তারেক বিন জিয়াদ ছিলেন সেই মুসলিম বীর যিনি মাত্র কয়েক হাজার মুজাহিদ নিয়ে হিজরি প্রথম শতকে ইসলামী সাম্রাজ্যের শেষ সীমানা তথা দূর মরক্কোর উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। আন্দালুসিয়া দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের হৃদপিণ্ডে ইসলামী খেলাফতের ভিত্তি মজবুত করেন। অথচ কনস্টান্টিনোপলের মতো সমমানের কৌশলগত ও প্রতীকী গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল জয় করতে মুসলমানদের কয়েক শতাব্দী লেগেছিল।
অধিকাংশ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, তারেক বিন জিয়াদ ছিলেন বার্বার বা আমাজিঘ বংশোদ্ভূত। তিনি উমাইয়া বংশের সেনাপতি হিসেবে বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল নিয়ে গঠিত আইবেরিয়ান উপদ্বীপের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি এক অজ্ঞাত সৈনিক হিসেবে ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যান। তার কোনো সমাধি কিংবা স্মৃতি চিহ্ন আজ অবশিষ্ট নেই। উমাইয়া খেলাফতের তৎকালীন রাজধানী দামেস্কে গিয়ে বিজয়ের বিপুল ধনসম্পদ বুঝিয়ে দেওয়ার পর থেকেই ইতিহাসের দলিলপত্র থেকে তিনি চিরতরে আড়ালে চলে যান।
আমাজিঘ সেনাপতির নেতৃত্বে বিজয় অভিযান
তারেক বিন জিয়াদ ৫০ হিজরি মোতাবেক ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান আলজেরিয়ার ওরান প্রদেশের একটি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তার বংশপরিচয় নিয়ে তিনটি বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রথম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী তিনি আফ্রিকার বার্বার বংশোদ্ভূত। দ্বিতীয় মতে তিনি হামদানের পারস্য বংশোদ্ভূত এবং তৃতীয় মতে তিনি হাজরামাউতের আরব বংশের সন্তান।
দারুল ফিকর আল-আরাবি থেকে প্রকাশিত হুসাইন শুয়াইবের তারেক বিন জিয়াদ, ফাতেহ আল-আন্দালুস, শখসিয়াত মিনাত তারিখ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, এই মুসলিম সামরিক কমান্ডার মরক্কোর পাহাড়ি অঞ্চলের একটি আমাজিঘ গোত্রের অধিবাসী ছিলেন। এই গোত্রটি তাদের চরম সাহসিকতা, যুদ্ধপ্রিয়তা এবং স্বাধীনচেতা স্বভাবের জন্য পরিচিত ছিল এবং ইসলাম গ্রহণের আগে তারা মূর্তিপূজক ছিল।
তারেক বিন জিয়াদের আদি পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, তিনি আফ্রিকার গভর্নর মুসা বিন নুসাইরের মুক্ত করে দেওয়া দাস ও অন্যতম প্রধান বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন। মুসা তার ওপর এতটাই আস্থা রাখতেন যে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আন্দালুসিয়া অভিযানের সময় নিজের সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ নেতৃত্ব তার হাতেই তুলে দিয়েছিলেন।
মুসা বিন নুসাইরের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্তদের তালিকায় তারেক বিন জিয়াদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি কিছুটা রহস্যে ঘেরা। কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে, এই আমাজিঘ সেনাপতি তার পুরো গোত্রসহ ইসলাম গ্রহণ করেন। আবার অন্য বর্ণনায় বলা হয়, ওকবা বিন নাফির উত্তর আফ্রিকা বিজয়ের পর তার জন্ম হয়েছিল এবং তিনি পবিত্র কোরআন ও হাদিস শিক্ষার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ইসলামী পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।
