ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথম মাদরাসার সূচনা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, ৪৫৯ হিজরিতে উজির নিজামুল মুলক ‘মাদরাসা নিজামিয়া’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই ব্যবস্থার সূচনা করেন। তবে ইতিহাসের বইগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাদরাসা ব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছিল হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগ কিংবা তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিকে।
সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি ছিল বুখারার প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম আবু হাফস আল বুখারীর (১৫০-২১৭ হিজরি)। প্রতিষ্ঠাতার নামানুসারে ধারণা করা হয়, মাদরাসাটি তার জীবদ্দশাতেই গড়ে উঠেছিল। আবু হাফস আল বুখারী ছিলেন বুখারা শহরের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। এই ঘটনার পর থেকে প্রাচ্যের ইসলামী ভূখণ্ডে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গতি পায়।
চতুর্থ হিজরির শুরুতে নিশাপুরে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইমাম আবু হাতিম মোহাম্মদ ইবনে হিব্বান আল তামিমি আল শাফেয়ী (২৭০-৩৫৪ হিজরি)।
সে সময়ে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলো একক মাযহাবভিত্তিক ছিল, অর্থাৎ প্রতিটি মাদরাসায় শুধু একটি নির্দিষ্ট মাযহাবের শিক্ষা দেওয়া হতো। কারণ খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে মাযহাবগত যে প্রতিযোগিতা ছিল, তা সিহুন-জিহুন (আমু দরিয়া-সির দরিয়া) নদী অববাহিকার মা-ওরাউন-নাহর অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
উল্লেখ্য, বাগদাদে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার আগে সিরিয়ার দামেস্কে মাদরাসার সূচনা হয়েছিল। সেখানে ৩৯১ হিজরিতে প্রথম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়, যার নাম ছিল ‘মাদ্রাসা সাদরিয়া’। প্রতিষ্ঠাতা সাদির ইবনে আবদুল্লাহর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। এর পর ৪০০ হিজরির দিকে দামেস্কের কারী রশা ইবনে নাযিফ প্রতিষ্ঠা করেন ‘মাদ্রাসা রশাইয়া’। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মসজিদের হালাকা বা দরস থেকে বেরিয়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার জন্য নির্ধারিত স্থানে আসতে শুরু করে। সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ এবং পড়াশোনার প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করা হতো।
নিজামিয়া মাদরাসার আগে ক্রমানুসারে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
ইমাম আবু হাফস আল ফকিহ আল বুখারীর মাদরাসা (১৫০-২৪৭ হিজরি)।
ইবনে হিব্বানের মাদরাসা: চতুর্থ হিজরির শুরুর দিকে, অর্থাৎ প্রায় ৩০৫ হিজরিতে আবু হাতিম মোহাম্মদ ইবনে হিব্বান আল বুসতি নিজ শহর বুসতে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সেখানে তিনি লাইব্রেরি ও শিক্ষার্থীদের থাকার কামরা তৈরি করে দেন।
আবু আল ওয়ালিদের মাদরাসা: ৩৪৯ হিজরির আগে শাফেয়ী মাজহাবের আলেম আবু আল ওয়ালিদ হাসসান ইবনে আহমেদ আল নিশাপুরী (মৃত্যু ৩৪৯ হিজরি) মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতেন বলে জানা যায়।
মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাম্মাদের (মৃত্যু ৩৮৮ হিজরি) মাদরাসা: ইমাম সুবকি তার বর্ণনা দিয়ে বলেন, তিনি ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত টানা মসজিদ ও তার নিজের মাদরাসায় অবস্থান করতেন।
মাদরাসা সাদরিয়া: ৩৯১ হিজরিতে দামেস্ক শহরে আমির শুজাউদ্দৌলা সাদির ইবনে আবদুল্লাহ এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
নিশাপুরের মাদরাসা বায়হাকী: নিজামুল মুলকের জন্মের (৪০৮ হিজরি) আগেই এই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
