বিজ্ঞাপন

রাসুল (সা.) যেভাবে তরুণদের প্রতিভা কাজে লাগিয়েছিলেন

রাসুল (সা.) যেভাবে তরুণদের প্রতিভা কাজে লাগিয়েছিলেন

ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ অবদান রেখেছেন যুবক ও তরুণ সাহাবিরা। সমাজের পরিবর্তনে তাদেরকে বিশেষভাবে কর্ম-দক্ষ ও কাজে লাগিয়েছিলেন রাসুল (সা.)। পরবর্তীতে এই তরুণরাই ইসলামের ইতিহাসে প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। রাসুলের (সা.) সেই যুব ক্ষমতায়ন কীভাবে তাদের একেকজনকে দৃঢ় ও প্রথিতযশা ব্যক্তিতে পরিণত করেছিল, তা তুলে ধরা হয়েছে।

যুবকদের মতামতকে গুরুত্ব প্রদান

আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত— বহুল প্রচলিত এই উক্তি আমরা সবাই কম-বেশি শুনেছি। নেলসন ম্যান্ডেলার এই বিখ্যাত উক্তি সমাজের তরুণদের গ্রহণ করতে, তাদের কাজে নিযুক্ত করতে এবং তাদের ক্ষমতায়ন করতে সমাজকে অনুপ্রাণিত করে। দুর্ভাগ্যবশত, বিগত কয়েক প্রজন্ম ধরে এই চর্চায় ঘাটতি দেখা গেছে এবং এটি ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। এমনকি অতীতেও তরুণরা প্রতিনিয়ত অনুভব করেছেন যে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হয় না এবং তাদের মতামতের মূল্যায়ন করা হয় না। প্রায়শই তারা সামাজিক পরিবর্তন ও জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম ও সুযোগ পান না।

তবে আমরা যদি ইতিহাসের পাতায় ফিরে যাই এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)- এর জীবনের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব যে তিনি সমাজের এই তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষভাবে নজর দিয়েছিলেন। তরুণদের শুধু দেখাই নয়, বরং তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং তাদের চিন্তাভাবনা ও জীবনকে আলোকিত ও ক্ষমতায়ন করার বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করেছিলেন।

তরুণদের প্রতিভাকে গুরুত্ব প্রদান

সেই সময় জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) নামের এক কিশোর ছিলেন, যার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বদরের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আকুতি জানান, যাতে কুরাইশদের দ্বারা তাদের লুণ্ঠিত সম্পদ ও অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু অত্যন্ত কম বয়স এবং শারীরিকভাবে সক্ষম না হওয়ার কারণে রাসুল সা. তাকে যুদ্ধের অনুমতি দেননি।

তবে রাসুল (সা.) তাকে একেবারে হতাশ বা খারিজ করে দেননি। বরং জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে তাকে ভিন্ন এক ক্ষেত্রে ক্ষমতায়ন করেন। দূরদর্শী মহানবী (সা.) জায়েদের ভেতরের জ্ঞানতৃষ্ণা এবং ইসলামের প্রতি তার আন্তরিকতা লক্ষ্য করেছিলেন। তাই তিনি জায়েদকে হিব্রু ও সুরিয়ানি ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রাসুল (সা.)- এর অন্যতম প্রধান দাপ্তরিক লেখক এবং দোভাষী হিসেবে নিযুক্ত হন।

এক কিশোরের ওপর রাসুল সা. এর এই আস্থা ও বিশ্বাস পরবর্তীকালে ইতিহাসের এক বিশাল মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ইয়ামামার যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক হাফেজে কোরআন শাহাদাত বরণ করেন। ফলে মুসলিম সমাজের মধ্যে এক ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয় যে, এভাবে চলতে থাকলে হয়তো এক সময় কোরআনের কোনো হাফেজ বেঁচে থাকবেন না এবং কোরআন চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

