বিজ্ঞাপন

উমাইয়া শাসনের পতন ও আব্বাসীয়দের উত্থান যেভাবে

উমাইয়া শাসনের পতন ও আব্বাসীয়দের উত্থান যেভাবে

রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র বিদ্রোহ ও একের পর এক পরাজয়ের ফলে উমাইয়া সাম্রাজ্য চরম দুর্বলতার মুখোমুখি হয়। আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ে এই বিশাল সাম্রাজ্য। উত্থান ঘটে আব্বাসীয় শাসনের।

ইরাকের উত্তরে জাব নদীর যুদ্ধে আব্বাসীয়দের কাছে পরাজিত হয় উমাইয়ারা। এর প্রায় তিন মাস পর, ২৫ এপ্রিল ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের রাজধানী দামেস্কের দেয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৯০ বছরের উমাইয়া শাসনের অবসান ঘটে।

বিশাল এই জয়ের পর আব্বাসীয়রা তাদের রাজধানী সিরিয়ার দামেস্ক থেকে সরিয়ে ইরাকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা প্রথমে কূফা এবং পরে আনবারকে রাজধানী করে। অবশেষে বাগদাদ নগরী গড়ে তুলে স্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়।

ইসলামী ইতিহাসের অধ্যাপক ডক্টর আমীর মাফতুহ বলেন, উমাইয়া খিলাফতের পতনের পেছনে বহু কারণ ছিল, যার মধ্যে প্রধান ছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দল।

আব্বাসীয়দের উত্থান

ইসলামী ইতিহাসের অধ্যাপক ডক্টর আমীর মাফতুহ আল জাজিরা নেটকে জানান, ঐতিহাসিক নিয়ম অনুযায়ী উমাইয়া সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে। পতনের মূলে ছিল সময়ের ব্যবধানে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দুর্বলতা। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার শক্তি হারিয়ে ফেলে, তা ধসের দিকে এগিয়ে যায় এবং পতন ঠেকানো সম্ভব হয় না।

ডক্টর মাফতুহ উমাইয়া সাম্রাজ্যের দুর্বলতার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে ছড়িয়ে পড়া শিথিলতা, রাজনৈতিক ও গোত্রীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নতুন এলাকা জয়ের অভিযান বন্ধ হয়ে যাওয়া। যে কারণে উমাইয়া খিলাফতে স্থবিরতা দেখা দেয়।

তিনি উল্লেখ করেন, উমাইয়াদের তৎকালীন বাস্তবতাই ধীরে ধীরে তাদের পতনের পরিবেশ তৈরি করে। এটি তাদের বিরোধীদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের সুযোগ করে দেয়, যা আব্বাসীয়দের নতুন আন্দোলনের পথ সুগম করেছিল।

তিনি আরও জানান, সমতা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং সংস্কারের যে সুর আব্বাসীয়রা তুলেছিল, তা সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে অকৃত্রিম আরব বহির্ভূত জাতিগুলোর মধ্যে এই সুবাতাস ছড়িয়ে পড়ে। একই সাথে প্রচলিত গোত্রীয় কোন্দলকে কাজে লাগানো এবং খোরসানের পুরোনো ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার কৌশল নেওয়া হয়। সেইসাথে আবু মুসলিম খোরাসানিকে নিয়োগ করা ছিল আব্বাসীয় আন্দোলনের এক মোড় ঘোরানো পরিবর্তন। ফলে সহায়ক পরিবেশ, কার্যকর নেতৃত্ব এবং উপযুক্ত পরিস্থিতির কারণে উমাইয়াদের পতন ত্বরান্বিত হয়।

দামেস্ক পতন

ডক্টর মাফতুহ ১১ জুমাদাস সানি ১৩২ হিজরি (২৫ জানুয়ারি ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ) অনুষ্ঠিত একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন। টাইগ্রিস নদীর অন্যতম শাখা নদী গ্রেট জাব নদীর তীরে এই যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এই যুদ্ধ ছিল আব্বাসীয় ও উমাইয়াদের মধ্যকার একটি চূড়ান্ত যুদ্ধ। জায়গাটি উত্তর ইরাকের মসুল ও আরবিলের মাঝামাঝি অবস্থিত।

