রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত সাহাবিদের একজন তামিম বিন আউস আদ-দারি (রা.)। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) খিলাফতকালে শ্রেষ্ঠ তিন ইমামের একজন ছিলেন তিনি। মসজিদে প্রথম প্রদীপ বা বাতি জ্বালানোর প্রচলন এবং মসজিদে প্রথম ওয়াজ-নসিহতের সূচনা করেন তিনি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় যে কয়েকজন সাহাবি সম্পূর্ণ কোরআন একত্রিত ও মুখস্থ করেছিলেন, তিনি তাদের অন্যতম। একইসঙ্গে একজন সুপরিচিত কারী ছিলেন তিনি।
সাহাবিদের মধ্যে অত্যন্ত সম্মানিত ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন তামিম আদ-দারি (রা.)। তার বহুমাত্রিক গুণাবলীর কারণে তিনি এই সম্মান ও পরিচিতি লাভ করেন। তার উদ্ধৃতি দিয়ে দাজ্জাল সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন মহানবী (সা.)।
বংশ পরিচয়
তামিম আদ-দারির (রা.) পূর্ণ নাম তামীম ইবনে আউস ইবনে হারিসা ইবনে আদ-দার ইবনে হানি ইবনে হাবিব ইবনে নুমারা ইবনে মালিক ইবনে আদি ইবনে আল-হারিস ইবনে মুররা ইবনে উদাদ ইবনে ইয়াসজুব ইবনে ইয়ারুব ইবনে যায়েদ ইবনে কাহলান ইবনে সাবা। তার উপনাম ছিল আবু রুকাইয়্যা। রুকাইয়্যা ছিলেন তার একমাত্র কন্যা, এক কন্যা ছাড়া তার আর কোনো সন্তান নেই। তার পূর্বপুরুষ 'দার'-এর নামানুসারে তাকে 'আদ-দারী' বলা হয়। তামীম ইবনে আউস বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রথম আমির হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ইসলাম গ্রহণ
খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি। এক খ্রিস্টান রাহেব বা ধর্মযাজকের মাধ্যমে তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.) নবুয়তের খবর জানতে পারেন। তামিমের ভাই আবু হিন্দ আদ-দারির বরাতে ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন, আমরা ছয়জনের একটি দল মক্কায় রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে উপস্থিত হই। এই দলে ছিলেন তামিম ইবনে আউস, তার ভাই নুয়াইম ইবনে আউস, ইয়াজিদ ইবনে কাইস, আবু হিন্দ ইবনে আবদুল্লাহ, তার ভাই তাইয়েব ইবনে আবদুল্লাহ (রাসুলুল্লাহ(সা.) যার নাম বদলে আবদুর রহমান রাখেন) এবং ফাকিহ ইবনে নুমান। আমরা সবাই ইসলাম গ্রহণ করি। তখন মহানবী (সা.) বললেন, তোমরা ফিরে যাও, যতক্ষণ না শোনো যে আমি হিজরত করেছি। আবু হিন্দ বলেন, আমরা ফিরে গেলাম। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করলেন, তখন আমরা তার কাছে আসি।
তামিমের (রা.) নিজের বর্ণনায় এসেছে, মদিনায় আসার পর তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে আবেদন জানান, আল্লাহ যদি মুসলমানদের শামের ভূখণ্ড দান করেন, তবে যেন তাকে সেখানকার কিছু জমি দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন তার গোত্রের যত বেশি সম্ভব লোককে সঙ্গে নিয়ে আসেন। কারণ হিরাক্লিয়াসের অধীনে তাবুক অঞ্চলের একেবারে কাছে বসবাস করতো তার গোত্রসহ লাখম, জুযাম ও গাসসান গোত্রের লোকেরা।
১৫ হিজরিতে আমিরুল মুমিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) আমলে বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রথম আমির নিযুক্ত হন তিনি। হিজরি ৩৫ থেকে ৪০ সন পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।
গুণাবলী
সাহাবিদের মধ্যে তামিম আদ-দারি এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। নবী কারিম (সা.) একমাত্র তার বর্ণিত হাদিস নিজে সাহাবিদের কাছে বর্ণনা করেছেন, যা দাজ্জাল ও জাসসাসা সংক্রান্ত হাদিস। তিনি ছিলেন প্রথম খ্রিস্টান ধর্মযাজক যিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী (সা.)-কে প্রথম একটি উন্নতমানের আরবি ঘোড়া উপহার দিয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি সামুদ্রিক জাহাজে মালামাল পরিবহন ও নৌভ্রমণে তার বিশেষ দক্ষতা ছিল, কারণ ইসলাম গ্রহণের আগে আবিসিনিয়ার সাথে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। এ কারণে তিনি সামুদ্রিক জিহাদে অংশ নেন এবং আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। কাবা শরীফে মাত্র সাত রাতে সম্পূর্ণ কোরআন খতমকারী প্রথম সাহাবি ছিলেন তিনি।