রাসুল (সা.)- এর জীবদ্দশায় কোরআন কেবল বিভিন্ন বস্তু যেমন হাড়, চামড়া ও পশুর চামড়ার ওপর বিক্ষিপ্তভাবে লেখা ছিল। ফলে প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রা. এর শাসনামলে এই বিক্ষিপ্ত লেখাগুলোকে একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ আকারে সংকলন করার এক ঐতিহাসিক ও চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এই বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নিযুক্ত করা হয় তরুণ জায়েদ ইবনে সাবিতকে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি অত্যন্ত নিখুঁত ও যত্নসহকারে পবিত্র কোরআন সংকলন করতে সক্ষম হন।

সমাজের এবং ধর্মের কল্যাণে জায়েদের ভেতরের যে সম্ভাবনা ও প্রতিভা ছিল, রাসুল (সা.) তা বুঝতে পেরেছিলেন এবং তার পেছনে মেধার বিনিয়োগ করেছিলেন। রাসুল (সা.)- এর চরিত্র ছিল এমন।

তরুণদের কাঁধে দায়িত্ব অর্পণ

মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) ছিলেন রাসুল (সা.) এর এমন একজন সাহাবি, যিনি খুব অল্প বয়স থেকেই নিজের বুদ্ধিমত্তার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। এই যোগ্যতার কারণে কুরাইশদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা ও সমাবেশে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন তিনি। রাসুল (সা.) এর চারপাশে অনেক প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও নামী সাহাবি থাকা সত্ত্বেও তিনি তরুণদের নেতৃত্ব ও দায়িত্ব দিতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেননি।

নবুয়তের প্রাথমিক দিনগুলোতে মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) মানুষের মাঝে ইসলাম সম্পর্কে জানার ও শেখার আগ্রহ প্রবল হয়ে ওঠে। তখন মহানবী (সা.) মদিনার মানুষের কাছে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য মুসআব (রা.)-কে ইসলামের প্রথম দূত হিসেবে মনোনীত করে সেখানে পাঠান।

সাফিউর রহমান মোবারকপুরী রচিত আর-রাহিকুল মাখতুম (দ্য সিলড নেক্টার) গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, মুসআব (রা.) মদিনায় অবস্থান করে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সফলতার সঙ্গে তার মিশন চালিয়ে যান, যার ফলে মদিনার আনসারদের প্রায় প্রতিটি ঘরেই পুরুষ ও নারীদের মধ্যে ইসলামের আলো পৌঁছে গিয়েছিল।

এই কারণেই রাসুল (সা.) ছিলেন ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মুরব্বি বা মেন্টর ও ট্রেইনার। তিনি জানতেন যে মুসআব (রা,) এই কঠিন কাজের জন্য পুরোপুরি যোগ্য। তাই বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাকে এত বড় এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব দিয়ে ক্ষমতায়ন করেছিলেন।

তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আত্মিক সম্পর্ক

একটি ঘটনার কথা জানা যায়, এক যুবক রাসুল (সা.)- এর কাছে এসে ব্যভিচার করার অনুমতি চেয়েছিল। রাসুল (সা.) তাকে তিরস্কার বা অপমান না করে অত্যন্ত কোমলতা ও সহানুভূতির সঙ্গে তার কাছে এগিয়ে যান। রাসুল (সা.) তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করার মাধ্যমে নিজের ভুল নিজেই বুঝতে পারার এবং যৌক্তিকভাবে চিন্তা করার সুযোগ করে দেন।

রাসুল সা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, সে নিজে তার মা বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের ক্ষেত্রে এমনটি পছন্দ করবে কিনা? যুবকটি যখন না সূচক উত্তর দিল, তখন রাসুল (সা.) তাকে বোঝালেন যে, একইভাবে অন্য কেউই তাদের পরিবারের নারীদের জন্য এমনটি পছন্দ করবে না। এরপর মহানবী (সা.) তার গুনাহ মাফের জন্য, অন্তর পবিত্র করার জন্য এবং চরিত্র রক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। সেই দিনের পর থেকে ওই যুবক আর কখনো কোনো পাপের দিকে পা বাড়ায়নি।