তিনি বলেন, শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন মুহাম্মদের নেতৃত্বে থাকা উমাইয়া বাহিনী এই যুদ্ধে চরমভাবে পরাজিত হয়। এরপর মারওয়ান মিসরে পালিয়ে যান এবং সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়। এই যুদ্ধই ছিল উমাইয়া শাসনের মূল সমাপ্তি এবং আব্বাসীয় খিলাফতের সূচনা।

জাব নদীর যুদ্ধের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। সিরিয়ার বিভিন্ন শহর যেমন কিন্নাসরিন, হিমস ও বালবেক উমাইয়াদের আনুগত্য ত্যাগ করে আব্বাসীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। একমাত্র দামেস্ক শহরই দেড় মাস প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। তবে চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার কারণে তারা আর টিকতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আব্বাসীয়রা সেখানে প্রবেশ করে।

ইতিহাসবিদ আল-গুরেইরি মনে করেন, আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ছিল ইসলামী ইতিহাসে এক সার্বিক বিপ্লব।

ফারসিদের ভূমিকা

ইসলামী ইতিহাসের অধ্যাপক ডক্টর আহমদ নাজি আল-গুরেইরি আল জাজিরা নেটকে বলেন, আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠা ইসলামী ইতিহাসে এক বিরাট বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ইতিহাসবিদরা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ একে আরব শাসনের বিরুদ্ধে ফারসিদের বিদ্রোহ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ শুধু উমাইয়াদের ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন বলে মনে করেন।

ডক্টর আল-গুরেইরি ব্যাখ্যা করেন, উমাইয়া রাষ্ট্র অনারব ফারসি মুসলিমদের বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখেছিল। ফলে তাদের মধ্যে যে অসন্তোষ জন্ম নেয়, তা শেষ পর্যন্ত উমাইয়াদের পতন ডেকে আনে। এই অর্থনৈতিক অসন্তোষ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল, যার মধ্যে খোরাসানের অনারব মুসলিমদের ক্ষোভ ছিল সবচেয়ে বেশি।

তিনি আরও জানান, আব্বাসীয়রা ফারসিদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগায়। তারা আবু মুসলিম খোরাসানিকে খোরসানে আব্বাসীয়দের দাওয়াত প্রচারের দায়িত্ব দেয়। তিনি মারভ শহর দখল করেন এবং ফারস অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেন। পরে তার বাহিনী ইরাকের দিকে এগিয়ে গিয়ে উমাইয়া বাহিনীকে পরাজিত করে এবং ১৩২ হিজরি বা ৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে বসরা ও কূফায় প্রবেশ করে। এ সময় আবু আল-আব্বাস আস-সাফফাহ কূফায় গিয়ে জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

আল-গুরেইরি নিশ্চিত করেন, উমাইয়া শাসনের পতনে অবদান রাখার কারণে ফারসিরা পরবর্তীতে প্রচুর সুবিধা পায়। আব্বাসীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তারা ফারসি শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করে। আব্বাসীয়দের প্রথম উজির ছিলেন ফারসি বংশোদ্ভূত আবু সালামা আল-খাল্লাল। এর ফলে শাসনকাঠামো অনেকটাই সাসানীয় যুগের মতো রূপ নেয়। খলিফারা তাদের নিরাপত্তার জন্য খোরসানের সৈন্যদের রক্ষী হিসেবে নিয়োগ দেন। এমনকি আব্বাসীয় রাজদরবারে ফারসি পোশাকের প্রচলনও বেড়ে যায়।

আব্বাসীয় যুগের প্রথম দিকে অধিকাংশ মন্ত্রী ফারসি পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। এর মধ্যে বারমাকি পরিবারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যাদের প্রভাব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে খলিফার ক্ষমতাও ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল।

ইতিহাসবিদ ইব্রাহিম মনে করেন, শুরুতে কূফাকে রাজধানী করার কারণ ছিল সেখানে তাদের সমর্থকদের শক্তিশালী অবস্থান।