যে বর্ণনাগুলো তারেক বিন জিয়াদের ইসলাম পূর্ববর্তী সময়ে মূর্তিপূজক থাকার কথা বলে, তাদের মতে তিনি মুসা বিন নুসাইরের হাতেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মুসা তাকে এতটাই পছন্দ করতেন যে, ৮৭ হিজরি মোতাবেক ৭০৬ খ্রিস্টাব্দে তাকে আফ্রিকার কার্থেজের দায়িত্ব দেন। এরপর এই সামরিক কমান্ডার সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকেন এবং একপর্যায়ে তার নাম আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যবর্তী প্রণালী পার হওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তার সেনাবাহিনী যে পাহাড়ি অঞ্চলে অবতরণ করেছিল, সেটি পরবর্তী সময়ে তার নামানুসারেই জাবাল আল-তারিক বা জিব্রাল্টার নামে পরিচিতি লাভ করে।
বার্বার সেনাবাহিনী ও আন্দালুসিয়া জয়ের স্বপ্ন
তারেক বিন জিয়াদ তার প্রাথমিক যুদ্ধগুলোতে স্থানীয় পৌত্তলিক গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে যে রণনৈপুণ্য ও সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তার পাশাপাশি ঐতিহাসিক সূত্রগুলো বলে যে, ভূমধ্যসাগরের উত্তর তীরে অভিযান চালানোর একটি সুপ্ত স্বপ্ন তিনি মনের ভেতর লালন করতেন।
ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া আন্দালুসিয়া বিজয়ের মূল দায়িত্ব পাওয়ার আগে, সমুদ্র পার হওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে মুসা বিন নুসাইর তাকে মরক্কোর তাঞ্জিয়ার শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন। কিছু ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, আন্দালুসিয়া অভিমুখী মুসলিম সেনাবাহিনীর সিংহভাগ সদস্যই ছিল বার্বার বংশোদ্ভূত, আর তাই তাদের নেতৃত্ব দেওয়া এবং উদ্বুদ্ধ করার জন্য তারেক বিন জিয়াদই ছিলেন সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।
তাঞ্জিয়ার শহরে তারেক বিন জিয়াদের অবস্থান ও শাসনের ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে মরক্কোর পাহাড়ি শহর শেফশাওয়ানের কাছাকাছি শারাফাত অঞ্চলে একটি মসজিদের উল্লেখ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, এটিই সুদূর মরক্কোর মাটিতে নির্মিত প্রথম মসজিদ। মসজিদটি আজও তারেক বিন জিয়াদের নামেই টিকে আছে এবং কিছু ঐতিহাসিক একে আন্দালুসিয়া অভিযানের সূচনাবিন্দু হিসেবে মনে করেন। কারণ এই অঞ্চলটি তাঞ্জিয়ার শাসনকালে তারেক বিন জিয়াদের সেনাবাহিনীর সামরিক ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং সেই ক্যাম্পের প্রয়োজনেই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
উমাইয়া পতাকাতলে সেউতা ও আন্দালুসিয়ার প্রবেশদ্বার
আন্দালুসিয়া বিজয়ের স্বপ্ন মুসলমানদের মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল ৬২ হিজরি মোতাবেক ৬৮১ খ্রিস্টাব্দের দিকে, যখন ওকবা বিন নাফি উত্তর আফ্রিকা জয় করে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল তথা তাঞ্জিয়ার শহরে পৌঁছেছিলেন। তৎকালীন শাসক জুলিয়ান বা ইয়ালিয়ান আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোনো উপায় না দেখে মুসলমানদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন, তবে নিজের সুরক্ষায় সেউতা দুর্গটি নিজের কাছেই রাখেন। উত্তর আফ্রিকা বিজয় সম্পন্ন হওয়ার পর মুসা বিন নুসাইর কায়রোয়ানকে রাজধানী করে সেখানকার গভর্নর হন। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর মুসলমানদের দৃষ্টি পড়ে ভূমধ্যসাগরের উত্তর পাড়ে আন্দালুসিয়া জয়ের দিকে।
