বিজ্ঞাপন

আফ্রিকার যে ভূমিতে প্রথম হিজরত করেছিলেন সাহাবিরা

আফ্রিকার যে ভূমিতে প্রথম হিজরত করেছিলেন সাহাবিরা

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত ইসলামের ইতিহাসে একটি মোড় ঘোড়ানো ঘটনা। হিজরতের মাধ্যমে মুসলমানেরা স্বাধীনভাবে ইসলাম পালনের সুযোগ পান এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের শান্তির বার্তা। মদিনায় হিজরতের বিষয়টি বহুল চর্চিত হলেও এর আগে আরেকটি ভূমিতে হিজরত করেছিলেন সাহাবিরা। 

হাবশায় প্রথম হিজরত

সাহাবিদের হিজরতের প্রথম ভূমি ছিল বর্তমানে পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া। তৎকালীন সময়ে এই ভূমি হাবশা নামে পরিচিত ছিল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-সহ সাহাবিদের মধ্যে সামর্থ্যবান প্রায় সবাই মদিনায় হিজরত করেছিলেন। তবে হাবশাতে দুই দফায় খুব অল্প সংখ্যক সাহাবি হিজরত করেছিলেন। নবুয়তের পঞ্চম বছর প্রথম দফায় হিজরত করেন ১২ জন সাহাবি। তাদের মধ্যে চারজন নারী সাহাবিও ছিলেন। হাবশায় প্রথমবার হিজরতকারী সাহাবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুইজন ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি হজরত উসমান বিন আফফান (রা.) এবং তার স্ত্রী নবীকন্যা হজরত রুকাইয়া (রা.)।

নবীজির (সা.) বাণী...

হাবশায় হিজরত সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যদি তোমরা আবিসিনিয়া (হাবশা) চলে যেতে, তবে তোমাদের জন্য খুব ভালো হতো। কারণ সেখানে এমন একজন রাজা (নাজ্জাশী) আছেন, যার অধীনে কেউ অত্যাচারিত হয় না। হাবশা একটি সত্য ও ন্যায়ের দেশ। সেখানে তোমরা অবস্থান করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের এই বর্তমান সংকট ও কষ্ট লাঘব করার কোনো ব্যবস্থা করেন।’

গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে হাবশা থেকে মক্কায়...

মক্কায় মুসলিমদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চলছিল। সেই তুলনায় কিছুটা স্বস্তিতে ছিলেন হাবশায় হিজরতকারী মুসলিমরা।  এ বিষয়টি মেনে নিতে পারছিল না মক্কার মুশরিকেরা। হাবশা থেকে সাহাবিদের মক্কায় ফেরাতে ও তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে একটি গুজব ছড়িয়ে দিলো তারা। উড়ো খবরে হাবশায় হিজরতকারী সাহাবিরা জানতে পারলেন, মক্কার পরিস্থিতি মুসলিমদের অনুকূলে এবং মক্কার সবাই মুসলমান হয়ে গেছে। 

মক্কায় সাহাবিদের ওপর নির্যাতন

স্বস্তির খোঁজে হাবশায় হিজরত করলেও জন্মভূমি মক্কায় ফেরার বাসনা সবসময় মনে লালন করতেন সাহাবিরা। উড়ো খবর শুনে সেই বাসনা তীব্র হলো। সংবাদের তথ্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগ না পেয়ে আ তারা মক্কায় আবার ফিরে এলেন। কিন্তু  এসে দেখলেন বাস্তবতা পুরো উল্টো। মুসলিমদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন আগের থেকেও আরও বেশি বেড়ে গেছে। 

হাবশা থেকে মক্কায় ফেরা সাহাবিরা বিভীষিকার মুখোমুখি হলেন। হাবশা ফেরত ও মক্কায় অবস্থানরত সাহাবিদের ওপর পুরো মাত্রায় নির্যাতন চালাতে লাগলো মুশরিকেরা। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবীজি (সা.) আবারো সাহাবিদের হাবশায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। 

দ্বিতীয়বার হাবশায় হিজরত

দ্বিতীয় ধাপে ৮৩ জন পুরুষ এবং ১৯ জন নারী সাহাবি হাবশায় হিজরত করেছিলেন। দ্বিতীয় ধাপের এই কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন হজরত জাফর বিন আবু তালেব (রা.)। এই কাফেলায় আরও ছিলেন হজরত আম্মার বিন ইয়াসির (রা.) এবং হজরত আবু মূসা আশআরী (রা.)-সহ অনেক বিখ্যাত সাহাবি। 

হাবশায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র

কুরাইশরা যখন দেখলো মক্কার বাইরে মুসলমানদের নিরাপদ অবস্থান তৈরি হচ্ছে তখন তারা ষড়যন্ত্রের পথ অবলম্বন করল। কুরাইশের সেরা দুই কূটনীতিক হজরত আমর ইবনুল আস এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আবি রাবীয়াকে হাবশার রাজ দরবারে পাঠানো হলো। তারা উপহার উপঢৌকন নিয়ে দরবারের সভাসদবর্গ এবং খ্রিস্টান পাদ্রীদের সাথে সাক্ষাৎ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদেরকে বাগে আনতে সক্ষম হলো। রাজার সাথে কথোপকথনের সময় তারা অভিযোগ দিল, মুসলমানরা তাদের ধর্ম ছেড়ে চলে এসেছে, আবার এই দেশের ধর্ম তারা গ্রহণ করেনি।