এই ঘটনা থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, রাসুল (সা.)- এর চারপাশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা তার কাছে এতটাই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন যে, তারা তাদের মনের একদম ভেতরের কথা বা অনুভূতিও দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করতে পারতেন। রাসুল (সা.) তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের পথ সব সময় খোলা রাখতেন এবং সুদৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখতেন।

দ্বিতীয়ত, এমন পরিস্থিতিতে যে কেউ সাধারণত স্তব্ধ বা বিরক্ত হতে পারতেন। কিন্তু রাসুল (সা.) তরুণদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও মনস্তত্ত্বের প্রতি সব সময় সহানুভূতিশীল ও সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি তরুণদের সমস্যা বা সংকটকে কখনো উড়িয়ে দেননি। তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এটিই ছিল রাসুল (সা.) এর অনন্য শৈলী।

ভালোবাসা ও স্নেহের প্রতীক হিসেবে তরুণদের বিশেষ উপহার প্রদান

আল্লাহর রাসুলের (সা.) চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন অত্যন্ত অনুসন্ধিৎসু ও জ্ঞানপিপাসু। তিনি তার বেশিরভাগ সময় রাসুল (সা.) এর সান্নিধ্যে কাটাতেন, যাতে তার কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করা যায় এবং যতটা সম্ভব তার খেদমত করা যায়। তার এই নিষ্ঠা ও আগ্রহ দেখে রাসুল (সা.) গভীর ভালোবাসা ও স্নেহের নিদর্শনস্বরূপ তার জন্য একটি বিশেষ দোয়া করেন।

বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবনে আব্বাসের কাধে হাত রেখে দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাকে কোরআনের তাফসির শিক্ষা দিন। (মুসনাদ আহমাদ)

রাসুল (সা.) এর কাছ থেকে লাভ করা এই আধ্যাত্মিক আলোর ফলেই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ইসলামের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট ও প্রখ্যাত মুফাসসির হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, যিনি অসংখ্য হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং কোরআনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আর এই সবকিছুই ঘটেছিল রাসুল (সা.) এর ওফাতের সময়, যখন ইবনে আব্বাসের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর।

অন্য একটি ঘটনার কথা জানা যায়, একবার ভ্রমণের সময় দুজনে যখন একসঙ্গে সওয়ারিতে ছিলেন, তখন রাসুল (সা.) ইবনে আব্বাস (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, হে তরুণ, আমি তোমাকে কিছু মূল্যবান কথা বা উপদেশ শেখাচ্ছি; তুমি আল্লাহর বিধানের হেফাজত করো, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির খেয়াল রাখো, তাকে তোমার সামনেই পাবে। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চেও। যখন কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হবে, আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা কোরো।

জেনে রেখো, যদি জগতের সমস্ত সৃষ্টিও তোমার কোনো উপকার করার জন্য একত্রিত হয়, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার ভাগ্যে যা লেখা আছে, তার বাইরে তারা তোমার বিন্দুমাত্র উপকার করতে পারবে না। আর যদি তারা সবাই মিলে তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায়, তবে আল্লাহ তোমার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে তারা তোমার কোনো ক্ষতিও করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং খাতা শুকিয়ে গেছে। (সুনান আত-তিরমিজি)

তরুণ চাচাতো ভাইয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও স্নেহের কারণে মহানবী (সা.) এমন এক জীবনদর্শন উপহার দিয়েছিলেন, যা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জীবনের যেকোনো পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আজীবন পথ দেখিয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, রাসুলুল্লাহ সা. সব সময় তরুণদের অগ্রগতি ও উন্নয়নের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন ও রাষ্ট্র গঠনে তরুণরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তাই এই যুব দিবসে আসুন আমরা আমাদের তরুণদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখি; তাদের কথা শুনি, তাদের ক্ষমতায়ন করি এবং তাদের হাত ধরেই পরিবর্তন আসুক। কারণ আজকের তরুণরাই যে আগামী দিনের নেতা ও ভবিষ্যত।