বিজ্ঞাপন

এআই দিয়ে কাবার পুরোনো ছবি তৈরি, আসল ছবি দেখতে যেমন

এআই দিয়ে কাবার পুরোনো ছবি তৈরি, আসল ছবি দেখতে যেমন

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে পবিত্র কাবা শরীফের একটি ছবি। অনেকে দাবি করেন, এটি কাবা শরীফের সবচেয়ে পুরোনো আলোকচিত্র। এর কৃতিত্ব দেওয়া হয় মিসরীয় প্রকৌশলী ও সামরিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদেক পাশাকে। দাবি করা হয়, ছবিটি তোলা হয়েছে ১৮৮০ সালে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো এই পোস্টগুলোর সঙ্গে কিছু ঐতিহাসিক ও প্রযুক্তিগত তথ্যও যুক্ত করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ছবিটি ওয়েট প্লেট কলোডিয়ন প্রযুক্তিতে তোলা এবং এই ছবির জন্য ১৮৮১ সালে ভেনিস ভৌগোলিক প্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন মোহাম্মদ সাদেক পাশা।

ছবিটিকে ঘিরে এই ধরণের মুখরোচক বর্ণনা ছড়িয়ে পড়ার পর এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। 

ছবিটি ছড়িয়ে পড়ে যেভাবে

ছবিটির উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে আল জাজিরার ডিজিটাল অনুসন্ধান বা ওপেন সোর্স টিম দেখেছে, ছবিটি প্রথম অনলাইনে আসে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পেশাজীবীদের প্ল্যাটফর্ম লিংকডইনে।

শাহজাদ চৌহান নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটি পোস্ট করে কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল বা আর্কাইভের সূত্র ছাড়াই সেটিকে কাবা শরীফের সবচেয়ে সুন্দর ও পুরোনো ছবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এরপর ছবিটি ছড়িয়ে পড়ে ইনস্টাগ্রাম, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং টিকটকের মতো অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে।

অনেকে এই ঐতিহাসিক বিরল ছবিটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে ভিডিওতে রূপান্তর করেন, যাতে তৎকালীন ওমরাহ পালনকারীদের রূপ এবং কাবার চারপাশের স্থাপত্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।

সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৮ জুলাই ছবিটি নতুন করে ছড়াতে থাকে এবং দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলা হয় ছবিটি ১৮৮০ সালে মোহাম্মদ সাদেক পাশার তোলা।

যদিও ছবিটির সাথে আলোকচিত্রী ও তৎকালীন ছবি তোলার প্রযুক্তি নিয়ে নানা বিস্তারিত তথ্য জুড়ে দিয়ে পোস্টগুলোকে নির্ভরযোগ্য করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে ছড়ানো ছবিটির সঙ্গে আলোকচিত্রী মোহাম্মদ সাদেক পাশার যুক্ত থাকার মতো কোনো বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফেক ছবি শনাক্তকরণের বিশেষায়িত সরঞ্জামগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি করা হয়েছে 

অনুসন্ধানে যা বেড়িয়ে এলো

আল জাজিরার ওপেন সোর্স বিভাগ ছবিটির রিভার্স ইমেজ সার্চ বা উল্টো অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছে, মোহাম্মদ সাদেক পাশার সংগ্রহ রয়েছে এমন কোনো জাদুঘর, লাইব্রেরি বা ঐতিহাসিক আর্কাইভে এই ছবিটির কোনো অস্তিত্ব নেই।

এছাড়া অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ছবিটি প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্যসূত্র বা অনুমোদিত ঐতিহাসিক দলিল ছাড়াই পোস্ট করা হয়েছিল, যা এর সত্যতাকে শুরুতেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।

পরবর্তীতে এআই দিয়ে তৈরি ছবি শনাক্তকরণ যন্ত্রে ছবিটি পরীক্ষা করা হলে প্রধান টুলগুলো নিশ্চিত করে যে, ছবিটি পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি।

দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণ ও পার্থক্য

অনলাইনে ছড়ানো ছবিটির সাথে মার্কিন লাইব্রেরি অব কংগ্রেস এবং খলিলি আর্ট অ্যান্ড হজ কালেকশনে রক্ষিত কাবা শরীফ ও মসজিদুল হারামের আসল ছবির তুলনা করে বেশ কিছু স্পষ্ট গরমিল ধরা পড়ে, যা সামাজিক মাধ্যমের ছবিটি ভুয়া হওয়ার প্রমাণ দেয়।

প্রকৃত ছবির সাথে এআই নির্মিত ছবিটির কাবার আকৃতি ও কিসওয়া বা গিলাফের ধরন, তাওয়াফের স্থান, খিলান এবং চারপাশের স্তম্ভ ও স্থাপত্যের নকশায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়।

তাছাড়া ছবিতে থাকা মানুষের মুখের অবয়বে কিছু অস্বাভাবিকতা এবং একই ধরনের চেহারার পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে, যা এআই নির্মিত ছবির অন্যতম পরিচিত লক্ষণ।

খলিলি কালেকশনে সংরক্ষিত ১২৯৭ হিজরির (১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ) মোহাম্মদ সাদেক পাশার আসল ছবির সাথে সম্প্রতি ছড়ানো ছবিটির কোনো মিল নেই।

