বিজ্ঞাপন

ইবনে বতুতার চোখে মধ্যযুগের আতিথেয়তা

ইবনে বতুতার চোখে মধ্যযুগের আতিথেয়তা

আধুনিক বিমান যোগাযোগ, ডিজিটাল বুকিং অ্যাপ কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া উৎসব—যেসব মাধ্যমে আজ পুরো বিশ্ব এক সুতোয় বাঁধা, এসবের উৎপত্তির অনেক আগে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষকে অন্য প্রান্তের সাথে যুক্ত করত সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। 

চতুর্দশ শতকে মরক্কোর তাঞ্জিয়ারের এক তরুণ মুসলিম পণ্ডিত নিজের ব্যাগ গুছিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। এরপর টানা তিন দশকে তিনি পাড়ি দেন প্রায় ৭৩ হাজার মাইল, যা তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থার তুলনায় ছিল অবিশ্বাস্য। কোনো বড় টুর্নামেন্টের টিকিট বা সুনির্দিষ্ট ভ্রমণসূচি ছাড়াই তার এই রোমাঞ্চকর পথচলা ছিল যেন এক অন্তহীন যাত্রা, যার জ্বালানি ছিল অজানাকে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম সমাজের অনন্য আতিথেয়তা।

ইবনে বতুতার বিপুল ধন-সম্পদ ছিল না, তবে তার এই ঐতিহাসিক সফরকে সম্ভব করে তুলেছিল মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়া ভ্রমণের সময় তিনি এমন এক পৃথিবীর দেখা পেয়েছিলেন, যা ছিল পারস্পরিক সংহতিতে অনন্য। যেখানে একজন অচেনা মুসাফির বা অতিথিকে স্বাগত জানানো শুধু এক ধরণের শিল্পই ছিল না, বরং তা ছিল পরম আধ্যাত্মিক সম্মানের বিষয়।

আনাতোলিয়ার অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা

বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা উদারতার এই নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল ইসলামের মৌলিক ঐতিহ্য। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি বিখ্যাত হাদিসে এই সামাজিক দায়বদ্ধতার মূল সুরটি ফুটে উঠেছে, যেখানে বলা হয়েছে—‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি)।

মধ্যযুগীয় পরিব্রাজকদের কাছে রাসুলের এই বাণী কোনো তাত্ত্বিক দর্শন ছিল না, বরং তা ছিল একটি সক্রিয় সামাজিক নিয়ম। ইবনে বতুতা যখন বর্তমান তুরস্কের আনাতোলিয়ায় প্রবেশ করেন, তখন তিনি স্থানীয় যুবক ও কারিগরদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ফিতইয়ান’ নামক একটি সংগঠনের মাধ্যমে এই আতিথেয়তার চমৎকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখতে পান। ‘আখি’ নামে পরিচিত সমাজনেতাদের পরিচালিত এই সংগঠনগুলোর প্রধান কাজই ছিল পথচারী ও মুসাফিরদের দেখভাল করা।

ইবনে বতুতা যখনই কোনো নতুন শহরে পৌঁছাতেন, এই সংগঠনের সদস্যরা আক্ষরিক অর্থেই শহরের প্রবেশদ্বারে এসে তাকে স্বাগত জানাতেন। নতুন অতিথিকে নিজেদের ডেরায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কারিগরদের দলগুলোর মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা লেগে যেত—কে এই অতিথির সেবা করে সওয়াব লাভ করবেন! তারা মুসাফিরদের জন্য চমৎকার থাকার জায়গা, গরম পানির হামাম এবং রাজকীয় ভোজের ব্যবস্থা করতেন। ফলে নিজ বাড়ি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এসেও একজন ক্লান্ত পথিক নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ, সম্মানিত ও সমাদৃত মনে করতেন।

রাজকীয় সংবর্ধনা ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন

ইবনে বতুতা যখন আরও পূর্বে দিল্লির সালতানাত এবং তার চেয়েও দূরবর্তী অঞ্চলে ভ্রমণ করেন, তখন স্থানীয় সংগঠনগুলোর সেই আন্তরিক আতিথেয়তা রূপ নেয় বিশাল রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা ও গণ-উৎসবে। তৎকালীন শাসকেরা খুব ভালো করেই জানতেন যে, বিভিন্ন অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় মানুষকে একতাবদ্ধ করতে হলে রাজকীয় উৎসবের বিকল্প নেই—ঠিক যেমনটি আজকের দিনে আমরা অলিম্পিক বা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখে থাকি।

