বিজ্ঞাপন

বিখ্যাত ফকিহ ইবনে কাইয়ুম কারাগারে বন্দি হয়েছিলেন যে কারণে

বিখ্যাত ফকিহ ইবনে কাইয়ুম কারাগারে বন্দি হয়েছিলেন যে কারণে

হিজরি সপ্তম শতকের শেষভাগে জন্ম নিয়েছিলেন ইসলামী চিন্তাবিদ, ফকিহ, উসুলবিদ ও ভাষাবিদ ইমাম ইবনুল কাইয়ুম আল-জাওজিয়াহ (রহ.)। সব ছাড়িয়ে ইসলামের ইতিহাসে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে তায়মিয়ার সবচেয়ে প্রিয় ও প্রধান ছাত্র। টানা ১৭ বছর শিক্ষকের সান্নিধ্যে কাটিয়েছেন তিনি, এমনকি শিক্ষকের মতের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে তার সঙ্গে কারাবরণও করেছেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি রেখে গেছেন ইসলামী জ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থ।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

১২৯২ খ্রিস্টাব্দের (৬৯১ হিজরি) সফর মাসে দামেস্কের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইবনুল কাইয়িম। তার মূল নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আবু বকর। তার বাবা দামেস্কের বিখ্যাত জাওজিয়াহ মাদ্রাসার প্রধান বা ‘কাইয়িম’ (তত্ত্বাবধায়ক) ছিলেন। বাবার এই পদবি থেকেই পরবর্তীতে তার নামের সঙ্গে জাওজিয়াহ যুক্ত হয় এবং তিনি ইবনে কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। 

পারিবারিকভাবে ধর্মীয় পরিবেশের কারণে শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চায় যুক্ত হন এবং দামেস্কের তৎকালীন শীর্ষ আলেমদের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন।

শিক্ষা ও শিক্ষকদের তালিকা

সমকালীন প্রায় বিখ্যাত সব আলেমের কাছ থেকে তিনি হাদিস, তাফসির ও আরবি সাহিত্যের পাঠ নেন। তার শিক্ষকদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। এই তালিকায় ছিলেন তার বাবা আবু বকর বিন আইয়ুব, শিহাব আল-আবের, শাফেয়ী মাজহাবের প্রখ্যাত আলেম সাফিউদ্দিন আল-হিন্দি, হাফেজ আল-মিজ্জি এবং প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ হাফেজ আজ-জাহাবি।

যে কারণে ১৭ বছর জেলে

তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ইমাম ইবনে তায়মিয়ার সঙ্গে পরিচয়ের পর। ইবনে তায়মিয়ার জীবনের শেষ ১৭ বছর তিনি তার পাশে ছায়ার মতো ছিলেন। শিক্ষকের স্বাধীন ও সংস্কারমুখী চিন্তাভাবনা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এই আনুগত্যের কারণে দামেস্ক দুর্গে শিক্ষকের সঙ্গে তাঁকেও বন্দি হতে হয় এবং সেখানে তিনি অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন। ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে ইবনে তায়মিয়ার মৃত্যুর পর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

মাজহাব ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি

ইবনুল কাইয়িম দামেস্কের তৎকালীন পরিবেশ অনুযায়ী হাম্বলী মাযহাবের অধীনে বেড়ে উঠেন। তবে জ্ঞান অন্বেষণের পরিপক্বতা এবং শিক্ষক ইবনে তায়মিয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে পরবর্তীতে কোনো নির্দিষ্ট মাজহাবের অন্ধ অনুকরণ থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর প্রত্যক্ষ প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ফতোয়া দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেন। এর ফলে বেশ কিছু বিষয়ে তিনি সমকালীন প্রথাগত ফতোয়ার বাইরে গিয়ে নিজস্ব রায় দেন। 

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—একই মজলিসে এক শব্দে তিন তালাক দিলে তা এক তালাক হিসেবে গণ্য হওয়া এবং কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার বৈধতা। এসব স্বাধীন মতামতের কারণে সমকালীন আলেমদের একাংশের তীব্র বিরোধিতা এবং কারাদণ্ডের মুখোমুখি হলেও তিনি আমৃত্যু নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন।

শিষ্য ও অমর সৃষ্টি

ইবনে কাইয়িমের হাত ধরে তৈরি হয়েছেন ইসলামের ইতিহাসের অনেক খ্যাতনামা আলেম। তার ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ ‘তাফসিরুল কুরআনিল আজিম’ এবং ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’র লেখক হাফেজ ইবনে কাসির, ‘তাবাকাতুল হানাবিলা’র লেখক ইবনে রজব আল-হাম্বলি এবং বিখ্যাত আরবি অভিধান ‘আল-কামুস আল-মুহিত’-এর প্রণেতা মাজদুদ্দিন আল-ফিরোজাবাদি।

একই সঙ্গে তিনি রেখে গেছেন বুক শেলফ কাঁপানো সব কালজয়ী বই। তার লেখা ‘জাদুল মাআদ’, ‘ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন’, ‘মাদারিজুস সালিকিন’, ‘আদ-দা ওয়া আদ-দাওয়া’ (রোগ ও প্রতিকার) এবং ‘কিতাবুর রূহ’ আজও মুসলিম বিশ্বে সর্বাধিক পঠিত ও সমাদৃত গ্রন্থের তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে।

কাব্যের ভুবনে ইবনে কাইয়িম

ইসলামী শরিয়াহর পাশাপাশি আরবি সাহিত্যেও তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি একজন উঁচু মাপের কবি ছিলেন। তার কবিতাগুলো মূলত ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক বিষয়ে রচিত হলেও তাতে সাহিত্যের ছোঁয়া ছিল অনন্য। তৎকালীন বিভ্রান্ত ফেরকাগুলোর জবাবে লেখা তার বিখ্যাত ‘নূনিয়া’ কবিতাটি প্রায় ৬ হাজার লাইনের এক বিশাল কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া সাহাবিদের জীবনধারা এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে লেখা তার মিমিয়া কবিতাটি মুসলিম সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

আলেম সমাজের মূল্যায়ন

ইবনুল কাইয়িমের জীবন ও কর্ম নিয়ে তৎকালীন আলেম সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রশংসাকারীদের মধ্যে বুরহানুদ্দিন আল-জুরাই বলেন, এই আকাশতলে ইবনুল কাইয়িমের চেয়ে বড় কোনো জ্ঞানী আর নেই। হাফেজ আল-মিজ্জি তার জ্ঞানের গভীরতাকে ইমাম ইবনে খুজাইমার সঙ্গে তুলনা করেন। অন্যদিকে, তার সমালোচকদের মধ্যে তাকিউদ্দিন আস-সুবকি এবং ইবনে হাজার আল-হাইতামির মতো ফকিহরা তার এবং তার শিক্ষকদের কিছু কিছু আকিদাগত মতামতের তীব্র সমালোচনা করেন।

মৃত্যু 

দামেস্কের উমাইয়া মসজিদসহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মসজিদে খুতবা, শিক্ষাদান ও লেখালেখির মাধ্যমে কাটানো এই মহান মনীষী ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের (৭৫১ হিজরি) সেপ্টেম্বর মাসে ৬০ বছর বয়সে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। উমাইয়া মসজিদে স্মরণকালের বিশাল জানাজা শেষে দামেস্কের ‘বাবুস সাগির’ কবরস্থানে মায়ের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

সূত্র : আল জাজিরা

এনটি

বিজ্ঞাপন