ঐতিহাসিক দলিল

খলিলি কালেকশনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কাছে থাকা ছবিগুলোতে মোহাম্মদ সাদেক পাশার স্বাক্ষর রয়েছে এবং সেগুলো ১৮৮০ সালের তোলা। এগুলো সেই অ্যালবামের অংশ যা ১৮৮১ সালে ভেনিসে অনুষ্ঠিত তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক সম্মেলনে প্রদর্শিত হয়েছিল।

ঐতিহাসিক ছবিগুলোর মধ্যে ১৮৮৫ সালে মক্কার চিকিৎসক আবদুল গাফফারের তোলা কাবার চারপাশে নামাজ আদায়ের দৃশ্য সংবলিত ছবিটিও বেশ বিখ্যাত। তিনি মক্কায় আলোকচিত্রবিদ্যা শেখার পর মসজিতুল হারামের ছবি তোলা শুরু করেছিলেন।

ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ছড়ানো ছবিটিকে মার্কিন লাইব্রেরি অব কগ্রেসের ১৯১০ সালের একটি ছবির সাথেও মেলানো হয়, যেখানে ওপর থেকে কাবা শরীফের চারপাশে ভিড়ের দৃশ্য দেখা যায়। দুটি দৃশ্যের স্থাপত্যশৈলী, চারপাশের চিত্র এবং কাবার রূপ ও গিলাফের গঠনে আকাশ-পাতাল তফাত পাওয়া গেছে।

ফলে স্পষ্ট হয় যে, ছড়িয়ে পড়া ছবিটি কাবা শরীফের কোনো আসল ঐতিহাসিক ছবি নয়, ছবিটি স্রেফ এআই দিয়ে তৈরি একটি কাল্পনিক চিত্র।

মক্কার পুরোনো ও নতুন ছবি নিয়ে কাজ করা অনলাইন আর্কাইভ মক্কা ফটো মেমোরি জানিয়েছে, ছবিটি মোটেও আসল নয়। ছবিটি হয়তো পুরোটা এআই দিয়ে বানানো, অথবা মক্কার প্রাচীন দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে নির্মিত কোনো সিনেমার সেট বা ডেকোরেশনে তোলা ছবি।

ছবিটিকে সত্যি বলে চালিয়ে দিতে মোহাম্মদ সাদেক পাশা সম্পর্কে কিছু আংশিক সঠিক তথ্য এর সাথে যুক্ত করা হয়েছিল। অথচ সেই সময়ের দুই পবিত্র মসজিদের আসল আলোকচিত্র এখনো লাইব্রেরি অব কংগ্রেস এবং খলিলি কালেকশনের মতো বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে, যা ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ানো এআই ছবির চেয়ে একদমই আলাদা।

আসল ছবি

ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ সাদিক পাশার সংগ্রহশালা (খলিলি কালেকশন) থেকে মক্কার মসজিদুল হারামের একটি আলোকচিত্র।

১৯১০ সালে পবিত্র কাবা এবং কাবা তাওয়াফকারীদের একটি পুরোনো ছবি। (লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস)।

মোহাম্মদ সাদেক পাশা কে?

মিসরীয় এই সেনা কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী ১৯ শতকে পবিত্র হারামাইন শরিফাইনের দৃশ্য লেন্সে বন্দী করা প্রথম দিককার ফটোগ্রাফার ছিলেন।

তিনি ১৮৬১ থেকে ১৮৮১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ওয়েট প্লেট কলোডিয়ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে হজ ও পবিত্র স্থানগুলোর ছবি তুলেছিলেন। তার রেখে যাওয়া এই কাজ মক্কা ও মদিনার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৮৮১ সালে ভেনিসের তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক সম্মেলনে মক্কা ও মদিনার ১২টি ছবি সংবলিত অ্যালবাম প্রদর্শন করে তিনি স্বর্ণপদক পান। তার এই বিখ্যাত কাজগুলো আজ খলিলি কালেকশনসহ বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।

সৌদি আরবের ভূখণ্ডে তোলা প্রথম ছবি

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, বর্তমান সৌদি আরবের সীমানায় তোলা প্রথম আলোকচিত্রটির তারিখ ১২৭৭ হিজরি (১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ)। মিসরীয় আলোকচিত্রী মোহাম্মদ সাদেক পাশা আল ওয়াজহ এবং ইয়ানবুর মধ্যকার হজের পথ জরিপ করার সময় মদিনা মুনাওয়ারায় এই ছবিটি তুলেছিলেন।

সৌদি প্রেস এজেন্সির বরাতে বিগিনিংস অব প্রেস ফটোগ্রাফি ইন দ্য কিংডম অব সৌদি আরাবিয়া বইয়ে বলা হয়েছে, এটিই সৌদি ভূখণ্ডে তোলা সবচেয়ে পুরোনো ছবি। এটি তুলতে তিনি বিশাল আকারের ক্যামেরা ও ভেজা প্লেট প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন।

বইটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৮৮১ সালে তিনি আবারও মক্কা ও মদিনা সফর করেন এবং সে সময় ছবিগুলোর মাধ্যমে সফলভাবে হজের নানা দৃশ্য ও আচার-অনুষ্ঠান নথিভুক্ত করেন।

সূত্র : আল জাজিরা

এনটি