আমাদের প্রতিটি কাজ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একেকটি মাধ্যম। কর্মের ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ফলাফলের পেছনের প্রক্রিয়া ও চেষ্টা। কারণ আমরা যখন আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে ভালো কিছুর আশা করি, তখন আল্লাহ নিজেই তার উত্তম প্রতিদান দেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমাদের সর্বদা তার সন্তুষ্টির সন্ধান করতে হবে এবং সেই পথে অবিচল থাকতে হবে যা তাকে খুশি করে।
এখানে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আটটি উপায় তুলে ধরা হলো:
১. জিকির বা আল্লাহকে স্মরণ করা
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, জেনে রাখো, আল্লাহর জিকির বা স্মরণের মাধ্যমেই কেবল অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। (সূরা আর-রাদ, আয়াত: ২৮)।
জিকির হলো অন্তরে ও মুখে আল্লাহকে স্মরণ করা। যেকোনো সময় বা স্থানে মন ও মননে আল্লাহর কথা চিন্তা করাই জিকির। কেবল ভাবনাই নয়, বিভিন্ন তাসবিহ ও দোয়ার মাধ্যমে মুখে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান যুগে এই জিকিরের গুরুত্ব অপরিসীম। চারপাশের অজস্র বিভ্রান্তি ও ব্যস্ততা থেকে মনকে সরিয়ে প্রকৃত বিষয়ের ওপর মনোযোগ ধরে রাখতে জিকির দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সালাতের পর কিংবা রান্নাবান্না ও গাছে পানি দেওয়ার মতো দৈনন্দিন কাজের সময়ও জিকির করা সম্ভব। বুদ্ধিমান ও বিবেচনাবোধ সম্পন্ন মানুষের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে স্মরণ করে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এগুলো বৃথা সৃষ্টি করেননি। আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, আমাদের দোজখের আগুন থেকে রক্ষা করুন। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯১)।
একবার ভাবুন, আমরা যখন ঘরে কাজ করছি, খাচ্ছি কিংবা পরিবারের সঙ্গে হাসাহাসি করছি, তখনও আমাদের অন্তর যদি আল্লাহর স্মরণে যুক্ত থাকে, তবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই সর্বশক্তিমানের আনুগত্যে কাটবে।
যেকোনো ভালো অভ্যাসের মতো নিয়মিত জিকির করার জন্যও কিছু অনুশীলন ও শৃঙ্খলা প্রয়োজন। ছোট ছোট আমল দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। যেমন— সুবহানাল্লাহ (আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি), আলহামদুলিল্লাহ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর), লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই) এবং আল্লাহু আকবার (আল্লাহ মহান)। এই জিকিরগুলোকে চিরস্থায়ী নেক আমল হিসেবে গণ্য করা হয়, যার প্রতিদান পার্থিব সব আনন্দের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী।
একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন যে, এই জিকিরগুলো নিয়মিত পাঠ করা তার অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তিনি বলেছেন, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলা আমার কাছে সূর্য যা কিছুর ওপর উদিত হয় তার সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়। (সহিহ মুসলিম)।
ঘরের কাজ বা অফিসের কাজের ফাঁকেও পড়ার মতো আরও অনেক জিকির রয়েছে, যা কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত আছে।
২. সালাত বা নামাজ আদায় করা
আমরা যে সফলতা খুঁজছি, তা প্রতিদিন পাঁচবার আমাদের আহ্বান করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। যদি নামাজ ঠিক থাকে, তবে সে সফল ও সার্থক হবে। আর যদি নামাজ ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সুনান আত-তিরমিজি)।
নামাজ শুধু একটি বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং একমাত্র ইবাদত যা রাসুলুল্লাহর (সা.) ঊর্ধ্বগমন বা মেরাজের রাতে আসমানে ফরজ করা হয়েছিল, যা বান্দার সঙ্গে আল্লাহর সরাসরি সংযোগের প্রতীক।
আল্লাহর আরও কাছাকাছি হতে চাইলে নফল, সালাতুল হাজত বা তাহাজ্জুদের মতো সুন্নত ও নফল নামাজগুলো আদায় করা যেতে পারে। এই নামাজগুলোর প্রতিটিরই নিজস্ব তাৎপর্য ও সওয়াব রয়েছে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগুলো নিয়মিত আদায়ের অভ্যাস করা উচিত যাতে ক্লান্তি না আসে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও জানিয়েছেন যে, বান্দা যখন সালাতে সেজদারত থাকে, তখন সে আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। তিনি বলেছেন, বান্দা যখন সেজদায় থাকে, তখন সে তার প্রতিপালকের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়, তাই তোমরা সেজদারত অবস্থায় বেশি বেশি দোয়া করো। (মুসলিম)।
৩. ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা
মানুষ হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে যে আমরা কেউই নিখুঁত নই। নিজের ভুলগুলো স্বীকার করা এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করা পরিপক্বতা ও উৎকর্ষের লক্ষণ। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আদম সন্তান মাত্রই গুনাহগার বা ভুলকারী, আর গুনাহগারদের মধ্যে তারাই সর্বোত্তম যারা প্রতিনিয়ত তওবা বা অনুশোচনা করে। (সুনান আত-তিরমিজি)।
ক্ষমা প্রার্থনার আরবি শব্দ হলো ইস্তিগফার। তওবা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি গুণ। অত্যন্ত সুন্দর ও বিনীতভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার প্রক্রিয়া। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২২২)।
ক্ষমা প্রার্থনার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। সৃষ্টির সেরা জীব এবং নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহ (সা.) দিনে ৭০ বারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।
