এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে ইসলামী শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। ৯৭২ খ্রিস্টাব্দের জুনে ফাতিমীয় রাজবংশের হাত ধরে প্রাথমিকভাবে নামাজের জন্য উন্মুক্ত হয় এই প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষা ও আধুনিকায়নের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে আল-আজহার। দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে হাদিস, তাফসির ও ফিকহ শাস্ত্রের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি যুগভেদে রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রেও আল-আজহারের ছিল জোরালো উপস্থিতি।
বৃটানিকা বিশ্বকোষের তথ্য অনুযায়ী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম বিশ্বের শরিয়াহ ও আরবি ভাষা শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যার মূল কেন্দ্র প্রাচীন কায়রোর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। শুরু থেকেই এর পাঠ্যসূচিতে শরিয়াহ, আকাইদ ও আরবি সাহিত্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি আল-আজহারের অনেক প্রখ্যাত আলেম চিকিৎসা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান চর্চায় অনন্য অবদান রেখেছেন।
উনিশ শতকের শেষের দিকে ইসলামী শিক্ষার আধুনিকায়নের দাবি উঠলে পাঠ্যসূচিতে পুনরায় দর্শন যুক্ত করা হয়। এরপর গত শতকের ষাটের দশকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মতো নতুন নতুন বিভাগ খোলার পাশাপাশি ১৯৬২ সালে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এখানে ছাত্রীদের ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়, যা ছিল এই প্রতিষ্ঠানের জন্য এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।
ইন্দোনেশিয়ার চতুর্থ প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান ওয়াহিদ এবং মিশরের খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত ড. তোহা হোসেনের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিরা আল-আজহারের ছাত্র ছিলেন।
শিয়া মতবাদ থেকে সুন্নি ফিকহের রূপান্তর
৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে ফাতিমীয় সেনাপতি জওহর আল-সিকিলি খলিফা আল-মুইজ লি-দিনিল্লাহর পক্ষে মিশর জয় করার পর কায়রোতে নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। রাজধানীতে তিনি এই বিশাল মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। গবেষক ড. সাঈদ ইসমাইল আলীর মতে, তৎকালীন ফাতিমীয় সেনাবাহিনী মিশরে প্রবেশের পরপরই এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং তা শেষ হতে প্রায় ২৭ মাস সময় লেগেছিল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমা আজ-জাহরার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় আল-আজহার।
ফাতিমীয় রাষ্ট্রটি শিয়া ইসমাইলি ফিকহের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আল-আজহার ছিল মিশরে তাদের প্রথম মসজিদ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এর প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শিয়া মতবাদকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো। ৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আল-আজিজ বিল্লাহ এখানকার শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন, যা পরবর্তীকালে আজকের পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। শুধু ধর্মীয় প্রচারণাই নয়, ব্যাকরণ, সাহিত্য ও ফিকহের বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতির কারণে তৎকালীন ইরাক, সিরিয়া, মরক্কো ও আন্দালুসিয়া থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞান অর্জনের জন্য আসতেন।
তবে প্রতিষ্ঠার প্রায় দুইশত বছর পর মিশরের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পট পরিবর্তনে আল-আজহারের ইতিহাসেও বড় মোড় আসে। ১১৬৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.) ফাতিমীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে মিশরে আব্বাসীয় খেলাফতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। আইয়ুবি শাসনামলে শিয়া মতবাদের সমস্ত প্রতীক অপসারণ করা হয়। পরবর্তীতে মামলুক সুলতানদের (১২৫০-১৫১৭) শাসনামলে আল-আজহার তার পুরনো গৌরব ফিরে পায় এবং এই বিদ্যালয় বিশ্বের প্রধান সুন্নি ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়।
উসমানীয় আমলেও (১৫১৭-১৭৯৮) এই ধারা অব্যাহত থাকে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়। এই সময়েই আল-আজহারের প্রধান হিসেবে শায়খুল আল-আজহার বা ইমামুল আকবর পদের সৃষ্টি হয়, যিনি আজ অবধি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য হন।
আধুনিক যুগ ও ঔপনিবেশিক প্রতিরোধ
১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি জেনারেল নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিশর আক্রমণ করলে আল-আজহারের শিক্ষক ও ছাত্ররা ফরাসি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন। এর জেরে ফরাসি বাহিনী আল-আজহারে বোমাবর্ষণ করে এবং অনেক আলেমকে গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরবর্তীতে আধুনিক মিশরের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী পাশার আমলে এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হয় এবং ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় যুক্ত করা হয়।
উনিশ শতকে আল-আজহারের আধুনিকায়নে প্রখ্যাত চিন্তাবিদ জামালউদ্দিন আফগানি এবং তার শিষ্য মুফতি মুহাম্মদ আবদাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জামালউদ্দিন আফগানি জোর দিয়ে বলেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রগতির সঙ্গে পবিত্র কোরআনের কোনো বিরোধ নেই। পরবর্তীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল এবং আহমেদ উরাবির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময়ও আল-আজহারের ছাত্র-শিক্ষকেরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
রাজা ফুয়াদের খেলাফতের স্বপ্ন ও আজহারের বিভক্তি
১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর মুসলিম বিশ্বের বেশ কয়েকজন শাসক নিজেদের খলিফা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। মিশরের তৎকালীন রাজা ফুয়াদও এই পদের প্রতি আগ্রহ দেখান। আল-আজহারের তৎকালীন প্রধান শায়খ মুহাম্মদ আল-আহমাদি আল-জাওয়াহিরিসহ অনেক আলেম রাজাকে সমর্থন করেন। তবে প্রখ্যাত আলেম শায়খ আলী আবদেল রাজেক তার বিখ্যাত ইসলাম ও শাসনের মূলনীতি বইয়ে এই ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেন। ব্রিটিশদের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের কারণে মিশর খেলাফতের জন্য উপযুক্ত স্থান নয় উল্লেখ করে প্রায় ৪০ জন শীর্ষ আলেম এক বিবৃতিতে সই করেন। এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে ১৯২৬ সালে মিশরের পার্লামেন্টে আল-আজহারের বাজেট ও নেতৃত্ব সরকারের নজরদারিতে আনার জন্য আইন প্রণয়নের দাবি ওঠে। পরবর্তীতে ১৯২৭ সালের মে মাসে আইন পাসের মাধ্যমে আল-আজহারের প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে চলে যায়।
রাজনীতি ও বৈশ্বিক মঞ্চে আল-আজহার
গত শতকের ষাটের দশকে প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের আমলে আল-আজহারে বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা হয়। এই সংস্কারের মাধ্যমে চিকিৎসা, প্রকৌশল ও বাণিজ্য অনুষদ চালু করে একে একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বৈশ্বিক মঞ্চে আল-আজহার অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংলাপ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে অবস্থান এবং বিশ্ব দরবারে ইসলামের উদার ও মানবিক রূপ তুলে ধরতে এই প্রতিষ্ঠান নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে আল-আজহার শুধু একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং মিশরের জাতীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে টিকে রয়েছে।
এনটি
