৮০৪) গল্প এই বিদ্রোহীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। সে কারণে তাদের অনেকের গলায় ছিল হাইতির প্রথম শাসক জঁ-জাক দেসালিনের ছবি সংবলিত লকেট। আবার একই সঙ্গে তাদের কাছে ছিল পবিত্র কোরআনের আয়াত লেখা বিশেষ তাবিজ, যা তৎকালীন পশ্চিম আফ্রিকার মালি অঞ্চলের মুসলিম সংস্কৃতির একটি বড় অংশ ছিল। 

মূলত স্যালভাদর শহরের নগর পরিবেশ এবং আফ্রিকা থেকে দলে দলে মুসলিম দাসদের নিয়ে আসার কারণে সেখানে গোপনে ইসলামের প্রসার ঘটেছিল। এই দাসদের অনেকেই আরবি লিখতে ও পড়তে পারতেন এবং তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আরবি ভাষা ব্যবহার করতেন। তারা গোপনে নিজেদের তৈরি নামাজঘরে ইবাদত করতেন, রমজানের রোজা রাখতেন এবং মিরাজের মতো ধর্মীয় উৎসবগুলো উদযাপন করতেন।

ইতিহাসবিদ জোয়াও হোসে রেইস তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন, এই বিদ্রোহের পেছনে ইসলাম এবং আফ্রিকান জাতিসত্তা কীভাবে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছিল। বিদ্রোহের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল রমজান মাসে এবং যোদ্ধারা ঐতিহ্যবাহী সাদা মুসলিম পোশাক পরে লড়াইয়ে নেমেছিলেন। তবে লেখক স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো শাস্ত্রীয় ‘ধর্মযুদ্ধ’ ছিল না। কারণ মুসলিম নেতৃবৃন্দ জানতেন, সফল হতে হলে অমুসলিম আফ্রিকান দাসদের সংহতিও প্রয়োজন। তাই তারা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নির্যাতিত সব আফ্রিকানের সম্মিলিত অধিকারের লড়াই হিসেবে একে তুলে ধরেছিলেন। ধর্ম এখানে ভিন্ন ভিন্ন আফ্রিকান নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে এক সুতোয় বাঁধতে সাহায্য করেছিল।

তবে দুর্ভাগ্যবশত, কাঙ্ক্ষিত সেই পূর্ণাঙ্গ জাতিগত ঐক্য গড়ে ওঠেনি। বিদ্রোহীদের বড় অংশই ছিল ‘নাগো’ এবং ‘হাউসা’ সম্প্রদায়ের। ফলে পুরো বিদ্রোহটি মূলত নাগোদের বিদ্রোহ হিসেবেই পরিচিতি পায়। অন্যদিকে, ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া কৃষ্ণাঙ্গ এবং মূল আফ্রিকানদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। স্থানীয় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ ছিল ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া কৃষ্ণাঙ্গদের দ্বারা গঠিত, যারা এই আফ্রিকান বিদ্রোহীদের দমনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রাজিলের শাসকগোষ্ঠী চরম নিষ্ঠুরতার সাথে তা দমন করে। হাইতির মতো ব্রাজিলও যেন স্বাধীন না হয়ে যায়, সেই ভয়ে দ্রুত চারজন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বাকিদের কারাদণ্ড, চাবুক মারা এবং কঠোর শ্রমের শাস্তি দেওয়া হয়। বেঁচে যাওয়া ২০০ জন মূল নেতাকে জাহাজে করে আটলান্টিক মহাসাগর পার করে পুনরায় আফ্রিকায় নির্বাসিত করা হয়। এর পর মুসলিমদের জোরপূর্বক খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করার এবং ইসলামের স্মৃতি মুছে ফেলার তীব্র চেষ্টা চলে। তা সত্ত্বেও ১৯১০ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলে প্রায় এক লাখ আফ্রিকান মুসলিমের অস্তিত্ব ছিল।

এই বিদ্রোহকে ব্রাজিলে দাসপ্রথার অবসানের প্রধান ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঘটনার পর পুরো ব্রাজিলে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দাসদের ওপর নজরদারি বাড়াতে কঠোর আইন ও দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধান করা হয়। তবে এই বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল দাস ব্যবসার ওপর। ব্রাজিলীয় জমিদার ও দাস মালিকদের মনে সার্বক্ষণিক ভয় ঢুকে গিয়েছিল যে, আফ্রিকা থেকে আরও দাস আনা হলে আবারও এমন বড় সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্ম হতে পারে।

এই অভ্যন্তরীণ ভীতি এবং নানামুখী চাপের কারণে ১৮৫১ সালে আটলান্টিক মহাসাগরীয় দাস ব্যবসা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয় ব্রাজিল সরকার। এর পর দেশের ভেতরের খামারগুলোয় দাসদের পালানোর ঘটনা বাড়তে থাকে এবং সেনাবাহিনীও পলাতক দাসদের ফিরিয়ে আনতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৮৮৮ সালে ব্রাজিলের পার্লামেন্টে ‘গোল্ডেন ল’ বা স্বর্ণালী আইন পাসের মাধ্যমে দেশটিতে দাসপ্রথার সম্পূর্ণ অবসান ঘটে। ১৮৩৫ সালের সেই রমজানের রাতের বিদ্রোহই মূলত লাতিন আমেরিকার এই সর্ববৃহৎ দেশে দাসপ্রথার কফিনে প্রথম পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল।

এনটি