টানা কয়েকদিন ধরে তীব্র দাবদাহে পুড়ছে ইউরোপের দেশ ফ্রান্স। চলমান এই চরম আবহাওয়ার মধ্যে মানবিক এক নজির স্থাপন করেছে দেশটির বেশ কিছু মসজিদ। খরতাপে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষের জন্য মসজিদগুলোর দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কেউ তীব্র গরম থেকে বাঁচতে এসব মসজিদে এসে আশ্রয় নিতে পারছেন। সেখানে তাদের জন্য ঠাণ্ডা জায়গা ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংকটের এই সময়ে এমন উদ্যোগ ফরাসি সমাজে এক অনন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংহতির চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের পূর্বাঞ্চলীয় শহরতলি মঁত্রইয়ের স্থানীয় মসজিদগুলো এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। তীব্র গরমের কারণে ফরাসি কর্তৃপক্ষ যখন একের পর এক স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা জারি করে যাচ্ছে, ঠিক তখন মসজিদ কর্তৃপক্ষ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের দরজা সবার জন্য খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত বয়োবৃদ্ধ, পথচারী এবং তীব্র গরমে অসুস্থ বোধ করা যে কোনো মানুষের পাশে দাঁড়াতেই এই ব্যবস্থা।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, মসজিদের মূল নামাজ কক্ষগুলো সাময়িকভাবে সাধারণ মানুষের বিশ্রামের জায়গায় পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ চেয়ারে বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ শীতল কার্পেটে শুয়ে ক্লান্তি দূর করছেন। স্বেচ্ছাসেবীরা সবার হাতে তুলে দিচ্ছেন ঠাণ্ডা পানির বোতল ও খেজুর।
মঁত্রই মুসলিম কাউন্সিলের সভাপতি হাসান হারমুজ বলেন, দাবদাহের মধ্যে রাস্তায় মানুষকে প্রচণ্ড কষ্ট পেতে দেখে আমাদের এই ভাবনা আসে। অনেকেই একটু শীতল জায়গার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিই মসজিদের দরজা সবার জন্য খুলে দেওয়ার।
হাসান হারমুজ আরও জানান, টানা ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা এই তাপপ্রবাহের পুরোটা সময়ই মসজিদগুলো খোলা রাখা হয়েছে। মসজিদের উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ভেতরের পরিবেশ বেশ শীতল ও আরামদায়ক। ফলে বাইরে থেকে আসা ক্লান্ত মানুষগুলো এখানে এসে স্বস্তি পাচ্ছেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সেবা শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং যারই একটু আশ্রয়ের প্রয়োজন, তাকেই আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। ইসলাম আমাদের যে মানবিক মূল্যবোধ শেখায়, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে আমরা ফরাসি সমাজকে দেখাতে চাই যে মুসলিমরা এই সমাজেরই অংশ এবং যে কোনো সংকটে তারা সবার পাশে থাকতে প্রস্তুত।
মঁত্রইয়ের আল-ইসলাহ মসজিদের খতিব ইব্রাহিম বালহাজ বলেন, এই তীব্র গরমে বিশেষ করে বয়স্ক ও গৃহহীন মানুষরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। তাদের কষ্ট লাঘব করতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। মসজিদের কাজ শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সংকটের সময়ে সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এর বড় দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা ফ্রান্সে ইসলামের প্রকৃত ও ইতিবাচক রূপটি তুলে ধরতে চেয়েছি। সহাবস্থান শুধু মুখের কথা নয়, তা যে কাজের মাধ্যমেও প্রমাণ করা যায়, এটি তারই উদাহরণ।
ফ্রান্সের বিশাল অংশ জুড়ে যখন দাবদাহের কারণে সরকারি-বেসরকারি নানা সংস্থা হিমশিম খাচ্ছে, তখন মঁত্রইয়ের মসজিদগুলোর এই মানবিক ভূমিকা সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। দুর্যোগের মুহূর্তে মসজিদ ও ইবাদতের জায়গাগুলো যে মানুষের সেবায় সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারে, ফ্রান্সে তা আরও একবার প্রমাণিত হলো।
এনটি
