বিজ্ঞাপন

আল আকসা মুসলমানদের হাতছাড়া হয়েছিল কীভাবে?

আল আকসা মুসলমানদের হাতছাড়া হয়েছিল কীভাবে?

৪৯২ হিজরির শাবান মাসে যখন জেরুজালেম ক্রুসেডারদের দখলে চলে যায়, তখন সেলজুক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ চরম দুর্বলতায় ধুঁকছিল। সেলজুক শাসকেরা তখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ব্যস্ত ছিলেন। সুলতান মালিকশাহের সন্তানরা বাবার সিংহাসন দখল করতে একে অপরের ঘোর শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন। 

এই চরম সংকটের মুহূর্তে তৎকালীন আব্বাসীয় খলিফা শুধু ইরানের সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুকের কাছে জেরুজালেম রক্ষার আকুতি জানিয়ে চিঠি পাঠানো ছাড়া আর কোনো কার্যকর সমাধান পাননি। কিন্তু সুলতান বারকিয়ারুক খলিফার এই চিঠিতে কান দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেননি। তার কাছে জেরুজালেম রক্ষার চেয়ে নিজের সিংহাসন টিকিয়ে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

পরের বছর খলিফা আল-মুস্তাজহির বিল্লাহ পুনরায় চিঠি পাঠালে সুলতান বারকিয়ারুক আবারও তা উপেক্ষা করেন। খলিফাও মনে করলেন, চিঠি পাঠিয়েই তিনি তার দায়িত্ব শেষ করেছেন। 

আব্বাসীয় ঐতিহাসিক ইবনুল ইমবানি তৎকালীন খলিফার চিত্র এঁকেছেন এভাবে, খলিফা আল-মুস্তাজহির নিজের খেয়ালখুশিতে মগ্ন ছিলেন। বিলাসিতা ও জীবনের সব ধরনের আনন্দ উপভোগে তার পুরো মনোযোগ ছিল। অবশ্য তার সময়ে ইরাকে এক ধরনের বাহ্যিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি বিরাজ করছিল এবং তার শাসনব্যবস্থাও ছিল নিরাপদ।

ক্রুসেডারদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস

প্রথম ক্রুসেডের প্রত্যক্ষ সূচনা হয়েছিল ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে ইতালির পিয়াচেনজা শহরে পোপ আরবান দ্বিতীয় কর্তৃক আয়োজিত এক ধর্মীয় সমাবেশের মাধ্যমে। যেখানে ইতালি, বারগান্ডি ও ফ্রান্সের শীর্ষ ধর্মযাজকেরা অংশ নেন। 

তৎকালীন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল থেকে এক প্রতিনিধি দল ওই সমাবেশে উপস্থিত হয়ে বাইজেন্টাইন সম্রাটের একটি অনুরোধপত্র পোপের কাছে হস্তান্তর করে। সেই চিঠিতে এশিয়া মাইনর ও আনাতোলিয়ার বিশাল অংশ দখলকারী এবং বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে আন্তাকিয়া ছিনিয়ে নেওয়া মুসলিম সেলজুকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পশ্চিমা যোদ্ধাদের সাহায্য চাওয়া হয়। পোপতন্ত্র এই সুযোগকে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে লুফে নেয়। 

এর মাধ্যমে একদিকে যেমন ইউরোপীয় রাজা ও সামন্তদের ওপর পোপের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে সিসিলি ও দক্ষিণ ইতালি থেকে নরম্যানদের হুমকি সরিয়ে তাদের মনোযোগ আরব ও ইসলামের বিরুদ্ধে এক পবিত্র যুদ্ধের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

১০৯৫ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ ফ্রান্সের ক্লারমন্ট ধর্মীয় মহাসম্মেলন শেষে এক বিশাল জনসমাবেশে পোপ আরবান দ্বিতীয় তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেখানে তিনি ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে অস্ত্র হাতে এক পবিত্র যুদ্ধের ডাক দেন। পশ্চিমা রাজাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ ভুলে তাদর নির্দেশ মেনে চলার আহ্বান জানান। তিনি একে ঈশ্বরের যুদ্ধ বলে অভিহিত করেন এবং এই যুদ্ধে বা জেরুজালেম যাত্রাপথে নিহতদের জন্য পূর্ণ পাপমুক্তির ঘোষণা দেন।

প্রথম ক্রুসেড

প্রথম ক্রুসেড মূলত দুটি ধাপে বিভক্ত ছিল। প্রথমটি ছিল সাধারণ বা হতদরিদ্র মানুষের ক্রুসেড এবং দ্বিতীয়টি ছিল রাজপুত্র ও অভিজাতদের ক্রুসেড। ১০৯৫ থেকে ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলা প্রথম সাধারণ ক্রুসেডের নেতৃত্ব দেন সন্ন্যাসী পিটার দ্য হারমিট। এই দলে ইউরোপের গৃহহীন, ডাকাত, দরিদ্র কৃষকসহ সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ জড়ো হয়েছিল। 