মরক্কোর আন্দালুসিয়া বিষয়ক গবেষক মোহাম্মদ মিফতাহ জানান, মরক্কোয় ইসলামী অভিযান ওকবা বিন নাফির হাত ধরে শুরু হলেও এর পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে মুসা বিন নুসাইরের আমলে। আর মুসার বিশ্বস্ত সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ উত্তর মরক্কোর দিকে অগ্রসর হন এই বিজয়কে চূড়ান্ত রূপ দিতে।
তিনি আরও বলেন, তাঞ্জিয়ারের দিকে যাওয়ার পথে তারেক বিন জিয়াদ শারাফাত অঞ্চলে যাত্রাবিরতি করেন এবং সেখানে বর্তমান মসজিদটি নির্মাণ করেন। মিফতাহের মতে, তারেক বিন জিয়াদ তাঞ্জিয়ার যাওয়ার পথে ইউরোপে প্রবেশের প্রধান মাধ্যম সেউতা শহরের ওপর নজর রাখছিলেন। অবশেষে ৯২ হিজরি মোতাবেক ৭১০ খ্রিস্টাব্দে সেউতার শাসক বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের আনুগত্য ত্যাগ করে তাঞ্জিয়ারের মুসলিম গভর্নরের অধীনে চলে আসেন।
খলিফার আদেশে তারিফ দ্বীপ অভিযান
আন্দালুসিয়ার তৎকালীন গথিক রাজা রডারিক বা লাদরিকের সঙ্গে প্রতিবেশী অন্যান্য খ্রিস্টান রাজাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মুসলমানদের এই অঞ্চলটি আক্রমণের সিদ্ধান্তকে আরও বেগবান করে। সেই রাজাদের সঙ্গে খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের চিঠিপত্র আদান-প্রদানের পর, খলিফা মুসা বিন নুসাইরকে আন্দালুসিয়া অভিযানের নির্দেশ দেন। আর মুসা এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য বেছে নেন তারেক বিন জিয়াদকে।
সেউতার শাসক জুলিয়ান মুসলমানদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আন্দালুসিয়া আক্রমণে তীব্রভাবে প্ররোচিত করছিলেন এবং সেখানে বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ পাওয়ার লোভ দেখানোর পাশাপাশি নিজে পথপ্রদর্শক হওয়ার প্রস্তাব দেন।
একজন দূরদর্শী সামরিক নেতা হিসেবে মুসা বিন নুসাইর সতর্ক পথ অবলম্বন করেন এবং মূল যুদ্ধের আগে পরিস্থিতি পরখ করতে ছোট ছোট ছোট দল পাঠিয়ে এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি সেউতা থেকে সমুদ্রের সবচেয়ে কাছের বিন্দুতে একটি ছোট অনুসন্ধানকারী দল পাঠান এবং এর নেতৃত্ব দেন তারিফ বিন মালিক নামের এক আমাজিঘ কমান্ডারকে।
জুলিয়ান মুসলিম সৈন্যদের পারাপারের জন্য চারটি জাহাজ সরবরাহ করেন। সৈন্যরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে একটি দ্বীপে অবতরণ করে, যা আজ পর্যন্ত সেই আমাজিঘ কমান্ডারের নামানুসারে তারিফ দ্বীপ নামে পরিচিত। এটি ছিল ৯১ হিজরির রমজান মাস মোতাবেক ৭১০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাস। সেউতা থেকে যাত্রা করে তারা পালোমা দ্বীপে নামে, যার পরবর্তী নাম হয় তারিফ দ্বীপ।
এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল শত্রুর খবর সংগ্রহ করা, দেশের ভৌগোলিক প্রকৃতি ও রণকৌশলগত অবস্থানগুলো সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। এই ছোট দলটি আন্দালুসিয়া বিজয়ের অত্যন্ত ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক খবর নিয়ে ফিরে আসে।
সামরিক দিক থেকে এই অভিযানটি অত্যন্ত সফল ছিল। তারা স্থানীয় সৈন্যদের পরাজিত করার পাশাপাশি প্রচুর ধনসম্পদ এবং ওই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে, যা এক বছর পর মূল ও বৃহৎ অভিযানের পথ সুগম করে।
সমুদ্র পেরিয়ে জাহাজ পোড়ানোর উপাখ্যান
