তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন আয়া সোফিয়া মসজিদ। বাইজেন্টাইন ও উসমানীয় স্থাপত্যের পাশাপাশি খ্রিস্টান ও ইসলামী অলঙ্করণের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটেছে এই স্থাপনায়। খ্রিস্টধর্মের ইতিহাসে গম্বুজবিশিষ্ট প্রথম চার্চ বা গির্জা হিসেবে নির্মিত হয়েছিল স্থাপনাটি। পরবর্তীতে ১৪৫৩ সালে কন্সট্যান্টিনোপল জয়ের পর গির্জাটিকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। তুরস্কে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রায় ৮৫ বছর মসজিদটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অবশেষে ২০২০ সালে পুনরায় মসজিদে ফিরিয়ে আনা হয়।
হাজার বছরের ইতিহাসে অনেক ভাঙচুরের শিকার এই ভবন ষষ্ঠ থেকে একাবিংশ শতাব্দীর মধ্যে অন্তত ৪২ বার মেরামত বা সংস্কার করা হয়েছে বলে নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এই মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ৩১ মিটার ব্যাসের অসাধারণ গম্বুজের জন্য বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্যের একটি হিসেবেও অভিহিত করা হয় এই মসজিদকে।
নামকরণ
শুরুর দিকে আয়া সোফিয়া একটি গির্জা ছিল, যার নাম ছিল মেগালি এগ্লিসিয়া, যার অর্থ বড় গির্জা। তৎকালীন অন্যান্য গির্জার তুলনায় এটি অনেক বড় হওয়ায় এই নামকরণ করা হয়েছিল। প্রায় ৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে একে সোফা বলেও ডাকা হতো বলে উল্লেখ রয়েছে।
পঞ্চম শতাব্দী থেকে এর নাম হয় হাগিয়া সোফিয়া। গ্রিক ভাষার এই শব্দের অর্থ পবিত্র প্রজ্ঞা বা সৃষ্টিকর্তার প্রজ্ঞার ক্যাথেড্রাল অথবা বৃহৎ গির্জা।
চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে একে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। এরপর থেকে আয়া সোফিয়া মসজিদ নামে পরিচিত লাভ করে। উসমানীয়রা এর নাম দিয়েছিল আয়া সোফিয়া কাইর জামি শরিফ, অর্থাৎ আয়া সোফিয়ার মহাসম্মানিত জামে মসজিদ।
সুলতান তৃতীয় আহমেদের আমলে মসজিদের ভেতরে ছয়টি বড় বৃত্তাকার ফলক স্থাপন করা হয়, যেখানে আল্লাহ, মহানবী (সা.) এবং চার খোলাফায়ে রাশেদিনের নাম লেখা হয়।
স্থাপত্য ও নকশা
মসজিদটি পাথর এবং বালি ও সিরামিকের মিশ্রণে তৈরি ইট ও টালি দিয়ে নির্মিত হয়েছে। দেয়ালগুলো নানা রঙের মার্বেল পাথর দিয়ে সাজানো এবং সিলিং বা ছাদ অলঙ্কৃত করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন মোজাইকে।
মূল ভবনের দৈর্ঘ্য ২৬৯ ফুট এবং প্রস্থ ২৪৩ ফুট। এর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৩১ মিটার পরিধির একটি গম্বুজ, যা মাটি থেকে প্রায় ৫৬ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। গম্বুজটির চারপাশে ৪০টি জানালা রয়েছে এবং একে ঘিরে রয়েছে সাতটি ছোট গম্বুজ। এগুলো ভেতরে সিসার প্রলেপ দিয়ে ঢাকা, যাতে আবহাওয়ার প্রভাব থেকে সুরক্ষা পায়।
তবে ভৌগোলিক অবস্থান ও পূর্বমুখী উপদ্বীপের কারণে ভবনটিতে কিছু প্রকৌশলগত ও স্থাপত্যগত দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। বাইজেন্টাইন আমলে দেয়ালের ওপর সরাসরি গম্বুজ স্থাপনের ফলে পুরো ভবনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছিল।
