ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারির জন্ম উজবেকিস্তানের বুখারা অঞ্চলে এক ফারসি পরিবারে। ১৯৪ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। তার সংকলিত গ্রন্থ ‘সহিহ বুখারি’ পবিত্র কোরআনের পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।
বিশ্বজুড়ে বহুল প্রশংসিত এই গ্রন্থ সংকলন করতে তার সময় লেগেছিল দীর্ঘ ১৬ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ইরাক, হিজাজ, সিরিয়া ও মিশরসহ একাধিক দেশ ভ্রমণ করেন। এই সময়ে তিনি কোনো শহরে শুধু ততটুকু সময় অবস্থান করতেন, যতটুকু সেখানকার প্রখ্যাত মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করতে প্রয়োজন হতো।
প্রায় ৬ লাখ হাদিস গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার পর সংকলনের জন্য মাত্র ৭ হাজার হাদিস নির্বাচন করেন। যে হাদিসগুলোর সত্যতা ও বিশুদ্ধতা নিয়ে তার মন পুরোপুরি আশ্বস্ত হয়েছে, শুধু সেগুলোকেই তিনি নিজের গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। গবেষণা জীবনে ইমাম বুখারি প্রায় ১ হাজার ৮০ জন হাদিস বিশারদের কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শুনেছেন। তার সংকলিত গ্রন্থটিতে উল্লিখিত মোট বর্ণনাকারীর সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হাদিসের হাফেজ ইমাম বুখারি তৎকালীন সময়ের সেরা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বেশ পরিচিত। একবার তিনি যখন বাগদাদে পৌঁছান, তখন সেখানকার হাদিস বিশারদরা তার স্মরণশক্তি ও মুখস্থবিদ্যার পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা একটি বিশেষ জলসার আয়োজন করেন।
ইমাম বুখারি জলসায় আসন গ্রহণ করলে প্রথম ব্যক্তি তার সামনে একে একে ১০টি হাদিস পেশ করেন। তবে কৌশল হিসেবে প্রতিটি হাদিসের মূল বাণী ও সনদ বা বর্ণনাক্রম উলটপালট করে দেওয়া হয়েছিল। ইমাম বুখারি প্রতিটি হাদিস শোনার পর শুধু একটি মন্তব্য করেন, আমি এই হাদিস সম্পর্কে জানি না। এভাবে প্রথম ১০টি হাদিস উপস্থাপন শেষ হয়।
এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি সামনে এসে একইভাবে আরও ১০টি উলটপালট করা হাদিস উপস্থাপন করেন। এভাবে একে একে ১০ জন ব্যক্তি মোট ১০০টি উলটপালট করা হাদিস তার সামনে তুলে ধরেন। ইমাম বুখারি প্রতিবারই শান্তভাবে উত্তর দেন, এই হাদিস আমার জানা নেই।
সবাই যখন তাদের উপস্থাপন শেষ করেন, তখন ইমাম বুখারি একের পর এক প্রথম থেকে ১০০ নম্বর হাদিস পর্যন্ত হুবহু স্মরণ করে বলতে থাকেন। প্রথমে পরীক্ষকদের ভুলভাবে বলা রূপটি উল্লেখ করেন এবং সাথে সাথে তার সঠিক সনদ ও মূল বাণী বা মতন সংশোধন করে দেন। ১০০টি হাদিসের ভুল শুধরে সঠিক রূপ উপস্থাপন করায় জলসায় উপস্থিত সবাই তার অসাধারণ স্মৃতির সূক্ষ্মতা ও নিখুঁত দক্ষতার সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হন।
ইমাম বুখারির মূল প্রতিভা লুকিয়ে ছিল তার বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও যাচাই-বাছাইয়ের পদ্ধতিতে। ৬ লাখ হাদিসের মধ্য থেকে ৭ হাজার হাদিস বেছে নেওয়ার অর্থ হলো, তিনি গড়ে প্রতি ৯০টি হাদিসের মধ্যে শুধু একটি গ্রহণ করেছিলেন এবং বাকি ৮৯টি বর্জন করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে হাদিস বিশারদদের মাঝে একটি কথা প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারি যে হাদিস জানেন না, তা আদৌ কোনো হাদিস নয়।
তিনি নিজেকে শুধু বিশুদ্ধ হাদিস সংকলনের কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন ‘জারহ ওয়া তাদিল’ অর্থাৎ বর্ণনাকারীদের মান ও চরিত্র বিচারবিদ্যা শাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় অভিজ্ঞ ব্যক্তি। কোনো বর্ণনাকারীকে নির্ভরযোগ্য বলতে গেলে তার মধ্যে ৫টি মৌলিক গুণ থাকতে হতো। তাকে হতে হতো মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী, পাপাচারমুক্ত এবং ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ণকারী কোনো আচরণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ণ হওয়া বলতে বোঝায়, এমন কোনো আচরণ যা একজন আলেমের মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে মানানসই নয়।
পরবর্তীতে ইমাম বুখারির প্রিয় ছাত্র মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ আল-কুশাইরি যখন তার নিজস্ব হাদিস গ্রন্থ ‘সহিহ মুসলিম’ প্রকাশ করেন, তখন থেকে হাদিসের বিশুদ্ধতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড নির্ধারিত হয় বুখারি ও মুসলিম—উভয় গ্রন্থে একই হাদিস স্থান পাওয়া। পরিভাষায় একে বলা হয় ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ বা শায়খাইন কর্তৃক বর্ণিত।
এই দুই বিখ্যাত মুহাদ্দিসের সূত্রে বর্ণিত হাদিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হাদিস হলো ‘মুতাওয়াতির’। অর্থাৎ যে হাদিস মহানবী (সা.) থেকে শুরু করে প্রতি যুগে এত বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন যে, তাদের পক্ষে মিথ্যা সংকলন করা অসম্ভব।
সহিহ বুখারি শরীফের সর্বপ্রথম হাদিসটি হলো, সমস্ত আমলের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ীই প্রতিফল পাবে। মহানবী (সা.) সত্য বলেছেন।
হাদিস সংরক্ষণের সূচনা
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী (সা.) তার মুখনিঃসৃত বাণী লিখে রাখতে নিষেধ করেছিলেন। এর মূল কারণ ছিল, যেন হাদিস ও কোরআনের আয়াতের মধ্যে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা মিশ্রণ তৈরি না হয়। তবে মুখে মুখে তা প্রচার ও স্থানান্তরে কোনো বাধা ছিল না। সহিহ হাদিসে এসেছে, তোমরা কোরআন ছাড়া আমার অন্য কোনো কথা লিখে রেখো না। কেউ যদি কোরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখে থাকে, তবে সে যেন তা মুছে ফেলে।
হিজরি ১০০ সালে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম হাদিস সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়। এর আরও প্রায় ৫০ বছর পর বিভিন্ন বই আকারে হাদিস সংকলনের রূপ পায়। শুরু থেকেই হাদিস সংকলনের দুটি ধারা প্রচলিত ছিল; একটি বিষয়ভিত্তিক এবং অন্যটি বর্ণনাকারীভিত্তিক।
বর্ণনাকারীদের নামের ক্রমানুসারে হাদিস সংকলনকারীদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল। তার বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘মুসনাদে আহমাদ’-এ ২৬ হাজারের বেশি হাদিস রয়েছে। তিনি প্রত্যেক সাহাবির নাম অনুযায়ী আলাদা অনুচ্ছেদ তৈরি করে তাদের বর্ণিত হাদিসগুলো সংকলন করেছিলেন।