সেনাবাহিনী নিয়ে তারেক বিন জিয়াদের আন্দালুসিয়া পার হওয়ার গল্পে অনেক ধরনের বর্ণনা রয়েছে। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যটি হলো সেউতার শাসক জুলিয়ানের সহযোগিতা। তারেক বিন জিয়াদ কৌশলে জুলিয়ানের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন, কারণ জুলিয়ানের নিজেরও আন্দালুসিয়ার রাজা রডারিকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আগুন ছিল।
প্রথম সফল অভিযানের পর জুলিয়ান তারেক বিন জিয়াদকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি তার মূল সেনাবাহিনী পারাপারের ব্যবস্থা করবেন। কিছু বর্ণনায় বলা হয়, জুলিয়ান জামিন হিসেবে তার একমাত্র কন্যাকে তারেক বিন জিয়াদের কাছে রেখে আসেন। এরপর জুলিয়ান তার জাহাজগুলো দিয়ে দফায় দফায় তারেক বিন জিয়াদের সৈন্যদের ওপাড়ে পৌঁছে দিতে থাকেন। তারেক বিন জিয়াদ নিজে শেষ দফায় পার হন। প্রণালীতে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের মতো যাতায়াত করায় শত্রুপক্ষ এই সেনা পারাপারের বিষয়টি টেরই পায়নি।
কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়, ওপাড়ে পৌঁছানোর পর তারেক বিন জিয়াদ নিজের সমস্ত জাহাজ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন, যাতে সৈন্যদের সামনে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা না থাকে এবং পিছু হটার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।
কর্ডোবার পতন ও নবী সুলাইমানের (আ.) স্বর্ণের দস্তরখান
স্পেনের মাটিতে পা রাখার পর তারেক বিন জিয়াদ কর্ডোবা শহরের দিকে অগ্রসর হন। সৈন্য সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনী সেখানে জয়লাভ করে। তারেক বিন জিয়াদ কর্ডোবায় প্রবেশ করেছেন এই খবর পাওয়া মাত্রই রাজা রডারিক নিজের বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে শহরটি উদ্ধারের জন্য রওনা হন। শাযরুনা নামক একটি স্থানে মুসলিম ও খ্রিস্টান বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এতে তারেক বিন জিয়াদ জয়ী হন এবং সঙ্গে সঙ্গে টলেডো শহরের দিকে এগিয়ে যান। সেখানে তার মূল লক্ষ্য ছিল হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের ঐতিহাসিক স্বর্ণের দস্তরখান বা টেবিল উদ্ধার করা।
কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে, রডারিক প্রায় এক লাখ অশ্বারোহী সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে মুসলিম বাহিনীর দিকে ধেয়ে আসেন। সে সময় তারেক বিন জিয়াদের সঙ্গে মাত্র সাত হাজার মুসলিম সৈন্য ছিল। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মুসা বিন নুসাইরের কাছে অতিরিক্ত সৈন্য চেয়ে পাঠান এবং মুসা পাঁচ হাজার সৈন্যসহ তারিফ বিন মালিককে তার সহায়তায় পাঠান।
৭১১ খ্রিস্টাব্দের ২৯ এপ্রিল তারেক বিন জিয়াদ পুরো আইবেরিয়ান উপদ্বীপ জয় করে উমাইয়া খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে প্রণালী পার হয়েছিলেন। রাজা রডারিকের মুখোমুখি হওয়ার আগে তিনি যুদ্ধের জন্য একটি উপযুক্ত ময়দান খুঁজছিলেন এবং অবশেষে ওয়াদি বারবাত বা ওয়াদি লাক্কা নামক একটি স্থান বেছে নেন।
প্রণালী পার হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় ৭১১ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুলাই দক্ষিণ স্পেনের কাদিসের কাছাকাছি ওয়াদি লাক্কার ঐতিহাসিক যুদ্ধে তারেক বিন জিয়াদ রাজা রডারিকের বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন।
কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তারেক বিন জিয়াদ নিজেই গথিক রাজাকে হত্যা করেছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয় তিনি তরবারি দিয়ে তাকে আঘাত করেন, আবার কোথাও বলা হয়েছে আহত হয়ে রাজা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী, বিন জিয়াদের নিক্ষেপ করা বর্শার আঘাতেই রডারিকের মৃত্যু হয়েছিল।
মুসা বিন নুসাইরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও খলিফার হস্তক্ষেপ
কিছু ঐতিহাসিক লেখায় পাওয়া যায়, তারেক বিন জিয়াদের এই অভাবনীয় বিজয়ের খবর যখন মুসা বিন নুসাইরের কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি তারেককে যেখানে আছেন সেখানেই থেমে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে চিঠি লেখেন। মুসা নিজেই বাকি অভিযানে নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন যাতে বিজয়ের সমস্ত কৃতিত্ব তার নিজের নামে লেখা হয়। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে তারেক বিন জিয়াদ বুঝতে পেরেছিলেন যে, এখন থেমে গেলে শত্রুপক্ষ আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে। তাই তিনি অভিযান অব্যাহত রাখেন। এই ঘটনাটি সেই বর্ণনাকে সত্যতা দেয় যেখানে বলা হয়েছে, মুসা বিন নুসাইর যখন তারেক বিন জিয়াদের সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হন, তখন তিনি তারেককে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করেন, চাবুক মারেন এবং অবাধ্যতা ও গণিমতের মাল আত্মসাতের অভিযোগে তাকে কারাবন্দি করেন।
কারাগারে থাকা অবস্থায় তারেক বিন জিয়াদ কোনো উপায়ে খলিফার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। এর ফলে খলিফার কঠোর নির্দেশে তিনি দ্রুত মুক্তি পান। এরপর তিনি পুনরায় মুসা বিন নুসাইরের সঙ্গে যোগ দিয়ে আরাগন, কাস্তিল ও কাতালোনিয়া অঞ্চলের দিকে বিজয় অভিযান অব্যাহত রাখেন। স্পেন ও ফ্রান্সের প্রাকৃতিক সীমানা পিরেনিজ পর্বতমালা পর্যন্ত না পৌঁছানো পর্যন্ত তারা থামেননি। সেখানে পৌঁছানোর পর খলিফা ওয়ালিদ মুসা বিন নুসাইরকে অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
এই আদেশের ব্যাখ্যায় ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কেউ বলেন খলিফা ইউরোপের ভেতরে মুসলিমদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করেছিলেন, আবার কেউ বলেন মুসা বিন নুসাইরের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও ক্ষমতা নিয়ে খলিফা শঙ্কিত ছিলেন। মুসা বিন নুসাইর ও তারেক বিন জিয়াদের সম্পর্কটি ছিল বেশ জটিল। যে মুসা শুরুতে তারেককে মূল্যায়ন করেছিলেন এবং যার কারণে তারেক মরক্কোয় একের পর এক সাফল্য পেয়েছিলেন, সেই মুসাই পরবর্তীতে সেনাবাহিনী নিয়ে আন্দালুসিয়া জয়ের পর তারেকের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন।
আন্দালুসিয়া থেকে খেলাফতের কেন্দ্রবিন্দু ও বিস্মৃতির অতল
মুসা বিন নুসাইর ও তারেক বিন জিয়াদ আন্দালুসিয়ার সাবেক রাজপরিবারের শত শত সদস্য এবং বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ নিয়ে সিরিয়ার দামেস্কে খেলাফতের রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাদের ফেরার পথেই খলিফা ওয়ালিদ মৃত্যুবরণ করেন এবং তার ভাই সুলাইমান বিন আবদুল মালিক খলিফা হন। সুলাইমান মুসা বিন নুসাইরকে রাজধানী পৌঁছাতে কিছুটা দেরি করতে বলেছিলেন যাতে খলিফা নিজে বিজয়ের সমস্ত কৃতিত্ব ও ধনসম্পদ নিজের নামে করতে পারেন। কিন্তু পশ্চিম ইউরোপের এই দুই মহান বিজয়ী সেই অনুরোধ শোনেননি। ফলে সুলাইমান খলিফা হওয়ার পর তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হন।
