বিজ্ঞাপন

রিজিক লাভের জন্য মানুষের এতো কষ্ট করতে হয় কেন?

রিজিক লাভের জন্য মানুষের এতো কষ্ট করতে হয় কেন?

পবিত্র কোরআনে রিজিক শব্দটি ১২৩ বার ব্যবহার হয়েছে। এর প্রায় প্রতিটিতেই মূলত এই বিষয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, রিজিক শুধু মহান আল্লাহর কাছ থেকে আসে। দুনিয়াতে একজন মানুষ ঠিক কী কী লাভ করবে, তা একমাত্র তিনিই নির্ধারণ করেন। আল্লাহ আমাদের সুখ দেন এবং তিনিই আমাদের দুঃখের উপলক্ষগুলো তৈরি করেন। আল্লাহ নাম আর-রাজিক এবং আর-রাজ্জাক অর্থাৎ রিজিকদাতা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নিজেই এর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ নিজে রিজিকদাতা এবং তিনি প্রবল শক্তির অধিকারী। (সুরা আজ-জারিয়াত, আয়াত :৫৮)। অন্য আয়াতে এসেছে, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোত্তম রিজিকদাতা। (সুরা আল-হাজ্জ, আয়াত :৫৮)।

রিজিক আগে থেকেই নির্ধারিত

রিজিকের ধারণাটি সত্যিই দারুণ।  আপনি যখন একটি ফল খাচ্ছেন, সেটিও কিন্তু আগে থেকেই আপনার জন্য নির্ধারিত ছিল। ফলের গাছটিতে মুকুল আসার পর থেকে নানা হাত ঘুরে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেটি শেষ পর্যন্ত আপনার হাতে এসে পৌঁছেছে। কারণ এই রিজিক আপনার জন্যই বরাদ্দ ছিল।

একটি বিখ্যাত হাদিসে মানুষের সৃষ্টির প্রাথমিক স্তরগুলোর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মায়ের গর্ভে প্রথম ৪০ দিন বীর্য, পরের ৪০ দিন রক্তপিণ্ড এবং তার পরের ৪০ দিন মাংসপিণ্ড হিসেবে মানুষ বড় হতে থাকে। এরপর হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠান এবং সে তার মধ্যে রুহ ফুঁকে দেয়। একই সঙ্গে ফেরেশতাকে চারটি বিষয় লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাহলো, শিশুটির রিজিক বা জীবিকা, তার আয়ুষ্কাল, তার কর্ম এবং সে কি ভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগ্যবান হবে। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, জীবনের অন্যান্য বিষয়ের মতো রিজিকও আল্লাহ তায়ালা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। তবে তা বোঝার দুটি উপায় রয়েছে।

১. কেউ হয়তো তার এই দারিদ্র্য বা দুর্দশার জন্য ভাগ্যকে দোষারোপ করতে পারে। এমনকি তারা হয়তো বলতে পারে যে, ভাগ্য আগে থেকে লেখা থাকায় তাদের পক্ষে আর কখনো ভালো জীবনযাপন করা সম্ভব নয়।

২. আবার আমরা এটাও মেনে নিতে পারি যে, সুখ ও দুঃখ দুটোই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তাই একজন মুসলমান হিসেবে নিজের অবস্থার উন্নতির জন্য যথোপযুক্ত চেষ্টা বা পরিশ্রম করা জরুরি।

প্রকৃতপক্ষে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কী ঘটছে তা না দেখে কারও পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয় যে, আমার ভাগ্যে আজীবন অল্প রিজিক লেখা আছে। একইভাবে, যা এখনো ঘটেনি তা নিয়ে আগে থেকে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।

পরিশ্রমের গুরুত্ব এবং রিজিকের বিভিন্ন রূপ

রিজিক আগে থেকে নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষকে তা অন্বেষণের জন্য সঠিক চেষ্টা করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাখি বা অন্যান্য জীবজন্তুর জীবনযাত্রার দিকে তাকালে আল্লাহর এই নিয়মটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে তারা বেঁচে থাকে এবং বংশবৃদ্ধি করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদিসে বলেছেন, তোমরা যদি আল্লাহর ওপর সঠিক উপায়ে ভরসা বা তাওয়াক্কুল করতে, তবে তোমাদের ঠিক সেভাবেই রিজিক দেওয়া হতো যেভাবে পাখিদের দেওয়া হয়। তারা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে নীড়ে ফেরে। (সুনান আত-তিরমিজি)।

একজন মুমিন হিসেবে রিজিক অন্বেষণের ক্ষেত্রে বিশ্বাস ও পরিশ্রমের মধ্যকার সুক্ষ্ম সম্পর্কটি বোঝা দরকার। কোনো চেষ্টা না করে শুধু বিশ্বাসের ওপর ভর করে বসে থাকা মোটেও যথেষ্ট নয়। আবার এর উল্টোটা করা, অর্থাৎ আল্লাহর ওপর ভরসা না রেখে শুধু নিজের চেষ্টার ওপর শতভাগ নির্ভর করাও এক ধরনের বিভ্রান্তি। এটি মানুষকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

উদাহরণ হিসেবে একজন ট্যাক্সি চালকের কথা ধরা যাক। চালক যদি শুধু যাত্রীর জন্য দোয়া করে এক জায়গায় বসে থাকেন, তবে হয়তো মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীটিকে তিনি কখনোই পাবেন না। অন্যদিকে, তিনি যদি আল্লাহর ওপর ভরসা না রেখে কেবল নিজের শক্তিতে পুরো শহর চষে বেড়ান, তবে তিনি মূলত প্রকৃত রিজিকদাতাকেই ভুলে গেলেন। ফলে নিজের সাফল্য বা ব্যর্থতাকে তিনি কেবল নিজের চেষ্টার ফল মনে করে ভুল করবেন।

একজন মুমিনকে বুঝতে হবে যে, তিনি ঘরে যা কিছু নিয়ে আসছেন তা আল্লাহর দেওয়া রিজিকের একটি অংশ মাত্র। সারাদিন কোনো দুর্ঘটনা ছাড়া নিরাপদে কাটানো এবং দিনশেষে পরিবারের সবাই একসঙ্গে এক ছাদের নিচে জড়ো হতে পারাও এক প্রকার রিজিক। সন্তানরা ভালোভাবে পড়াশোনা করে ভালো মুসলমান হিসেবে গড়ে উঠছে—এটিও রিজিক। আল্লাহ আমাদের এত কিছু দেন যা আমরা প্রায়ই খেয়াল করি না, বরং আমাদের চোখ কেবল বিপদের পরীক্ষাগুলোর ওপরই আটকে থাকে।

এনটি