বিজ্ঞাপন

মসুলের ঐতিহাসিক উমাইয়া মসজিদ

ইসলামের পঞ্চম মসজিদ হিসেবে পরিচিত যে মসজিদ

ইসলামের পঞ্চম মসজিদ হিসেবে পরিচিত যে মসজিদ

ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক শহর মসুল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাত পরবর্তী সময়ে যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিমদের বিজয় কেতন উড়ছিল সেই প্রাথমিক যুগেই এই শহর মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। 

মুসলিম সেনানায়কদের রীতি অনুযায়ী, কোনো শহর বিজয়ের পর ইবাদতের জন্য তারা প্রথমেই মসজিদ নির্মাণ করতেন এবং তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠত প্রশাসনিক ভবন, বাজার ও লোকালয়। মসুলের উমাইয়া মসজিদও ঠিক সেভাবেই নির্মিত হয়েছিল। শহরটিতে নির্মিত এটিই প্রথম মসজিদ। দীর্ঘ ১৪ শতকের ইতিহাসে এই প্রাচীন মসজিদ অনেকবার সম্প্রসারণ, ভাঙন এবং যুদ্ধ-বিগ্রহের অরাজকতার শিকার হয়েছে।

ঐতিহাসিকদের মতে, ইসলামের ইতিহাসে, এটিই পঞ্চম মসজিদ। ইসলামের প্রথম মসজিদ কুবা, এরপর মসজিদে নববী, বসরা ও কুফার মসজিদের পরই মসুলের এই মসজিদের স্থান। 

মসুলের বিশিষ্ট লেখক সাঈদ আল-দিওয়াহজি তার মসুলের ঐতিহাসিক মসজিদ বিষয়ক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৬ হিজরি তথা ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে উকবা বিন ফারকাদ আল-সুলামি এই জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের পাশেই তৈরি করা হয়েছিল প্রশাসনিক ভবন বা দারুল ইমারাহ। প্রাচীন মসুলের পশ্চিমাংশের আল-কালায়াত এলাকায় বিখ্যাত বাশতাবিয়া দুর্গের কাছে দজলা নদী থেকে মাত্র ৩৫০ মিটার দূরে এর অবস্থান।

পরবর্তীতে ২৩ হিজরিতে খলিফা হজরত ওমর (রা.) মসুলের শাসনভার হাইসাম বিন আরাফাজা আল-বারিকির হাতে ন্যস্ত করলে তিনি মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন এবং এর চারপাশে আবাসিক এলাকা ও বাজার গড়ে তোলেন, যা মসুলকে একটি পূর্ণাঙ্গ শহরের রূপ দেয়।

উমাইয়া থেকে আব্বাসীয় আমল

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে একপর্যায়ে মসজিদে মুসল্লিদের জায়গা সংকুলান হচ্ছিল না। ফলে দ্বিতীয় হিজরি শতকের শুরুতে উমাইয়া শাসক মারওয়ান বিন মুহাম্মদ মসজিদটি সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন করে ও বড় পরিসরে নির্মাণ করেন। তখন থেকেই এটি উমাইয়া মসজিদ নামে পরিচিতি পায় এবং এর ধারণক্ষমতা দাঁড়ায় ১১ হাজারে। পরবর্তীতে ১৬৭ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদি এর আরও সম্প্রসারণ করেন, যার ফলে প্রায় ২০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে এখানে নামাজ পড়ার সুযোগ পান।

তবে চতুর্থ হিজরি শতকে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মসুলের এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদ অবহেলা ও আংশিক ভাঙনের শিকার হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এরপর পঞ্চম হিজরি শতকের মাঝামাঝি সময়ে আতাবেগীয় রাজবংশ মসুলের শাসনভার গ্রহণ করলে শহরটি আবার প্রাণ ফিরে পায়। ১১৪৮ খ্রিস্টাব্দে সাইফ উদ্দিন প্রথমের নির্দেশে মসজিদটির বড় ধরনের সংস্কার করা হয়।

ইতিহাসবিদরা জানান, আতাবেগীয়রা মসুলের বিখ্যাত আল-নূরি মসজিদ নির্মাণের পর এই প্রাচীন উমাইয়া মসজিদটিকে পৃথক করতে ‘আল-আতিক’ বা প্রাচীন মসজিদ নামে ডাকতে শুরু করেন।

মঙ্গোল আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ

ইতিহাসে এই মসজিদের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ১২৬১ খ্রিস্টাব্দে, যখন হালাকু খানের মঙ্গোল বাহিনী মসুল দখল করে মসজিদটিতে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এরপর ১৩৯৫ ও ১৪০১ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর লংয়ের বাহিনীর হামলায় মসজিদটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। মঙ্গোল ও তৈমুর লংয়ের বাহিনী ইসলামের এই পঞ্চম ঐতিহাসিক মসজিদের অস্তিত্ব পুরোপুরি মুছে দিতেই এই তাণ্ডব চালিয়েছিল বলে ধারণা করেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

দীর্ঘকাল এই অবস্থায় থাকার পর অটোমান বা উসমানীয় আমলে মসুলের নিরাপত্তা মুসলিমদের হাতে ফিরে এলে স্থানীয়রা আবার এর আশেপাশে বসতি গড়তে শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৮১০ খ্রিস্টাব্দে মসুলের এক ধনী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মুসাফফি আল-জাহাব নিজের অর্থায়নে মসজিদটি পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করেন। তার নামানুসারেই বর্তমানে তা ‘মুসাফফি মসজিদ’ নামেও পরিচিত। স্থানীয় জিপসাম, পাথর ও ঐতিহ্যবাহী মসুলীয় ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর নকশায় মসজিদটি সাজানো হয়েছিল।

আইএস যুদ্ধ ও বর্তমানের অবহেলা

১৯১৭ সালেও মসজিদটির বড় ধরনের সংস্কার করা হয়েছিল। তবে এর ওপর সর্বশেষ বড় আঘাতটি আসে ২০১৭ সালে যখন আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের (ইসলামিক স্টেট) কাছ থেকে মসুল শহর পুনর্দখলের জন্য তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। প্রাচীন মসুল শহরটি আইএসের সর্বশেষ ঘাঁটি হওয়ায় সামরিক অভিযানের সময় প্রাচীন এই মসজিদটি আবারও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার চার বছর পেরিয়ে গেলেও ঐতিহাসিক এই মসজিদটির পুনর্নির্মাণে সরকারের উদাসীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা। তাদের মতে, দামেস্ক বা আলেপ্পোর উমাইয়া মসজিদ যেভাবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছে, বারবার যুদ্ধের কবলে পড়ায় মসুলের উমাইয়া মসজিদ সেই প্রচার পায়নি।

মসুলের সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের পরিচালক আবু বকর কানআন এ বিষয়ে জানান, গত কয়েক বছরে প্রয়োজনীয় বাজেট না থাকা এবং যুদ্ধকালীন অবিস্ফোরিত ল্যান্ডমাইন ও বোমার কারণে ওই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ শুরু করা যায়নি। তবে পর্যাপ্ত তহবিল পাওয়া গেলে বা কোনো দানশীল ব্যক্তি এগিয়ে এলে প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ঠিক রেখেই মসজিদটি দ্রুত পুনর্নির্মাণ করা হবে।

সূত্র : আল জাজিরা

এনটি