নতুন খলিফা সুলাইমান দ্রুত মুসা বিন নুসাইরকে পদচ্যুত করেন এবং আন্দালুসিয়া বিজয়ে অংশ নেওয়া তার ছেলে আবদুল আজিজকে হত্যা করেন। অন্যদিকে তারেক বিন জিয়াদ এক চরম বিস্মৃতির অধ্যায়ে প্রবেশ করেন। এরপর ইতিহাসের পাতায় তার আর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। তার শেষ পরিণতি নিয়ে নানা মতভেদ আছে। কেউ বলেন তাকে হত্যা বা নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল, আবার কেউ বলেন তিনি সিরিয়ার রাস্তায় রাস্তায় এক দরিদ্র ও নিঃস্ব ভবঘুরে হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন। অবশেষে আনুমানিক ১০১ হিজরি মোতাবেক ৭২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মুসা ও তারেকের মধ্যকার দ্বন্দ্বের আরেকটি গল্প ইতিহাসে প্রচলিত আছে। হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের সেই ঐতিহাসিক স্বর্ণের টেবিলটির গুরুত্ব বুঝতে পেরে তারেক বিন জিয়াদ সেটির একটি আসল পা খুলে সেখানে একটি নকল পা লাগিয়ে দিয়েছিলেন। খলিফার দরবারে পৌঁছে মুসা বিন নুসাইর যখন টেবিলটি নিজের বিজয় স্মারক হিসেবে উপস্থাপন করেন, তখন তারেক বিন জিয়াদ আসল পা-টি খলিফার সামনে হাজির করে প্রমাণ করেন যে এই বিজয়ের মূল নায়ক আসলে তিনি নিজেই। তবে এই গল্পের বিপরীতে আরেকটি মত হলো, খলিফা সুলাইমান নিজেই সেই দুই বীরকে মর্যদাচ্যুত করেছিলেন কারণ তিনি নিজেই আন্দালুসিয়া বিজয়ের একক গৌরব নিতে চেয়েছিলেন।
মুদ্রার প্রতীক ও জিব্রাল্টার রাষ্ট্র
ইউরোপীয়দের যৌথ স্মৃতিতে তারেক বিন জিয়াদ ১৩ শতাব্দী আগে তাদের দেশ আক্রমণকারী এক আরব সেনাপতি হিসেবে চিহ্নিত হলেও, ইউরোপের একটি অঞ্চলে তার ছবি ও নাম মুদ্রার ওপর স্থান দিয়ে তাকে সম্মানিত করা হয়েছে। এটি মূলত জিব্রাল্টার রাষ্ট্র করে থাকে, যা দক্ষিণ স্পেনের শেষ প্রান্তে অবস্থিত একটি ছোট পাহাড়ি অঞ্চল। বর্তমানে ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের অধীনে রয়েছে এই অঞ্চল। এই কৌশলগত অঞ্চলটি ছিল তারেক বিন জিয়াদের পা রাখা প্রথম স্থান এবং আজ পর্যন্ত এটি তার নাম বহন করে চলেছে।
জিব্রাল্টার বর্তমানে ব্রিটিশ রাজমুকুটের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যা দক্ষিণ-পশ্চিম স্পেনের ভূমধ্যসাগর উপকূলে অবস্থিত। প্রায় ৩০ হাজার মানুষের এই অঞ্চলে বসবাস করেন। এখানে বসবাসকারী সিংহভাগ অধিবাসী ইতালীয়, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ ও মাল্টিজ বংশোদ্ভূত।
জিব্রাল্টার এই মুসলিম ব্যক্তিত্বকে তাদের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং সেখান থেকেই তাদের দেশের নামের উৎপত্তি। এখানকার একটি ব্যাংক নোটে তারেক বিন জিয়াদের ছবি রয়েছে যেখানে তাকে তরবারি হাতে দেখা যায় এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছে একটি ইসলামী আর্চ ও পাঁচ কোণা তারকা। ছবির নিচে ল্যাটিন অক্ষরে তারেক বিন জিয়াদের নাম লেখা রয়েছে এবং নোটের বাম পাশে উমাইয়া আমলের ফ্রি ক্যাসল বা মুক্ত দুর্গটির ছবি রয়েছে, যা আজ পর্যন্ত জিব্রাল্টারে বিদ্যমান।
সূত্র : আল জাজিরা
এনটি
