শত বছরের নীরবতা ভেঙে ইউরোপের দেশ স্পেনে আবারও মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে ইসলাম। দেশটির মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন মুসলিম। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সন্তানদের ইসলামী শিক্ষার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে স্থানীয় মসজিদগুলো।
স্পেনের ইসলামী সংগঠনগুলোর জোটের ২০২৪ সালের শেষের দিকে করা এক জনসংখ্যা বিষয়ক জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে স্পেনে স্প্যানিশ নাগরিকত্ব পাওয়া মুসলিমের সংখ্যা ১১ লাখ ৪৭ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি। অন্যান্য দেশের নাগরিকসহ স্পেনে মোট মুসলিমের সংখ্যা ২৫ লাখ ৪২ হাজার পার হয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ।
প্রতিনিধিত্ব ও আইনি কাঠামো
১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী কমিশন অব স্পেন সরকারিভাবে দেশটির মুসলিমদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা। এই কমিশনের অধীনে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ১০০টি ইসলামী সমিতি সক্রিয় রয়েছে। সমিতিগুলো মূলত মাদ্রিদ, কাতালুনিয়া, আন্দালুসিয়া, ভ্যালেন্সিয়া ও মুর্সিয়া অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত। স্পেনের বিচার মন্ত্রণালয়ের ধর্মীয় সংস্থা সংক্রান্ত রেজিস্ট্রি খাতায় প্রতিটি সমিতি নিবন্ধিত। যেকোনো শহর বা এলাকায় পর্যাপ্ত মুসলিম থাকলে তারা একটি মসজিদ বা কবরস্থান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই ধর্মীয় সমিতি গড়ে তুলতে পারেন।
আধুনিক মুসলিম কমিউনিটি
১৯৯২ সালে স্প্যানিশ সরকারের সাথে মুসলিম কমিউনিটির একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ইউরোপের ইতিহাসে কোনো দেশের সরকারের সাথে মুসলিমদের প্রথম আনুষ্ঠানিক চুক্তি। এই চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকি করে ইসলামী কমিশন।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে স্থানীয় স্প্যানিশদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা শুরু হয়। তবে ১৯৪০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া অভিবাসনের ঢেউই স্পেনে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ। বর্তমানে স্পেনের মোট মুসলিমের ৫৫ শতাংশই অভিবাসী, যার মধ্যে এককভাবে মরক্কো থেকে এসেছেন ৩৬ শতাংশ। এছাড়া পাকিস্তান, সেনেগাল, আলজেরিয়াসহ আরও ২০টি দেশের মুসলিম এখানে বসবাস করছেন। মুসলিমদের বড় একটি অংশ বার্সেলোনা, মাদ্রিদ, মুর্সিয়া ও দক্ষিণের আন্দালুসিয়া অঞ্চলে বাস করেন। পাশাপাশি সেউতা ও মেলিলা শহরেও বিপুল সংখ্যক মুসলিমের বাস রয়েছে।
ইসলামী কমিশনের সভাপতি আয়মান আল-ইদলবি জানান, ১৯৬৭ সালের পর স্পেনে মুসলিমদের নতুন করে উত্থান ঘটে। শুরুতে একদল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী গ্রানাডায় স্টুডেন্ট কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে ওমর বিন খাত্তাব মসজিদে রূপ নেয়। এরপর বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা ছোট ছোট নামাজ ঘর ও সমিতিগুলোই আজকের মসজিদগুলোর ভিত্তি। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে স্পেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পর সরকার ইসলাম ধর্মকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলে এই কেন্দ্রগুলো পুর্ণাঙ্গ মসজিদে রূপ নেয়।
মসজিদ নির্মাণের চ্যালেঞ্জ
আন্দালুসের পতনের কয়েক শতাব্দী পর ১৯৮১ সালে দক্ষিণ স্পেনের মারবেয়া শহরে প্রথম সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র মসজিদ হিসেবে কিং আবদুল আজিজ আল সাউদ মসজিদ নির্মিত হয়। এরপর কর্ডোভার কাছে আল-বুশারাত মসজিদ এবং পরবর্তীতে রাজধানী মাদ্রিদে কেন্দ্রীয় মসজিদ হিসেবে আবু বকর সিদ্দিক মসজিদ নির্মিত হয়।স্প্যানিশ মুসলিম ও অভিবাসীদের নিজস্ব উদ্যোগে নির্মিত প্রথম বড় মসজিদ এটিই ।
বর্তমানে স্পেনে প্রায় ২ হাজার মসজিদ রয়েছে। তবে এর বেশিরভাগই কোনো স্বাধীন ভবনে নয়, বরং বিভিন্ন বহুতল ভবনের অংশ বা বাণিজ্যিক স্পেসে গড়ে উঠেছে। শুধু মাদ্রিদ প্রদেশেই রয়েছে ৩৪০টি মসজিদ।
আল-ইদলবি জানান, মসজিদ নির্মাণের অনুমতি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নয়, বরং স্থানীয় পৌরসভার এখতিয়ারাধীন। পৌরসভাগুলো মসজিদকে জনসমাগমস্থল হিসেবে বিবেচনা করে নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার কঠোর নিয়মকানুন প্রয়োগ করে। আইনি কোনো বাধা না থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—তহবিলের অভাবই নতুন মসজিদ নির্মাণের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ধর্মীয় শিক্ষার একমাত্র আশ্রয়
স্পেনে কোনো বিশেষায়িত ইসলামিক স্কুল না থাকায়, মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম এখন এই মসজিদগুলো। ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ী সরকারি স্কুলগুলোতে স্প্যানিশ ভাষায় ইসলামিয়াত পড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কোনো স্কুলে ১০ জনের বেশি মুসলিম শিক্ষার্থী থাকলে অভিভাবকরা সাপ্তাহিক বিশেষ ক্লাসের আবেদন করতে পারেন। তবে স্পেনের বিশাল চাহিদার বিপরীতে ইসলামী কমিশন অনুমোদিত শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ৪০০ জন।
মসজিদগুলোতে আরবি ভাষা ও কোরআন শিক্ষার জন্য আন্দালুসিয়ান ফাউন্ডেশন নামের একটি ট্রাস্ট কাজ করছে। তবে তারাও আর্থিক সংকট ও শিক্ষা উপকরণের অভাবে ভুগছে। আল-ইদলবি বলেন, এই ট্রাস্টের সবাই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, সময়ের সাথে সাথে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। প্রথম প্রজন্মের অভিভাবকরা আরবি জানলেও স্প্যানিশ ভাষায় দুর্বল, অন্যদিকে তাদের সন্তানরা স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ হলেও আরবি বোঝে না। ফলে এই ভাষা ও সংস্কৃতির দূরত্ব ঘোচাতে মসজিদের ভূমিকা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শিশু বা তরুণদের শিক্ষাই নয়, স্পেনের কারাগার, ডিটেনশন সেন্টার ও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন মুসলিমদের আধ্যাত্মিক ও মানসিক সহায়তার জন্য ইমাম ও ধর্মীয় উপদেষ্টা নিয়োগের দায়িত্বও পালন করছে ইসলামী কমিশন।
সূত্র : আল জাজিরা
এনটি
