বিজ্ঞাপন

মুসলিমদের মিসর বিজয়: যেভাবে সত্য হয়েছিল মহানবীর (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী

মুসলিমদের মিসর বিজয়: যেভাবে সত্য হয়েছিল মহানবীর (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী

ইসলামের ইতিহাসে রোমান বা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানের তৃতীয় এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল মুসলিমদের মিশর বিজয়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রা.)-এর নেতৃত্বে এই ঐতিহাসিক অভিযান পরিচালিত হয়। 

ফিলিস্তিন থেকে সমুদ্র উপকূল ধরে মিশরে প্রবেশ করে একে একে আল-আরিশ, আল-ফারমা, কায়রো এবং সবশেষে আলেকজান্দ্রিয়া জয় করেন মুসলিমরা। সেনাপতির অসাধারণ সামরিক কৌশল এবং স্থানীয় কিবতি বা খ্রিস্টানদের সহযোগিতায় এই বিজয় সহজ হয়েছিল, যা মূলত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর করা এক ভবিষ্যৎ বাণীর বাস্তব প্রতিফলন।

ইতিহাসবিদদের মতে, আমর ইবনুল আস মিশরের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বেশ অবগত ছিলেন। সিরিয়া বা শামের মতো মিশরের এই উপকূলীয় অঞ্চলে রোমানদের সামরিক শক্তি ততটা শক্তিশালী ছিল না। ফলে এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে একের পর এক অঞ্চল মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

আল-ফারমা দুর্গ জয় ও আমর ইবনুল আসের (রা.) রণকৌশল

মিশর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পথে আল-ফারমা নামক স্থানে বড় ধরনের রোমান প্রতিরোধের মুখে পড়ে  মুসলিম বাহিনী। এর আগে স্থানীয় অধিবাসীরা মুসলিমদের স্বাগত জানালেও আল-ফারমায় রোমানরা দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তোলে। মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ও যুদ্ধাস্ত্র কম থাকায় রোমানরা বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু আমর ইবনুল আস (রা.) অবরুদ্ধ করার কৌশল নেন এবং কয়েক মাস ধরে দুর্গটি অবরুদ্ধ করে রাখেন।

দীর্ঘ অবরোধের পর একদিন রোমানদের একটি দল বাইরে এসে আক্রমণ করে। মুসলিমরাও তাদের পাল্টা আঘাত হানেন। পিছু হটে রোমানরা দুর্গে ঢোকার আগেই মুসলিমরা দুর্গের প্রধান ফটক দখল করে নেন। এই বিজয়ে স্থানীয় কিবতিরা মুসলিমদের তথ্য দিয়ে বড় ধরনের সহায়তা করেছিল। রোমানরা যেন আবারো দখল নিতে না পারে তাই আল-ফারমা জয়ের পর এর প্রাচীর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

বিলবাইস যুদ্ধ ও মুকাউকিস কন্যার প্রতি মহানুভবতা

আল-ফারমা জয় শেষে মুসলিম বাহিনী বিলবাইসের দিকে অগ্রসর হন। এ সময় রোমানরা তাদের পথরোধ করে। তখন যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার জন্য রোমান প্রতিনিধিদের আহ্বান জানান আমর ইবনুল আস (রা.)। একইসঙ্গে তিনি তাদের সামনে ইসলাম গ্রহণ বা জিজিয়া কর দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন। একই সঙ্গে তিনি মিশরের অধিবাসীদের সঙ্গে সদয় আচরণের ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর সেই বিখ্যাত হাদিসটি স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, তোমরা অবশ্যই মিশর জয় করবে, সেখানে বিজয়ী হলে স্থানীয়দের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। কারণ তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি ও আত্মীয়তার (হজরত ইসমাইলের মা হাজেরার বংশধর) সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু রোমান সেনাপতি আরতাবুন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আকস্মিক আক্রমণ চালান। তবে মুসলিমদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে রোমান বাহিনী পরাজিত হয়ে আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে পালিয়ে যায়। 

বিলবাইস জয়ের পর মুসলিমদের হাতে মিশরের গভর্নর মুকাউকিসের কন্যা আরমানুসা বন্দী হন। আমর ইবনুল আস (রা.) কোরআনের আয়াত স্মরণ করে সাহাবিদের পরামর্শে আরমানুসাকে তার সমস্ত অলংকার ও দাসদাসীসহ সসম্মানে তার বাবার কাছে ফেরত পাঠান। মুসলিমদের এই মহানুভবতায় আরমানুসা ও তার পিতা মুগ্ধ হয়েছিলেন।

উম্মে দুনাইন ও তিন দিকের সামরিক চাল

এরপর নীল নদের তীরে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উম্মে দুনাইন অঞ্চলে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের তীব্রতা দেখে আমর ইবনুল আস (রা.) খলিফা ওমরের (রা.০ কাছে অতিরিক্ত সেনা চাইলে খলিফা চার হাজার বীর যোদ্ধা পাঠান, যাদের একেকজনকে এক হাজার যোদ্ধার সমতুল্য মনে করা হতো। এদের মধ্যে ছিলেন জুবায়ের ইবনুল আওয়াম ও উবাদা বিন সামিতের (রা.) মতো বীর সাহাবিরা। 

এই যুদ্ধে আমর ইবনুল আস (রা.) তার বাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করে দুই দিকে পাহাড় ও নদীর আড়ালে গুপ্ত ফাঁদ পাতেন। রোমানরা যখন মূল বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে, তখন চারপাশ থেকে মুসলিমদের আকস্মিক আক্রমণে তাদের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে এবং তারা ব্যাবিলন দুর্গের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

ব্যাবিলন দুর্গের পতন ও জুবায়ের ইবনুল আওয়ামের (রা.) বীরত্ব

মিশর বিজয়ের চূড়ান্ত ধাপ ছিল ব্যাবিলন দুর্গ জয়। প্রায় সাত মাস ধরে মুসলিমরা এই শক্তিশালী দুর্গ অবরুদ্ধ করে রাখেন। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের একপর্যায়ে সাহাবি জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) নিজের জীবন উৎসর্গ করার ঘোষণা দেন। একটি মইয়ের সাহায্যে রাতের আঁধারে দুর্গের দেয়ালে চড়ে বসেন তিনি। তার সঙ্গে থাকা যোদ্ধারা প্রাচীরের ওপর থেকে একযোগে তাকবির বা আল্লাহর আকবর ধ্বনি দিলে দুর্গের ভেতরের রোমানরা মনে করে মুসলিমরা সবাই ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এই আতঙ্কে তারা দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং মুসলিমরা সহজেই দুর্গের প্রধান ফটক খুলে দেয়।

ব্যাবিলন দুর্গ জয়ের মাধ্যমে মিশরে বাইজান্টাইন শাসনের অবসান ঘটে এবং সেখানে স্থায়ীভাবে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হয়। 

খলিফা ওমর (রা.)-এর যুগে এই বিজয়ের ফলে পূর্বের সিন্ধু নদ থেকে শুরু করে পশ্চিমের আফ্রিকা এবং উত্তরের আর্মেনিয়া পর্যন্ত এক বিশাল বৈশ্বিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে বিভিন্ন বর্ণ ও ধর্মের মানুষ ইসলামের ন্যায়বিচার ও ছত্রছায়ায় শান্তিতে বসবাসের সুযোগ পায়।