এই সমস্যা সমাধানে চার সুলতানের সমসাময়িক বিখ্যাত উসমানীয় স্থপতি সিনান আগা বাইরে থেকে গম্বুজের জন্য ছয়টি পাথরের স্তম্ভ এবং পশ্চিম দিকে শক্তিশালী মিনার নির্মাণ করেন, যা ভবনের চাপ কমিয়ে কাঠামোকে শক্তিশালী করে।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ষোড়শ শতাব্দীতে স্থপতি সিনানের এই সংস্কারের কারণেই গম্বুজটি আজ অবিকৃতভাবে টিকে রয়েছে।
মসজিদের মেহরাবটি আয়তাকার এবং এর উপরের অংশ হাতির দাঁত ও সবুজ রঙের মুকুটের মতো নকশায় শেষ হয়েছে, যা পেছনের দেয়ালের সঙ্গে চমৎকার সামঞ্জস্য তৈরি করেছে। এর দুই পাশে মার্বেলের স্তম্ভ রয়েছে এবং মিম্বারের ওপর সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহের পতাকা উত্তোলিত রয়েছে।
দীর্ঘ ইতিহাস ও পরিবর্তনশীল স্থাপত্য
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অস্থিরতার সময়ে আয়া সোফিয়া মোট তিনবার নির্মিত হয়েছিল। প্রথমবার ৩৬০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কনস্টান্টিয়াসের আমলে এটি একটি সাধারণ কাঠের ছাদবিশিষ্ট ভবন হিসেবে নির্মিত হয়। ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে এক বিদ্রোহের সময় এটি আগুনে পুড়ে যায়।
এরপর ৪১৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট দ্বিতীয় থিওডোসিয়াসের আমলে এটি পুনর্নির্মিত হয়। এতে পাঁচটি অংশ এবং একটি বিশাল প্রবেশদ্বার ছিল। এর দেয়াল পাথরের এবং ছাদ কাঠের তৈরি হলেও নিফা বিদ্রোহের সময় এটিও পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
দুটি গির্জার ধ্বংসই স্থাপত্যপ্রেমী সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানকে ৫৩২ থেকে ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এক বিশাল ও অভূতপূর্ব গির্জা নির্মাণের সুযোগ করে দেয়, যা আজও এই রূপেই টিকে আছে।
এই তৃতীয় নির্মাণে স্থপতিরা আগের দুটি কাঠামোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। হালকা ইটের তৈরি একটি অগ্নিনিরোধক উঁচু গম্বুজ চারটিকে স্তম্ভের ওপর স্থাপন করা হয়, যার নিচে ৪০টি আলো গলানো জানালা ছিল। দেয়াল মার্বেল এবং ছাদ সোনা ও মোজাইকে মুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
৫৫৮ সালের এক ভূমিকম্পে গম্বুজের একটি অংশ ভেঙে পড়লে ৫৬৩ সালে সংস্কার করে আরও ২০ ফুট উঁচু করা হয়।
বাইজেন্টাইন আমলে চতুর্দশ শতাব্দীতে আয়া সোফিয়ার সবচেয়ে বড় সংস্কারকাজ হয়। তখন ৭,৫০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মূল ভবন ও এর আনুসঙ্গিক অংশগুলোকে ধরে রাখার জন্য চারপাশে নতুন দেয়াল ও শাখা ভবন নির্মাণ করা হয়।
১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের সময় ডিউক এনরিকো ড্যান্ডোলোর নেতৃত্বে এটি সাময়িকভাবে রোমান ক্যাথলিক গির্জায় পরিণত হয়। উল্লেখ্য, এই ডিউকের কবর আয়া সোফিয়ার দ্বিতীয় তলায় রয়েছে।
১২৬১ সালে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য তাদের ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করলে আয়া সোফিয়া আবার পূর্ব অর্থোডক্স ক্যাথেড্রালে ফিরে আসে। প্রায় ৯০০ বছর ধরে এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক গির্জা এবং রাজাদের মুকুট পরানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