ওয়াল্টার দ্য পেনিলিসের নেতৃত্বে আরেকটি দল তাদের সাথে যোগ দিয়ে ব্যাপক লুটপাট ও গির্জা ধ্বংসের মতো অপকর্মে মেতে ওঠে। তবে আনাতোলিয়ার সেলজুক রুম সুলতানাত এই বিশৃঙ্খল বাহিনীকে আক্রমণ করে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেয়। যুদ্ধে ওয়াল্টার নিহত হন এবং পিটার দ্য হারমিট পালিয়ে গিয়ে পরবর্তী শক্তিশালী ক্রুসেড বাহিনীর সাথে যোগ দেন।

ক্রুসেড়ের দ্বিতীয় ধাপ

পরবর্তী রাজপুত্রদের ক্রুসেডে (১০৯৬-১০৯৯ খ্রিস্টাব্দ) ক্রুসেডারদের শক্তি ও রণকৌশল পুরোপুরি বদলে যায়। সুসংগঠিত এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ইউরোপের বাঘা বাঘা রাজপুত্র ও নাইটরা। যাদের মধ্যে ডিউক গডফ্রে অব বুইয়ন, তার ভাই বল্ডউইন, রেমন্ড অব টুলুজ এবং নরম্যান বীর বোহেমন্ড ও তার ভাগ্নে তানক্রেড অন্যতম। 

এই সুসজ্জিত বাহিনী মুসলিম ভূখণ্ডে প্রবেশ করে বিভক্ত ও দুর্বল সেলজুক বাহিনীকে পরাজিত করে। যার চূড়ান্ত পরিণতিতে তারা জেরুজালেম দখল করতে সক্ষম হয়। ক্রুসেডাররা মনে করেছিল, পবিত্র ভূমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে তারা তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেছে।

১০৯৯ থেকে ১১১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ক্রুসেডাররা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে চারটি প্রধান রাজ্যে বিভক্ত করে নেয়। এগুলো হলো:

  • ১. কাউন্টি অব এডেসসা (১০৯৮ খ্রিস্টাব্দ): দজলা ও ফোরাত নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এই অঞ্চলের রাজধানী ছিল এডেসসা।
  • ২. প্রিন্সিপালিটি অব অ্যান্টিওক (১০৯৮ খ্রিস্টাব্দ): এটি এডেসসার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল ছিল।
  • ৩. কাউন্টি অব ত্রিপলি (১১০৯ খ্রিস্টাব্দ): লেবাননের উপকূলে অবস্থিত এটি ছিল ক্রুসেডারদের সবচেয়ে ছোট রাজ্য।
  • ৪. কিংডম অব জেরুজালেম (১০৯৯ খ্রিস্টাব্দ): বর্তমান ফিলিস্তিন ও লেবাননের সিংহভাগ এলাকা নিয়ে গঠিত এই রাজ্যের রাজধানী ছিল জেরুজালেম।

পরাজয়ের মূল কারণ অনৈক্য

ক্রুসেডারদের এই আগ্রাসনের পথ মূলত মসৃণ করেছিল সিরিয়া ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের মুসলিম শাসকদের রাজনৈতিক অনৈক্য। ঐতিহাসিক ইবনুল ওয়ার্দির মতে, যখন ক্রুসেডাররা একের পর এক শহর দখল করছিল, তখন সিরিয়ার শাসকেরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন। 

ঐতিহাসিক ইবনে কাসির তার বর্ণনায় এই অনৈক্য ও বিশ্বাসঘাতকতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। অ্যান্টিওক পতনের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, কতিপয় প্রহরীর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ক্রুসেডাররা সহজেই অ্যান্টিওক দুর্গে প্রবেশ করে। শহরের শাসক সামান্য কিছু সঙ্গী নিয়ে পালিয়ে যান এবং পরে নিজের এই ভীরুতার জন্য অনুতপ্ত হয়ে পথেই জ্ঞান হারিয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যান। পরে এক রাখাল তার মাথা কেটে ক্রুসেডারদের কাছে নিয়ে যায়।

ঐতিহাসিক সাইদ আশুরের মতে, অ্যান্টিওকের পতন মুসলিমদের মনে চরম ভীতি তৈরি করেছিল। তবে খ্রিস্টানদের জন্য এটি ছিল এক বিশাল বিজয়। কারণ রোমান সাম্রাজ্যের তৃতীয় বৃহত্তম এই শহরটির ধর্মীয় ও কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