বিকল্প রাজধানী

ঐতিহাসিক ও গবেষক বাদি মোহাম্মদ ইব্রাহিম আল জাজিরা নেটকে বলেন, দামেস্ক উমাইয়াদের মূল কেন্দ্র এবং সমর্থকদের ঘাঁটি হওয়ায় আব্বাসীয়রা সেখানে রাজধানী বজায় রাখেনি।

কূফাকে প্রথম রাজধানী করার পেছনে কারণ ছিল কূফায় আব্বাসীয়দের অনেক সমর্থক ছিল, যাদের ওপর ভিত্তি করে তাদের আন্দোলন গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে তারা আলীদের সমর্থক হয়ে উঠলেও কূফায় কোনো উমাইয়া সমর্থক ছিল না। তাছাড়া এটি উমাইয়া ঘেঁষা সিরিয়া থেকে দূরে, বাইজেন্টাইনদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ এবং ইরাকের অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহারের উপযোগী ছিল।

তবে পরবর্তীতে খলিফা আবু আল-আব্বাস আস-সাফফাহ কূফাবাসীদের আনুগত্যের ওপর ভরসা রাখতে পারেননি। তাই তিনি ফোরাত নদীর তীরে আনবারের কাছে একটি শহর গড়ে তুলে তার নাম দেন হাশেমিয়া এবং সেখানে রাজধানী সরিয়ে নেন।

ইব্রাহিম আরও বলেন, আনবারকে রাজধানী হিসেবে বেশিদিন রাখা হয়নি। ১৩৬ হিজরিতে (৭৫৪ খ্রিস্টাব্দ) আবু জাফর আল-মনসুর খলিফা হওয়ার পর সেই স্থানটি তার পছন্দ হয়নি। তিনি কূফা ও হিরার মাঝামাঝি আরেকটি জায়গায় স্থানান্তর হয়ে তাও নামও হাশেমিয়া রাখেন। কিন্তু সেই শহরও উপযুক্ত মনে না হওয়ায় তিনি নতুন স্থানের খোঁজে বের হন এবং শেষ পর্যন্ত বাগদাদকে বেছে নেন।

গবেষক রউফ বলেন, নতুন আব্বাসীয় রাষ্ট্রের জন্য একটি নতুন রাজধানীর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল।

রাজধানী বাগদাদ

ইতিহাসবিদ ইমাদ আব্দুস সালাম রউফ আল জাজিরা নেটকে বলেন, উদীয়মান আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের জন্য একটি উপযুক্ত রাজধানীর প্রয়োজনীয়তা প্রবলভাবে অনুভূত হয়েছিল। তারা প্রথমে কূফা ও পরে আনবারের কথা ভাবলেও একটি বিশাল সাম্রাজ্যের উপযোগী স্থায়ী স্থান খুঁজছিলেন।

রউফ জানান, খলিফা আবু জাফর আল-মনসুর অনেক উপদেষ্টা, মন্ত্রী ও বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন। এমনকি তিনি সাধারণ মানুষের মতামতও নিয়েছিলেন। তিনি যে যে অঞ্চলে যেতেন, সেখানকার অধিবাসীদের সাথে কথা বলতেন। একজন শাসক হিসেবে তিনি একক সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিভিন্ন ধর্ম ও পেশার মানুষের কথা শুনেছেন।

তিনি আরও যোগ করেন, আল-মনসুর নিজে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে উপযুক্ত পরিবেশ খুঁজেছেন। তিনি তিকরিত ও মসুলের সীমান্ত পর্যন্ত গিয়েছিলেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর তিনি বাগদাদকে বেছে নেন।

রউফ মনে করেন, আব্বাসীয় শাসনব্যবস্থা মেসোপটেমিয়া বা ইরাকের ব্যাপক সমৃদ্ধি এনেছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাগদাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানী, পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী ও কবিরা এখানে আসতে শুরু করেন, যা সংস্কৃতির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটায়।

তবে তিনি মনে করেন, আল-মনসুর যে বাগদাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আজকের বাগদাদ হুবহু সেই বাগদাদ নয়। ইতিহাসজুড়ে বাগদাদ বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে প্রতি যুগে শহরের বিকাশ ও পতনের নিজস্ব কারণ ছিল।