ফাতিহ মসজিদ
১৪৫৩ সালের ২৯ মে সপ্তম উসমানীয় সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহের হাতে কন্সট্যান্টিনোপলের পতন ঘটে। বিজয়ের প্রতীক ও নতুন ইতিহাসের সূচনা হিসেবে আয়া সোফিয়াকে রাজধানীর প্রধান মসজিদ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
বিজয়ের পর এখানেই প্রথম আজান দেওয়া হয় এবং একই বছরের ১ জুন বিজয়ী সুলতান ভেতরে প্রথম জুমার নামাজ আদায় করেন। সে সময় খুতবা দেন এবং ইমামতি করেন সুলতানের শিক্ষক আক শামসুদ্দিন।
কথিত আছে, সুলতান ফাতিহ নিজের ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে গ্রিকদের কাছ থেকে আয়া সোফিয়া কিনে নেন এবং মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন। আবার অন্য সূত্রে বলা হয়, উসমানীয় সেনাবাহিনী আয়া সোফিয়াকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পেয়েছিল। বিপুল সংখ্যক সৈন্যের নামাজের জায়গা না থাকায় আলেমদের কাছ থেকে ফতোয়া নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মসজিদে রূপান্তর করা হয়।
মসজিদে রূপান্তরের পরপরই এতে নতুন ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা হয়, গম্বুজের চূড়া থেকে ক্রুশ সরিয়ে অর্ধচন্দ্র বা হিলাল বসানো হয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব দেয়াল শক্তিশালী করতে স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। পশ্চিম গম্বুজের ওপর একটি ছোট কাঠের মিনার এবং ভবনের মাঝখানে একটি কাঠের মিম্বার তৈরি করা হয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুলতান ফাতিহ ভবনের ডান পাশে প্রথম মার্বেলের মিনারটি নির্মাণ করেন। এছাড়া উত্তর দিকে ইউ আকৃতির একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন যার ৪৬টি কক্ষ ছিল। পরবর্তীতে ফাতিহ এলাকায় সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ কলেজ নির্মিত হলে এই মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়।
সেই থেকে আয়া সোফিয়া দীর্ঘ ৪৮১ বছর ধরে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল এবং উসমানীয় স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ গঠনে এর বিশাল প্রভাব ছিল।
উসমানীয় সুলতানদের কাছে মসজিদের প্রতীকী গুরুত্ব
ইস্তাম্বুলের মসজিদগুলোর মধ্যে আয়া সোফিয়ার মর্যাদা ছিল সবার উপরে। শহরের শুল্ক আয়, প্রধান বাজার এবং প্রাচীরের বাইরের বাড়িঘর থেকে আসা আয়ের একটি বড় অংশ এই মসজিদের ওয়াকফ হিসেবে রাখা হতো। সুরক্ষার স্বার্থে এই মসজিদের চারপাশে ৩৫ হাতের মধ্যে কোনো ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ ছিল।
পরবর্তী প্রতিটি উসমানীয় সুলতানই এই ঐতিহাসিক স্থাপনার যত্ন নিয়েছেন। সংযোজন ও সংস্কারের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শহরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এবং একটি বহুমুখী কমপ্লেক্সে পরিণত হয়।