৪. দরুদ শরিফ পাঠ করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করবেন। (সহিহ মুসলিম)।
প্রিয় নবীর (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করার অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। দরুদ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়। নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম সেরা মাধ্যম এটি। মহান সাহাবি ও খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার বলেছিলেন, নিশ্চয়ই দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। এর কোনো কিছুই ওপরে ওঠে না, যতক্ষণ না তুমি তোমার নবীর ওপর দরুদ পাঠ করো। (সুনান আত-তিরমিজি)।
৫. প্রিয়জনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা
ইসলামে বিশ্বাস বা ইমান শুধু অন্তরের অন্তস্তলে লুকিয়ে থাকা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাই মুসলমানদের পার্থিব জীবন ও ধর্মীয় জীবনের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার দ্বিধায় ভুগতে হয় না। ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা আমাদের দুনিয়াবি কাজ এবং দ্বীনি কাজের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো নিজেকে সমাজ থেকে গুটিয়ে রাখেননি।
একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার এবং শিরক বর্জন করার আদেশের পরপরই আল্লাহ তায়ালা মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তার সাথে কাউকে শরিক করো না। এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদয় হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না। (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬)।
বাবা-মায়ের জন্য খাবার তৈরি করা, তাদের ক্লান্ত পা টিপে দেওয়া, সন্তানদের সঙ্গে বই পড়া বা খেলা করা, ভাইবোনের সাথে অর্থপূর্ণ কথা বলা কিংবা ধর্মীয় ক্লাসের পর বন্ধুদের সাথে চা-কফি পানের মাধ্যমে এই সম্পর্কগুলো আরও দৃঢ় করা যায়।
৬. বেশি বেশি দোয়া করা
দোয়া করা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। আমাদের প্রতিপালক নিজেই আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন তার কাছে দোয়া করতে ও চাইতে।
অন্যের জন্য দোয়া করার একটি সুন্দর দিক হলো, এর মাধ্যমে আমরা নিজেরাও উপকৃত হই। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম বান্দা যখন তার অপর ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করে, তখন ফেরেশতারা বলে, তোমার জন্যও অনুরূপ হোক। (সহিহ মুসলিম)।
৭. কোরআন তিলাওয়াত করা
কোরআন হলো মহান আল্লাহর বাণী, যা রাসুলুল্লাহর (সা.) ওপর আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহর বাণী পড়ার চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি হরফ পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে, আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। আমি বলছি না যে আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ। (সুনান আত-তিরমিজি)।
বর্তমান সময়ে কোরআনের সাথে নতুন করে যুক্ত হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। যখন আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনায় আমরা পথ হারিয়ে ফেলি বা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি, তখন আমাদের এমন একটি নির্দেশনার প্রয়োজন যা আমাদের এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে শেখাবে।
৮. আল্লাহ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখা
সবশেষে, আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর প্রতি আশাবাদী থাকা এবং হুসনে জন বা ইতিবাচক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। এটা তখনই সম্ভব যখন আমরা আমাদের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, সর্বশক্তিমান ও পরম ক্ষমাশীল আল্লাহ সম্পর্কে মনে সুন্দর ধারণা পোষণ করব।
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা করে, আমি তার সাথে তেমনই আচরণ করি। সে যখন আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সাথে থাকি। সে যদি আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। সে যদি কোনো সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, আমি তার চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। সে যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। সে যদি আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে চার হাত এগিয়ে যাই। সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।
আল্লাহর প্রতি ইতিবাচক ধারণা রাখা মনের একটি বিশেষ অবস্থা। প্রতিদিন চারপাশে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও জুলুম আমাদের মনকে ব্যথিত করতে পারে। মন হয়তো অনেক সময় এর কারণ খুঁজতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং নিজের কমতিগুলোর জন্য জবাবদিহিতার ভয় পায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক মুমূর্ষু যুবকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেমন বোধ করছ? যুবকটি উত্তর দিল, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আল্লাহর রহমতের আশা করছি, আবার নিজের পাপের ভয়ও পাচ্ছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো বান্দার হৃদয়ে যখন এই দুটি অনুভূতি একসাথে জমা হয়, তখন আল্লাহ তাকে তা-ই দান করেন যা সে আশা করে এবং তাকে সেই ভয় থেকে মুক্তি দেন যা সে আশঙ্কা করে। (সুনান আত-তিরমিজি)
এনটি