রাজকীয় সব উদযাপনে তৎকালীন পরিবেশ কোনো বড় টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচের উন্মাদনাকেও হার মানাত। সুলতানরা ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, শারীরিক কসরত এবং তীরন্দাজি প্রতিযোগিতার মতো বড় বড় উৎসবের আয়োজন করতেন। এসব অনুষ্ঠানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি, কূটনীতিক ও পরিব্রাজকদের বিশাল প্যান্ডেলে আমন্ত্রণ জানানো হতো এবং রাষ্ট্রীয় সম্মানের প্রতীক হিসেবে তাদের ‘খিলাত’ বা দামী রেশমি রাজকীয় পোশাক উপহার দেওয়া হতো। এই আয়োজনগুলোর উদ্দেশ্যই ছিল বিশাল সাংস্কৃতিক ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষের কৃতিত্বকে এক ছাদের নিচে এনে উদযাপন করা।

আঞ্চলিক স্বাদ ও চেনা মিলনমেলা

রাজদরবারের বাইরে প্রাচীন ভ্রমণের আসল প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে থাকত এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল ও আফ্রিকার ব্যস্ত জনাকীর্ণ বাজার এবং চত্বরগুলোতে। ইবনে বতুতা তার বিস্তারিত ডায়েরিতে সামাজিক জীবনের এই আনন্দময় দিকগুলো খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি লিখেছেন সেখানকার বিচিত্র সব খাবারের স্বাদ, আঞ্চলিক বিনোদন এবং রাস্তার ধারের খেলাধুলার কথা, যা স্থানীয় মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুদ করে রাখত।

প্রাচীনকালের এই ঐতিহাসিক বাজারগুলো ছিল যেন আজকের দিনের স্টেডিয়ামের লবি বা কনকোর্সের মতো। এগুলো ছিল এমন এক প্রাণবন্ত জায়গা, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মুসাফিররা একসাথে বসে খাবার খেতেন, পথের গল্প ভাগাভাগি করতেন এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটাতেন। কোনো ভিড়ে ঠাসা সরাইখানায় ঐতিহ্যবাহী কুস্তি ম্যাচ দেখা কিংবা অন্য কোনো কাফেলার যাত্রীর মুখ থেকে দূর দেশের খবর শোনা—সবখানেই ইবনে বতুতা লক্ষ্য করেছেন, কীভাবে একটি অভূতপূর্ব অভিন্ন সংস্কৃতি একজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষকেও এক নিমেষে আপন করে নিতে পারে।

আতিথেয়তার চিরন্তন ধারা

ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই পরিব্রাজকের হাজার হাজার মাইলের রোমাঞ্চকর ভ্রমণের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, নতুনকে খোঁজা এবং বৈচিত্র্যকে উদযাপন করার এই আধুনিক আকাঙ্ক্ষা আসলে মানুষের বহু পুরনো ঐতিহ্যেরই অংশ। আজকের দিনে মুসলিম-বান্ধব পর্যটনে (হালাল ট্যুরিজম) আমরা যে আতিথেয়তার পরিবেশ দেখি, তা মূলত শতাব্দী প্রাচীন সেই সেবাব্যবস্থারই আধুনিক রূপ, যা শত বছর আগে ইবনে বতুতাকে নিরাপদে রেখেছিল।

আমরা যখন কোনো মুসাফিরের জন্য আমাদের দরজা খুলে দিই, সহযাত্রীর সাথে খাবার ভাগ করে নিই কিংবা কোনো বৈশ্বিক আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে স্বাগত জানাই, তখন আসলে আমরা সেই গৌরবময় ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকেই বাঁচিয়ে রাখি। খেলাধুলা বা বিনোদনের জমকালো আয়োজন হয়তো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমাদের মোহিত করে রাখে, কিন্তু অতিথিকে সম্মান জানানো এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরি করার এই চিরন্তন ধারাটি বিশ্বমানবতার বুকে এক স্থায়ী বিজয় হয়ে থাকবে।

সূত্র : হালাল ট্রিপ

এনটি

বিজ্ঞাপন