আবু বকর আল বুসতির (মৃত্যু ৪২৯ হিজরি) মাদরাসা: নিশাপুরের আলেমদের জন্য তিনি নিজ বাড়ির দরজার সামনে এই মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং নিজের সম্পদের একটি অংশ এর জন্য ওয়াকফ করে দেন। তিনি ছিলেন নিশাপুরের প্রখ্যাত শিক্ষক ও পরিদর্শক।
ইমাম আবু হানিফা মাদরাসা: ইমাম আবু হানিফার মাজারের পাশে এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবু সাআদ ইবনুল মুস্তাওফি। মাদরাসা নিজামিয়া উদ্বোধনের ঠিক ৫ মাস আগে এই মাদরাসা চালু হয়।
কোনো কোনো ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন যে, গজনবী শাসকরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দিয়েছিলেন। বিশেষ করে নিশাপুরের গভর্নর থাকাকালে নাসর ইবনে সুবুকতেগিন ‘মাদরাসা সাদিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তীতে নিজামুল মুলক যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি মাদরাসা বিকাশের এই একাধিক মডেল সামনে দেখতে পান। পাশাপাশি তিনি দেখেন, মিসরের ফাতিমীয়রা কীভাবে আল আজহার প্রতিষ্ঠা করে সেই মাদরাসাকে নিজেদের শিয়া মতবাদ প্রচার ও প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এসব ঘটনা তাকে একটির বদলে পুরো মাদরাসা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে, যাতে অস্ত্রধারী মুজাহিদদের পাশাপাশি লেখনী ও শিক্ষার মাধ্যমে পথভ্রষ্টদের মোকাবিলা করা যায়।
৪৫৫ হিজরিতে সেলজুক সুলতান আল্প আরসলান সিংহাসনে আরোহণের পর শিয়া ইমামিয়া এবং ইসমাইলি বাতেনি মতবাদের প্রভাব রুখতে এসব নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার বাস্তব পরিকল্পনা শুরু হয়। সুলতান তার উজির হিসেবে নিয়োগ দেন এক যোগ্য ও সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিত্বকে, যার নাম হাসান ইবনে আলী ইবনে ইসহাক আল তুসী, যিনি ইতিহাসে ‘নিজামুল মুলক’ নামে পরিচিত।
এই উজির অনুধাবন করেন, শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তি দিয়ে শিয়া ইমামিয়া ও ইসমাইলি বাতেনিদের থামানো সম্ভব নয়; রাজনৈতিক প্রতিরোধের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী বুদ্ধিভিত্তিক ও আদর্শিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ শিয়ারা সে সময় এবং তার আগেও বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে তাদের মতাদর্শ প্রচারে ব্যাপক সক্রিয় ছিল। সেই প্রচারণাকে যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হলে একটি সমকক্ষ সুন্নি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প ছিল না।
বিশেষ করে সেলজুকরা পারস্য ও ইরাকে শিয়া বুয়াইহীদের প্রভাব উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল, আর বুয়াইহীরা শিয়া মতবাদ প্রসারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল। পাশাপাশি তারা পারস্য ও ইরাকে ইসমাইলি প্রবক্তাদের তৎপরতা দেখেও চোখ বন্ধ রেখেছিল। ফলে দুই অঞ্চলেই শিয়াদের প্রভাব বেড়ে যায়, বিশেষ করে তারা যখন নিজেদের আকাইদ প্রচারের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে শুরু করে।
আউদ আদ দাউলার অন্যতম সহযোগী আবু আলী ইবনে সাওয়ার (মৃত্যু ৩৭২ হিজরি) বসরা এবং রামহুরমুজ শহরে দুটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে পাঠদান ও অনুলিপির কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা ছিল। বসরা শহরের প্রতিষ্ঠানটিতে মুতাজিলা মতাদর্শের ইলমে কালাম পড়ানোর জন্য একজন শিক্ষক নিযুক্ত ছিলেন।
এছাড়া বাহাউদ্দৌলার উজির আবু নসর সাবুর ইবনে আরদাশীর (মৃত্যু ৪১৬ হিজরি) ৩৮৩ হিজরিতে কারখ এলাকায় একটি বিদ্যাপিঠ স্থাপন করেন। ইবনুল আসীরের বর্ণনা অনুযায়ী, সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের ১০ হাজার ৪০০ খণ্ড বই ছিল। মাদরাসাটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দুজন আলাভী এবং একজন কাজীকে। সাবুরের মৃত্যুর পর এর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পান আল তালেবীদের নেতা বিখ্যাত কবি শরীফ আল রাজি (মৃত্যু ৪০৬ হিজরি)।
শরীফ আল রাজি নিজেও ‘দারুল ইলম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সব উপকরণের ব্যবস্থা করেন।