পরবর্তীতে মসুলের শাসক কারবুকা, দামেস্কের দুকাক এবং হোমসের জানাহ আদ-দাওলা একত্রিত হয়ে ক্রুসেডারদের প্রতিহত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অ্যান্টিওকের যুদ্ধে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এরপর ক্রুসেডাররা মারাত আল-নুমান শহর অবরোধ করে তা দখল করে নেয়।

বাগদাদের খলিফা এই মহাবিপদের সময়েও কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন। ফিলিস্তিন ও সিরিয়া থেকে আগত শরণার্থীরা যখন বাগদাদের জামে মসজিদে জুমার নামাজে দাঁড়িয়ে ক্রুসেডারদের নির্মম হত্যাকাণ্ড ও নারী-শিশু বন্দি করার করুণ কাহিনী বর্ণনা করে ক্রন্দন করছিলেন, তখন পুরো বাগদাদ শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। জনগণের তীব্র চাপের মুখে খলিফা শুধু একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে সেলজুক সুলতানের দরবার হামাদানে পাঠান। কিন্তু পথিমধ্যে সেলজুকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উজির খুনের খবর পেয়ে সেই প্রতিনিধি দল কোনো সমাধান ছাড়াই বাগদাদে ফিরে আসে।

শাসকদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা জনমত

তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সাধারণ জনগণ ও উলামা সমাজ শাসকদের এই নির্লিপ্ততা মেনে নেননি। ১১১০ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের একদল ফকিহ ও সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্যোগে জিহাদের জন্য সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। যদিও ক্রুসেডারদের বিশাল বাহিনীর খবর পেয়ে অনেকেই পথ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

পরবর্তী সময়ে বাগদাদের সাধারণ মানুষ সিরিয়ার বিপন্ন মুসলিমদের সাহায্যে এক অভূতপূর্ব বিদ্রোহ গড়ে তোলে। খলিফা যখন সেলজুক সুলতানের বোনের সাথে তার রাজকীয় বিয়ের জমকালো আয়োজনে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখন আলেপ্পো থেকে আসা একদল হাশেমী শরিফ, সুফি, ব্যবসায়ী ও ফকিহ বাগদাদের সুলতান মসজিদে গিয়ে খতিবকে মিম্বর থেকে নামিয়ে দিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেন। তারা জুমার নামাজ বন্ধ করে দেন। এর পরের জুমায় খলিফার মসজিদে গিয়েও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই ঘটনায় খলিফার বিয়ের আনন্দ অনেকটাই মাটি হয়ে যায়। খলিফা এই আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের শাস্তি দিতে চাইলে সেলজুক সুলতান মুহাম্মদ বিন মালিকশাহ জনগণের ক্ষোভের যৌক্তিকতা অনুধাবন করে খলিফাকে নিরস্ত করেন এবং তার আমিরদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন।

সুলতান বাধ্য হয়ে একটি বড় সৈন্যদল পাঠান, যা সাময়িকভাবে জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করে। এই বাহিনী কয়েকটি ক্রুসেডার দুর্গ জয় করলেও শেষ পর্যন্ত মুসলিম আমিরদের পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে অভিযানটি সফল হতে পারেনি।

অথচ এই চরম সংকটের সময়েও খলিফা ও সুলতানের দরবারে রাজকীয় বিয়ের জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব চলছিল, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

পুনরুত্থানের সূচনা

শাসকদের এই উদাসীনতার বিপরীতে আলেম ও ফকিহরা হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। তারা সিরিয়া ও উত্তর ইরাকের যোগ্য সামরিক কমান্ডারদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। যার ফলশ্রুতিতে ১১১৩ খ্রিস্টাব্দে ফিলিস্তিনের তাবারিয়া হ্রদের কাছে মুসলিম বাহিনী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে।

এই যুদ্ধের মাধ্যমেই ইতিহাসে বীর মুজাহিদ ইমাদউদ্দিন জেনকির উত্থান ঘটে। সুলতান মুহাম্মদ বিন মালিকশাহ যখন মসুলে আক সানকার আল-বুরসুকিকে গভর্নর নিযুক্ত করেন, তখন ইমাদউদ্দিন তার সাথে যোগ দিয়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে একের পর এক সফল অভিযান পরিচালনা করেন।

ইতিহাসের এই পরিক্রমা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও আলেমদের জাগ্রত জনমতই মুসলমানদের পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করেছিল। আর এই চেতনা থেকেই পরবর্তীতে আক সানকার আল-বুরসুকি, ইমাদউদ্দিন, নুরুদ্দিন মাহমুদ এবং সর্বশেষে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির মতো বীরদের আবির্ভাব ঘটে, যারা দীর্ঘ দুই শতকের ক্রুসেডার রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে পবিত্র জেরুজালেমকে মুক্ত করেছিলেন।

এনটি