বিজ্ঞাপন

খতিব তাবরিজি

সিরিয়া, ইরাক ও মিসরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন যে মুসলিম মনীষী

সিরিয়া, ইরাক ও মিসরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন যে মুসলিম মনীষী

শাম (সিরিয়া), ইরাক ও মিসরে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের আলো ছড়িয়েছিলেন খতিব আত তাবরিজি। পঞ্চম হিজরির আরবি ভাষা ও সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে। জন্ম শহর ইরানের তাবরিজের নামানুসারে তিনি খতিব আত তাবরিজি নামে পরিচিতি পান। জ্ঞানার্জন ও তা ছড়িয়ে দিতে শাম (সিরিয়া), ইরাক ও মিসর— এই অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘ ভ্রমণে করেছিলেন তিনি। ভাষা, সাহিত্য এবং বিখ্যাত মোয়াল্লাকার (আরবি জাহেলি যুগের এক উল্লেখযোগ্য কাব্য সংকলন) চমৎকার ব্যাখ্যা বা শরাহ লিখে সুবিশাল জ্ঞানভাণ্ডার রেখে গেছেন তিনি।

জন্ম ও বেড়ে উঠা

৪২১ হিজরিতে (১০৩০ খ্রিস্টাব্দ) বর্তমান উত্তর ইরানের আজারবাইজান অঞ্চলের তাবরিজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন আবু জাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে আলী ইবনে মুহাম্মদ আশ শাইবানি আত তাবরিজি। তিনি বাগদাদে বেড়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে শাম ও মিসর সফর শেষে পুনরায় বাগদাদে ফিরে আসেন।

শিক্ষা জীবন

খতিব আত তাবরিজির শিক্ষাজীবনের প্রথম ধাপ শুরু হয় ইরাকে। সেখানে বাগদাদ, বসরা ও জুরজানের অনেক নামজাদা আলেমদের কাছে ভাষা, ধর্মীয় শাস্ত্র ও সাহিত্যের পাঠ নেন। তার শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন কাজী আবু আল তৈয়ব তাহের ইবনে আবদুল্লাহ আল তাবারী, আবুল কাসেম আলী ইবনে মহসিন আত তানুখী, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিস খতিব আল বাগদাদী, ইবনুল দাহহান, লেখক আবু আল জাওয়াইজ আল হুসাইন ইবনে আলী এবং ব্যাকরণবিদ আবুল কাসেম আল ফাদল ইবনে মুহাম্মদ আল কাসবানি। তাদের কাছে জ্ঞান অর্জনের পর তিনি কিছু সময়ের জন্য নিজ শহর তাবরিজে ফিরে যান এবং পরে শাম ও মিসরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

শাম অঞ্চলে যাওয়ার পথে মা'আররাত আল নু'মানে তিনি প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবু আল আলা আল মাররির সান্নিধ্য লাভ করেন এবং কিছুদিন তার অধীনে অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি আবু মনসুর আল আজহারীর ‘তাহজিব আল লুগাহ’ গ্রন্থটি ছাড়াও আল মাররির কবিতা, গদ্য এবং অন্যান্য সাহিত্য ও ভাষাবিষয়ক বই আয়ত্ত করেন।

এ ছাড়া তিনি আবদুল ওয়াহিদ ইবনে আলী ইবনে বুরহান, ফকিহ ও ব্যাকরণবিদ আবদুল কাহের আল জুরজানি, উবায়দুল্লাহ ইবনে আলী আল রুক্কি, আলী ইবনে আহমেদ আল ফালি, হিলাল ইবনে আল হাসান আল সাবি, আবু মুহাম্মদ আল হাসান ইবনে আলী আল জওহারী এবং বসরার ব্যাকরণবিদ ইবনে বুরহান আল আকবারীর মতো মনীষীদের কাছ থেকেও জ্ঞান অর্জন করেন। শাম ও মিসর সফর শেষ করে তিনি বাগদাদে ফিরে আসেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই স্থায়ী হন।

চিন্তাধারা

দীর্ঘ গবেষণা জীবনে তিনি ধর্মতত্ত্ব, ভাষা, ব্যাকরণ ও সাহিত্যের অনেক বই গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। এর ফলে তার মধ্যে এক বিস্তৃত ও গভীর পাণ্ডিত্য গড়ে ওঠে, যা তার অসংখ্য সাহিত্যকর্ম ও কবিতার ব্যাখ্যায় ফুটে উঠেছে। অনেক সমালোচকের মতে, এসব কাজে তার ওস্তাদ আল মাররির কাজের সুস্পষ্ট প্রভাব ছিল।

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল তার জ্ঞানের খ্যাতি। ভাষা, ব্যাকরণ ও সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষা নিতে বাগদাদে তার কাছে জ্ঞানপিপাসুদের ঢল নামত। তার জীবনীকারদের প্রায় সবাই তাকে বাগদাদের সাহিত্যের শায়খ, ভাষার ধারক এবং নিজ সময়ের সেরা ভাষাবিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তার বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন আন্দালুসের ইবনে আল সিদ আল বাতালিওসি, আবু আল বাকা আল আকবারি, মিসরের ব্যাকরণবিদ ইবনে হিশাম, আবদুল কাদের আল বাগদাদী, জালালুদ্দিন সুয়ুতী, ইবনে বাবশাজ এবং হিবেতুল্লাহ ইবনে আল শাজারী।

তিনি তার লেখা ও সম্পাদনায় এক বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতেন, যার মূল ভিত্তি ছিল সংক্ষিপ্তকরণ, সমন্বয় ও নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা। কবিতার ব্যাখ্যায় তিনি এমন এক পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন, যাকে সমালোচকরা পরিমার্জিত ও সমন্বিত পদ্ধতি হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি পূর্ববর্তী সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ একত্র করে একটি নিখুঁত ও মানসম্মত রূপ দিতেন, যা শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য আগের অন্যান্য বইগুলোর বিকল্প হিসেবে কাজ করত।

কর্মজীবন ও দায়িত্ব

জ্ঞানার্জনের সফর শেষে বাগদাদে ফিরে তিনি বিখ্যাত নিজামিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। পাশাপাশি সেখানকার গ্রন্থাগারের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ও সংরক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বই লেখা ও গবেষণার কাজও অব্যাহত রাখেন।

ইন্তেকাল

৫০২ হিজরির ২৮ জুমাদাস সানি (১১০৯ খ্রিস্টাব্দ) ৮১ বছর বয়সে বাগদাদে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন খতিব আত তাবরিজি ।

এনটি