তারা আরও বললো, হে মহারাজ! আমাদের দেশ (মক্কা) থেকে কিছু নির্বোধ, বোকা ও উগ্র যুবক আপনার দেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তারা নিজেদের বাপ-দাদার ধর্ম (পৌত্তলিকতা) ত্যাগ করেছে, তারা আপনার ধর্মও (খ্রিস্টধর্ম) গ্রহণ করেনি। তারা সম্পূর্ণ নতুন এক ধর্মের জন্ম দিয়েছে, যা আমরা বা আপনি—কেউই কখনো শুনিনি। মক্কার কুরাইশ বংশের সম্ভ্রান্ত নেতৃবৃন্দ, তাদের পিতা এবং অভিভাবকরা তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের পাঠিয়েছেন।

বাদশার সামনে সাহাবি জাফর বিন আবু তালেবের (রা.) বক্তব্য

রাজা কুরাইশের প্রতিনিধিদের বক্তব্য শুনে বাস্তবতা জানার জন্য মুসলমানদের ডাকলেন। তখন হজরত জাফর বিন আবু তালেব (রা.) দাঁড়িয়ে একটি অসাধারণ বক্তব্য দিলেন। যেখানে তিনি ইসলামের পরিচয় এবং তাদের বাস্তবতা দুটোই সুন্দর করে তুলে ধরলেন। ইসলামের প্রাণ ও প্রকৃতি বোঝার জন্য তার এই বক্তব্যটি ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। 

তিনি বলেন, ‘হে রাজা! আমরা ছিলাম এক জাহেল (মূর্খ) জাতি. আমরা মূর্তিপূজা করতাম, মৃত পশুর মাংস খেতাম, বিভিন্ন অশ্লীল কাজে লিপ্ত হতাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম এবং প্রতিবেশীদের সাথে খারাপ আচরণ করতাম, আমাদের মধ্যে যে শক্তিশালী ছিল, সে দুর্বলকে গ্রাস করত’।

‘আমরা যখন এই অন্ধকারে নিমজ্জিত, ঠিক তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের মধ্য থেকেই একজনকে আমাদের কাছে রাসূল হিসেবে পাঠালেন. যার বংশমর্যাদা, সত্যবাদিতা, আমানতদারী এবং পবিত্রতা সম্পর্কে আমরা আগে থেকেই খুব ভালোভাবে জানতাম’।

‘তিনি আমাদের দাওয়াত দিলেন, আমরা যেন এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং আমাদের বাপ-দাদার পাথর ও মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করি, তিনি আমাদের আদেশ করলেন—আমরা যেন সবসময় সত্য কথা বলি, আমানত রক্ষা করি, আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখি, প্রতিবেশীর সাথে ভালো আচরণ করি এবং হারাম কাজ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকি, তিনি আমাদের ব্যভিচার, মিথ্যা কথা, এতিমের মাল ভক্ষণ এবং সতী নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া থেকে নিষেধ করেছেন’।

‘আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি, তাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি এবং আল্লাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যা এনেছেন তা অনুসরণ করেছি, এই অপরাধে আমাদের গোত্রের লোকেরা (কুরাইশ) আমাদের ওপর শত্রুতা শুরু করেছে. তারা আমাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে, যেন আমরা এক আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে আবার মূর্তিপূজায় ফিরে যাই. যখন তাদের জুলুম ও অত্যাচার আমাদের জন্য সহ্য সীমার বাইরে চলে গেল এবং আমাদের দ্বীন পালনে তারা বাধা সৃষ্টি করল, তখন আমরা আপনার দেশে পালিয়ে এসেছি। হে মহারাজ! আমরা অন্যদের ছেড়ে আপনাকে বেছে নিয়েছি এবং আশা করি আপনার আশ্রয়ে আমরা কোনো জুলুমের শিকার হব না।’ ( মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২১৯৯২)

এরপর তিনি সূরা মারিয়াম থেকে কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন রাজাকে। তিলাওয়াত শুনে রাজার দাড়ি ও চোখ ভিজে গেল। রাজা অত্যন্ত মুগ্ধ হলেন। কুরাইশ প্রতিনিধিদেরকে ফিরিয়ে দিলেন। তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বিদায় দিলেন। এবং মুসলমানদের অভয় দিয়ে তার রাজ্যে স্থায়ী আশ্রয় ও নিরাপদভাবে বসবাসের সুসংবাদ দিলেন। এভাবেই হাবশায় সাহাবিদের নিরাপদ আশ্রয় তৈরি হয়। বাদশার সাথে মুসলমানদের আন্তরিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বাদশা নাজ্জাশী। 

আবারো ব্যর্থ হলো ষড়যন্ত্র

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। কুরাইশ প্রতিনিধি দল দ্বিতীয় দিন আবার উপস্থিত হলো বাদশার দরবারে। হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম নিয়ে ইসলাম এবং খ্রিস্ট ধর্মের বৈপরীত্যপুর্ণ ভাষ্যের বিষয়টি উসকে দিলো। তবে বাদশা পাত্তা দেননি তাদের কথায়। অবশেষে কুরাইশ প্রতিনিধিরা ব্যর্থ হয়ে মক্কায় ফিরে আসে।

হাবশার এই হিজরত  শুধুমাত্র মাত্র দেশত্যাগ বা সাময়িক আত্মরক্ষা ছিল না। এই হিজরত ছিল ঈমানের প্রতি অবিচলতার এক মহিমান্বিত গল্প। একইভাবে ছিল অস্ত্র ছাড়াই ভিনদেশী রাজ-দরবার জয় করার এক অনন্য কূটনৈতিক সাফল্যের ইতিহাস। মাতৃভূমি ত্যাগের সেই অশ্রুসিক্ত বেদনা ও আফ্রিকার মাটিতে ইসলামের প্রথম পদচিহ্ন আজ দেড় হাজার বছর পরও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সব হারিয়েও যদি ঈমানকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তবে শেষ পর্যন্ত জয় সত্যেরই হয়।