আরবের তপ্ত মরুভূমিতে ইসলামের যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, সেখানে পানিকে শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবেই দেখা হয়নি, বরং একে দেওয়া হয়েছে জীবনের সবচেয়ে পবিত্র ও মৌলিক উপাদানের মর্যাদা। পূর্ববর্তী নবীদের বাণীর ধারাবাহিকতায় নাজিল হওয়া সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ পবিত্র কোরআনে পানিকে জীবন রক্ষা, স্থায়িত্ব এবং পবিত্রতার এক অনন্য উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
পৃথিবীতে জীবনের আদি উৎস হলো পানি। মহান আল্লাহ পানি থেকেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন (সূরা আল-ফরকান, আয়াত :৫৪)। পবিত্র কোরআনে এর কেন্দ্রীয় গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আমি প্রাণবান সমস্ত কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত :৩০)। এমনকি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির আগেও পানির অস্তিত্ব ছিল। এ প্রসঙ্গে কোরআনে এসেছে, আর তিনি সেই সত্তা যিনি আসমান ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তখন তার আরশ ছিল পানির ওপর (সূরা হুদ, ১১:৭)।
কোরআনের পাতায় পাতায় বৃষ্টি, নদী ও ঝরনার বিবরণ আল্লাহর অফুরন্ত অনুকম্পা ও দয়ার প্রতীক হিসেবে ফুটে উঠেছে। সূরা আশ-শুরার ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষেরা যখন আশাহত হয়ে পড়ে, তখন তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তার রহমত ছড়িয়ে দেন। তবে একই সঙ্গে বিশ্বাসীদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই মিষ্টি পানি আল্লাহরই দান এবং তিনি চাইলে তা ছিনিয়েও নিতে পারেন। সূরা ওয়াকিয়াহর ৬৮-৭০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা যে পানি পান করো, সে সম্পর্কে কি ভেবে দেখেছ? তোমরাই কি তা মেঘ থেকে নামিয়ে আনো, না আমি বর্ষণ করি? আমি চাইলে তো একে লোনা বা তেতো করে দিতে পারতাম। এই আয়াতের মাধ্যমে মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তারা পৃথিবীতে শুধু আল্লাহর সৃষ্টির তত্ত্বাবধায়ক, মালিক নয়।
দেহ, মনের পবিত্রতায় অজু ও গোসল
ইসলাম ধর্মে পানির ভূমিকা কতটা গভীর, তা স্পষ্ট হয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বিখ্যাত হাদিসের মাধ্যমে, যেখানে তিনি বলেছেন, পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক (সহিহ মুসলিম)। ইসলামে ইবাদতের জন্য পবিত্রতা অর্জন করা বাধ্যতামূলক। অপবিত্র অবস্থায় ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজ কবুল হয় না। সূরা আল-মায়েদার ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল এবং কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করো। যদি তোমরা অপবিত্র অবস্থায় থাকো, তবে শরীর পবিত্র করে নাও।
হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা নিয়ম মেনে পানি দিয়ে অজু করবেন, কিয়ামতের দিন অজুর প্রভাবে তাদের কপাল, হাত ও পা উজ্জ্বল আলোয় জ্বলজ্বল করবে। হাদিসের বিশাল একটি অংশ জুড়ে অজুর নিয়মকানুন বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে অজুর জন্য ব্যবহৃত পানি অবশ্যই বিশুদ্ধ হতে হবে। বৃষ্টি, কূপ, নদী, ঝরনা বা সাগরের পানি অজুর জন্য উপযুক্ত।
ইসলামে পবিত্রতা অর্জনের দুটি ধাপ রয়েছে—অজু ও গোসল। ছোটখাটো অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হতে অজু করা হয়। হাদিসে বলা হয়েছে, মানুষ যখন অজুর মাধ্যমে মুখ, হাত বা পা ধুয়ে ফেলে, তখন তার অঙ্গগুলো দিয়ে করা ছোট ছোট গুনাহ পানির শেষ বিন্দুর সঙ্গে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। অন্যদিকে বড় ধরনের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হতে পুরো শরীর পানি দিয়ে ধুয়ে গোসল করা ফরজ বা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিয়ত ও আধ্যাত্মিকতা
পবিত্রতা অর্জন শুধু একটি যান্ত্রিক শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর আধ্যাত্মিকতা। নিয়ত বা মনের সংকল্প ছাড়া অজু বা গোসল পূর্ণাঙ্গ হয় না। গরম থেকে বাঁচতে বা শরীর ঠান্ডা করতে গা ধুয়ে নিলে তা ইবাদতের জন্য গণ্য হবে না। শরীর যখন পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়, মন তখন সম্পূর্ণ আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ থাকতে হয়। ইসলামে দেহ ও মনের এই মেলবন্ধনকে তাওহিদ বা একত্ববাদেরই একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। গ্রানাডার পুরনো মুরিশ কোয়ার্টারের একটি হাম্মামখানায় লেখা রয়েছে, শরীর হলো আত্মার দর্পণ, তাই বাইরের দাগ ভেতরের কলুষতারই ইঙ্গিত দেয়।
পানি ব্যবহারে মিতব্যয়িতা ও বিকল্পের সন্ধান
পানি সহজলভ্য হলেও অপচয় করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে ইসলামে। মহানবী (সা.) অজুর সময় প্রতিটি অঙ্গ সর্বোচ্চ তিনবার ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং এর বেশি ধোয়াকে অপছন্দ করেছেন।
ইবনে মাজাহ শরীফের হাদিসে বলা হয়েছে, সাহাবি হজরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা.) একদিন বসে অজু করছিলেন। এমন সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তার পানির ব্যবহার দেখে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এত অপচয় কেন? সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন অজুর মধ্যে কি অপচয় হয়? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ। এমনকি নদীর পাশে বসেও অজু করার সময় (পানি অযথা খরচ করলে অপচয় হিসেবে গোনাহ হবে)।
এমনকি পানির চরম সংকটের সময়েও ইসলাম সহজ সমাধান দিয়েছে। একবার মরুভূমি ভ্রমণের সময় পানির অভাব দেখা দিলে আল্লাহ তাআলা তায়াম্মুমের বিধান নাজিল করেন। সূরা আন-নিসার ৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যদি তোমরা পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো এবং তা তোমাদের মুখ ও হাতে বুলিয়ে নাও। মহানবী (সা.) মাটিকেও পবিত্রতার মাধ্যম উল্লেখ করে বলেছেন, সমগ্র পৃথিবীকে আমার জন্য সিজদার স্থান ও পবিত্রতা অর্জনের উপায় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এনটি