এসব প্রতিষ্ঠানের নাম থেকেই বোঝা যায়, পুরনো লাইব্রেরিগুলোর সঙ্গে এগুলোর বড় পার্থক্য ছিল। আগে লাইব্রেরিকে বলা হতো ‘খিজানাতুল হিকমাহ’, যা শুধু বই রাখার স্থান ছিল। কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম দেওয়া হয় ‘দারুল ইলম’, যার একটি অংশ ছিল লাইব্রেরি। অর্থাৎ এই নতুন কেন্দ্রগুলোর অন্যতম প্রধান কাজ ছিল শিক্ষাদান।
এসব বিদ্যাপিঠ ছাড়াও শিয়া ইমামিয়া মতাবলম্বী অনেক আলেম তাদের নিজ ঘর কিংবা তাদের ভাষায় ইমামদের সমাধিস্থল বা ‘পবিত্র স্থান’ হিসেবে পরিচিত জায়গাগুলোতে নিজেদের মতবাদ শিক্ষা দিতেন ও ছড়িয়ে দিতেন।
মুসলিম বিশ্বে নিজামিয়া মাদ্রাসার প্রভাব
রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে নিজামুল মুলক যে সফলতা পেয়েছিলেন, তার নজির মেলা ভার। তার প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলো বিশেষ করে ‘নিজামিয়া বাগদাদ’ প্রায় চার শতাব্দী ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়েছে। এই মাদরাসায় পড়াশোনা করা সর্বশেষ ব্যক্তিত্ব হলেন ‘আল কামুস’ অভিধানের রচয়িতা আল ফিরোজাবাদী (মৃত্যু ৮১৭ হিজরি)। নবম হিজরি শতকের শেষের দিকে এই প্রতিষ্ঠানের পথচলা শেষ হয়।
দীর্ঘ এই সময়ে নিজামিয়া মাদরাসাগুলো শাফেয়ী সুন্নি মাযহাবের অনেক আলেম তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রশাসনের বিচার, হিসাব ও ফতোয়া বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দক্ষ কর্মকর্তা সরবরাহ করেছে এসব প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে শিক্ষা অর্জন করে শিক্ষার্থীরা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েন, এমনকি মিসরের বাতেনি সীমানা পেরিয়ে উত্তর আফ্রিকাতেও সুন্নি ভাবধারা শক্তিশালী করেন।
নিজামুল মুলক যে লক্ষ্য নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, তা এই শিক্ষার্থীদের হাতে বাস্তবায়িত হয়েছিল। তাদের অনেকেই অন্যান্য অঞ্চলে হিজরত করে শাফেয়ী ফিকহ ও হাদিস শিক্ষা দিয়েছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং বিচার, ফতোয়া ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলেছেন।
নিজামিয়া বাগদাদের প্রথম শিক্ষক আবু ইসহাক আল শিরাজীর বরাতে তাজউদ্দিন সুবকী উল্লেখ করেন, তিনি বলেছেন, আমি খোরাসানে গিয়ে এমন কোনো শহর বা গ্রাম পাইনি, যেখানে আমার কোনো ছাত্র বা সহপাঠী কাজী, মুফতি বা খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন না।
এই মাদরাসাগুলো উম্মাহর জীবনে সুন্নাহর চর্চাকে শক্তিশালীভাবে ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখে। এর অন্যতম প্রধান প্রভাব ছিল শিয়া মতাদর্শের প্রভাব কমে যাওয়া, বিশেষ করে এসব মাদরাসা থেকে শিয়া মতবাদের খণ্ডনে অসংখ্য বই প্রকাশিত হওয়ার পর এই প্রভাব কমতে থাকে।
শিয়া, বিশেষ করে ইসমাইলি বাতেনিদের বিরুদ্ধে মেধাভিত্তিক লড়াই চালানো ব্যক্তিতের শীর্ষে ছিলেন ইমাম গাজ্জালী। তিনি বাতেনিদের বিভ্রান্তি তুলে ধরে একাধিক বই লেখেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ‘ফাদাইহ আল বাতেনিয়া’। ৪৮৭ হিজরিতে খলিফা আল মুস্তাজহির তাকে এই বইটি লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
নিজামিয়া মাদরাসাগুলো ইমাম শাফেয়ীর মাযহাব প্রসারে অভূতপূর্ব সাফল্য পায়। এর ফলে এই মাযহাব শক্তিশালী হয় এবং ইরাক ও প্রাচ্যের নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে নিজামিয়া মডেল অনুসরণ করে মাদরাসা নির্মাণের একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যা দীর্ঘকাল ধরে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার আদর্শ মডেল হিসেবে কাজ করেছে।
নিজামিয়া মাদরাসার আলেমরা পরবর্তী সময়ে নুরুদ্দিন জেনকি এবং আইয়ুবী শাসকদের জন্য পথ সুগম করে দিয়েছিল। ফলে নিজামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও মিশন সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন।
সূত্র : আল জাজিরা
এনটি