তামিম আদ-দারিএকজন অকুতোভয় মুজাহিদ ছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.) পাশে থেকে জিহাদ করেছেন এবং তার ইন্তেকালের পর পরবর্তী খলিফাদের আমলেও জিহাদে অংশ নেন। মিসর বিজয়ে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানে বসবাসকারী সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত হন।
তার জিহাদী চেতনার একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত তুলে ধরে রূহ ইবনে জিনবা বলেন, তামিম আদ-দারি যখন বাইতুল মুকাদ্দাসের আমির ছিলেন তখন একদিন আমি তার কাছে গেলাম। তখন তিনি নিজের ঘোড়ার জন্য যব পরিষ্কার করছিলেন। আমি বললাম, হে আমির, আপনাকে এই কাজ করে দেওয়ার মতো কি কেউ ছিল না? তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে তার ঘোড়ার জন্য যব পরিষ্কার করে এবং তা ঘোড়াকে খাওয়ায়, আল্লাহ প্রতিটি যবের দানার বদলে তার জন্য একটি করে নেকি লিখে দেন।
ইবনে মাজাহ বর্ণিত অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় কোনো ঘোড়া বেঁধে রাখে এবং নিজ হাতে তার খাবারের ব্যবস্থা করে, আল্লাহ তাকে প্রতিটি দানার বিনিময়ে একটি করে নেকি দান করেন।
মসজিদে বাতি জ্বালানোর প্রচলন
মসজিদে প্রথম আলো জ্বালানোর গৌরবও তারই। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, মসজিদে যিনি প্রথম আলো জ্বালান, তিনি তামিম আদ-দারি। 'আল-ইসতিয়াব' গ্রন্থের লেখক ইবনে আবদিল বার তামিমের সেবক 'সিরাজ'-এর জীবনীতে এই ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে বলেন—
আমরা পাঁচজন তরুণ তামিম আদ-দারির সাথে নবী কারিম (সা.)-এর কাছে আসি। তামিমের নির্দেশে আমি প্রদীপে তেল দিয়ে মসজিদে আলো জ্বালাই। এর আগে সেখানে শুধু খেজুরের শুকনো পাতা জ্বালানো হতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের মসজিদে কে আলো জ্বালিয়েছে? তামিম বললেন, আমার এই সেবক। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, তার নাম কি? তামিম বললেন, ফাতাহ। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, না, তার নাম সিরাজ (প্রদীপ)। সেই থেকে নবীজি তার নাম রাখেন সিরাজ।

মসজিদে মিম্বার স্থাপন
তিনিই প্রথম মসজিদে মিম্বর তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, নবী কারিম (সা.)-এর শরীর যখন ভারী হয়ে যায়, তখন তামিম আদ-দারি তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি আপনার জন্য এমন একটি মিম্বর তৈরি করে দেব না যা আপনাকে ধারণ করতে পারে বা আপনার ভার বহন করবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারপর তিনি তার জন্য দুই ধাপের একটি মিম্বর তৈরি করে দেন।
মসজিদে ওয়াজ নসিহতের প্রচলন
তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম গল্পকার বা ধর্মীয় ঘটনার বর্ণনাকারী। ইতিহাসবিদ আজ-জাহাবী উল্লেখ করেন, তামিম আদ-দারি দীর্ঘ দিনি খলিফা ওমরের (রা.) কাছে মসজিদে ওয়াজ-নসিহত ও উপদেশ দেওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু ওমর (রা.) রাজি হননি। বারবার অনুরোধের পর খলিফা জিজ্ঞেস করেন, তুমি কী বলতে চাও? তামীম বললেন, আমি তাদের কোরআন পড়ে শোনাব, সৎকাজের আদেশ দেব এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করব। ওমর (রা.) বললেন, জুমার খুতবার আগে নসিহত করো। তিনি তা-ই করতেন। পরে খলিফা উসমানের (রা.) আমলে সময় আরও বাড়ানো হয়।

ইসলাম গ্রহণের আগে জাহেলি যুগেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি নিজের জ্ঞানকে আরও শাণিত করেন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের শিক্ষায় আত্মনিয়োগ করে তিনি সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম বড় আলেম ও হাফেজ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। মহানবীর (সা.) শিক্ষা সভাগুলো থেকে তিনি গভীরভাবে জ্ঞান আহরণ করেছিলেন।
জ্ঞান ও ইবাদত
কোরআন সংকলক ও হাফেজদের অন্যতম ছিলেন তামিম আদ-দারি (রা.)। ইবনে সিরিন বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে চারজন ব্যক্তি কোরআন সম্পূর্ণ একত্রিত করেছিলেন—উবাই ইবনে কাব, উসমান, যায়েদ এবং তামিম আদ-দারি।
আল্লাহ তায়ালা তামিমকে চমৎকার ও সুরেল কণ্ঠ দিয়েছিলেন, যা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেত মাসরুক থেকে বর্ণিত, তামিম আদ-দারি (রা.) এক রাতে সালাতে দাঁড়িয়ে শুধু একটি আয়াতই বার বার তিলাওয়াত করতে করতে সকাল করে ফেলেছিলেন। আয়াতটি ছিল, তুমি যদি তাদের শাস্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদের ক্ষমা করো তবে তুমি তো পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।
তামিম আদ-দারির (রা.) জীবনী থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে তিনি ছিলেন বাস্তবমুখী জ্ঞানসম্পন্ন আলেমদের একজন। তিনি তাকওয়া, জোহদ (দুনিয়াবিরাগ), বিনয় ও গভীর দূরদর্শিতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন।

নবীজির দরবার থেকে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগিয়ে তিনি হৃদয়গ্রাহী ওয়াজ ও নসিহতের মাধ্যমে মানুষকে সৎপথ দেখাতেন। এ কারণেই শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে খলিফা ওমর (রা.) তাকে মসজিদে মানুষকে উপদেশ দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও পরিশ্রমী। বর্ণিত আছে, একবার ভুলবশত রাতে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে তাহাজ্জুদের সালাত মিস হয়। শাস্তি হিসেবে পুরো এক বছর রাতে না ঘুমিয়ে ইবাদত করেছিলেন তিনি।
ইন্তেকাল
৪০ হিজরি সনে শামে (সিরিয়া অঞ্চল) ইন্তেকাল করেন তিনি। ফিলিস্তিনের বাইত জিবরিন এলাকায় তাকে দাফন করা হয়।
এনটি