সুলতান দ্বিতীয় সেলিমের আমলে রাজকীয় স্থপতি প্রধান সিনান শেষ দুটি মিনার নির্মাণ করেন। তিনি গম্বুজের মূল স্তম্ভের সঙ্গে এগুলোকে যুক্ত করেন এবং আগের কাঠের মিনারটি ভেঙে ফেলেন। তিনি একটি বাইরের প্রাঙ্গণ তৈরি করেন এবং মেহরাব, মিম্বার ও সোনার খাঁচায় ঘেরা এক বিশেষ শোরফা তৈরি করেন, যাকে হুংকার মাহফিলি বলা হতো। এটি ছিল শুক্রবার সুলতানের নামাজ আদায়ের স্থান, যার পেছনের দিকে আলাদা প্রবেশদ্বার ছিল।
সুলতান মুরাদ তৃতীয়ের অনেক অবদান রয়েছে আয়া সোফিয়ায়। তিনি বারগামা শহর থেকে মার্বেলের দুটি বিশাল পানির জার নিয়ে আসেন, যেগুলো ফটকের দুই পাশে রাখা হয়। একেকটি মার্বেল কেটে তৈরি এই জারের প্রতিটিতে ১,১৫০ লিটার পানি ধরত, যা অজুর কাজে ব্যবহৃত হতো।
তিনি মসজিদের ভেতরে দুটি উঁচু মঞ্চ তৈরি করেন, যার একটিতে সারাদিন কোরআন তেলাওয়াত করা হতো এবং অন্যটিতে আজান দেওয়া হতো। এছাড়া গম্বুজের চূড়ায় ক্রুশের স্থানে তিনি ৫০ বিঘে ব্যাসের একটি অর্ধচন্দ্র বসান, যা দূর থেকে দেখা যেত।
ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধেকের দিকে দক্ষিণ প্রাঙ্গণটিকে উসমানীয় সুলতানদের কবরস্থানে পরিণত করা হয়। এখানে প্রথম মাজারটি ছিল সুলতান দ্বিতীয় সেলিমের, যার পাশে তার ছেলে মুরাদ তৃতীয় এবং নাতি তৃতীয় মুহাম্মদ ছাড়াও সুলতান প্রথম মুস্তফা ও তার ভাতিজা সুলতান ইব্রাহিমের কবর রয়েছে।
সুলতান চতুর্থ মুরাদও আয়া সোফিয়ার যত্ন নেন এবং দেয়াল শক্ত করতে অনেক স্তম্ভ নির্মাণ করেন। তার আমলে ভেতরের দেয়ালে বড় অক্ষরে কোরআনের আয়াত লেখা হয়, যা ক্যালিগ্রাফার জাদে মোস্তফা চেলেবি লিখেছিলেন। এর মধ্যে আলিফ অক্ষরটিই ছিল ১০ হাত লম্বা। তার অন্যান্য কাজের মধ্যে চার নম্বর মার্বেলের মিম্বার, মুয়াজ্জিনের মাহফিল এবং খতিবের আসন উল্লেখযোগ্য।
মেহরাবের দুই পাশে ঝুলে থাকা প্রদীপ দুটি এনেছিলেন সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট, যা তিনি বুডিন থেকে এনেছিলেন।
সুলতান তৃতীয় আহমেদ মূল মেহরাবের উত্তর পাশে তার নিজের নামাজের জন্য একটি কক্ষ তৈরি করেন এবং একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন, যা পরে জাদুঘরের পাঠাগার হয়েছিল। পরবর্তীতে চার কোণায় ছয়টি বৃত্তাকার ক্যালিগ্রাফি ফলক ঝুলানো হয়, যাতে আল্লাহ ও খোলাফায়ে রাশেদিনের নাম লেখা ছিল। এগুলো লিখেছিলেন ক্যালিগ্রাফার তাকেঞ্জিজাদে ইব্রাহিম এফেন্দি।
সুলতান প্রথম মাহমুদ মসজিদের পাশে একটি পানির ধারা বা সাবিল এবং দক্ষিণে একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন, এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পূর্ব বারান্দায় একটি অভ্যন্তরীণ লাইব্রেরি, প্রথম তলায় সুলতানের জন্য একটি বড় খোলামেলা বারান্দা, দক্ষিণ প্রাঙ্গণে একটি ফোয়ারা ও শিশু বিদ্যালয় এবং উত্তর পাশে একটি বড় খাবার ঘর তৈরি করেন।
সম্ভাব্য ধস থেকে আয়া সোফিয়াকে রক্ষা করতে উসমানীয় আমলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারকাজ হয়েছিল ১৮৪৭ থেকে ১৮৪৯ সালের মধ্যে সুলতান প্রথম আবদুল মজিদের আদেশে। এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের দুই স্থপতি ভাই ফসেটিকে।
এই সময়ে গম্বুজ, মেহরাব ও মিম্বার সংস্কার করা হয়, তিনটি মিনার মেরামত করা হয় এবং সুলতান ফাতিহের তৈরি মিনারটির উচ্চতা বাড়ানো হয়। মোজাইকগুলো পরিষ্কার করে কিছু ছবি কাদা ও প্লাস্টার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। মেহরাবের জানালায় রঙিন কাঁচ ব্যবহার করা হয় এবং বাইরের দেয়ালে লাল ও হলুদ রঙের স্ট্রাইপ পেইন্ট করা হয়।
এরপর কাজী আল-আসকার মোস্তফা ইজ্জত এফেন্দির লেখা ছয়টি নতুন ক্যালিগ্রাফি ফলক আগের ফলকগুলোর স্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়, যা আজ মসজিদের ছাদে চার স্তম্ভে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়।
এছাড়া চারটি মিনারই উঁচু করা হয় এবং সামনের আঙিনায় একটি বড় সময় নির্ধারণ কেন্দ্র তৈরি করা হয়। সুলতান এই উপলক্ষে আয়া সোফিয়ার ছবিসহ একটি স্মরণীয় পদকও প্রকাশ করেছিলেন।
রমজান মাসে উসমানীয় রাজপুত্র ও সরকারের পদস্থ কর্তারা আসরের নামাজের জন্য এই মসজিদে সমবেত হতেন এবং গম্বুজটি সারিবদ্ধ প্রদীপে আলোকিত হয়ে উঠত।
প্রথম দিকের সুলতানরা প্রায়শই ২৭ রমজানের রাতে এখানে উপস্থিত হতেন। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ রমজানের মাঝামাঝি সময়ে তোপকাপি প্রাসাদে পবিত্র খিরকা শরীফ জিয়ারতের পর আয়া সোফিয়ায় আসতেন।
জাদুঘরে রূপান্তর
তুর্কি প্রজাতন্ত্র গঠিত হওয়ার পর চার বছরের জন্য মুসল্লিদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় আয়া সোফিয়া। তৎকালীন মিশরের আল-ফাতাহ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৩১ সালের প্রথম রমজানে প্রচুর সংখ্যক মুসল্লি আয়া সোফিয়ায় নামাজ পড়তে গেলে দরজায় বড় একটি সাইনবোর্ড দেখতে পান, যাতে লেখা ছিল 'মেরামতের জন্য বন্ধ'।
কিন্তু মূলত সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে মসজিদটি বন্ধ রাখা হয়। এবং এর মিম্বার, কার্পেট ও আরবিতে লেখা ছয়টি ক্যালিগ্রাফি ফলক সরিয়ে নেওয়া হয়। মসজিদের পাশে সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহের তৈরি মাদ্রাসাটিকে উসমানীয়দের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত হতো, এ সময় সেই মাদ্রাসাও ভেঙে ফেলা হয়। সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদের আমলে নির্মিত ছোট মিনারটিও ডেমোলিশ বা ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় ইতিহাসবিদ ইব্রাহিম হাক্কি কোনিইয়ালি একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, এই মিনারগুলো গম্বুজের মূল সহায় হিসেবে কাজ করছে এবং এগুলো ধ্বংস করলে পুরো আয়া সোফিয়া ভেঙে পড়বে। এরপর ধ্বংসকাজ বন্ধ করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মসজিদটিকে একটি পর্যটন জাদুঘরে পরিণত করা হয়। অনেক গবেষক মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল স্থানটিকে শুধু একটি 'ঐতিহাসিক স্মারক' হিসেবে রাখা—অর্থাৎ এটি মসজিদও থাকবে না, গির্জাও হবে না।
কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, আয়া সোফিয়াকে জাদুঘরে রূপান্তরের আদেশে কামাল আতাতুর্কের স্বাক্ষরটি পরবর্তীতে জাল করা হয়েছিল, যাতে সিদ্ধান্তটিকে বৈধতা দেওয়া যায়।
ব্রিটিশ লেখিকা গ্রেস এলিসন ১৯২৩ সালে প্রকাশিত তার 'অ্যান ইংলিশউম্যান ইন আঙ্কারা' বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ১৯২২ সালে এক সাক্ষাত্কারে তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা তাকে বলেছিলেন, আয়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে রাখলে যদি ক্যাথলিক খ্রিস্টান বিশ্ব অসন্তুষ্ট হয়, তবে একে জাদুঘরে রূপান্তর করা যেতে পারে বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে।
আবারো মসজিদে রূপান্তর
২০০৫ সালের ২৪ জুন 'ফাউন্ডেশন, ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ ও পরিবেশ সেবা সমিতি' আয়া সোফিয়াকে মসজিদ থেকে জাদুঘরে রূপান্তরের ১৯৩৪ সালের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে সুপ্রিম প্রশাসনিক আদালতে প্রথম মামলা দায়ের করে।
২০১৩ সালে একটি তুর্কি একাডেমিক জার্নালে ইতিহাসবিদ ইউসুফ হালাকোগলু এবং অন্যান্য গবেষকদের একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, আতাতুর্কের স্বাক্ষর জাল করে বেআইনিভাবে আয়া সোফিয়াকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের মে মাসে 'অ্যানাটোলিয়ান ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন' নামে একটি সংগঠন মসজিদের সামনের আঙিনায় ফজরের নামাজের আয়োজন করে এবং আয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তরের দাবিতে আড়াই কোটি স্বাক্ষর সংগ্রহ করে।
আয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে ফিরিয়ে আনার দাবি বাড়তে থাকলে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সরকার ভবনের পেছনের অংশে নামাজ আদায় এবং এর প্রাঙ্গণ থেকে আজান দেওয়ার অনুমতি দেয়।
২০১৬ সালের জুনে তুরস্কের ধর্ম বিষয়ক অধিদপ্তর রমজান মাসজুড়ে আয়া সোফিয়ায় প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াতের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভেতর থেকে শবে কদরের বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। সে সময় তুর্কি মুয়াজ্জিন ফাতেহ কোজা ঠিক সেই জায়গা থেকেই আজান দেন, যেখান থেকে জাদুঘরে রূপান্তরের আগে শেষ আজান দেওয়া হয়েছিল।
বিভিন্ন সংগঠন বারবার আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পর, অবশেষে ২০২০ সালের ১০ জুলাই তুরস্কের সুপ্রিম প্রশাসনিক আদালত একটি ঐতিহাসিক রায় দেয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৮৬ বছর ধরে স্থগিত থাকা আয়া সোফিয়ার ধর্মীয় পরিচয় আবারো প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই রায়টি ছিল ১৪৫৩ সালে সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহের তৈরি মূল ওয়াকফ দলিলের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে আয়া সোফিয়াকে চিরকালের জন্য মসজিদ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
জাদুঘরের স্থিতি বাতিল হওয়ার পরপরই এরদোয়ান একটি অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে আয়া সোফিয়ার পরিচালনা সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে ধর্ম বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে ন্যস্ত করা হয় এবং একে পুনরায় ইবাদতের স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০২০ সালের ২৪ জুলাই এখানে আবারো প্রথম জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
সূত্র : আল জাজিরা
এনটি
