বিজ্ঞাপন

সুরা ইউসুফে যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে

সুরা ইউসুফে যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে

সুরা ইউসুফে হজরত ইয়াকুব (আ.), তার সন্তানদের ঘটনা, জীবনের কঠিন পরীক্ষা ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার মুহূর্তে আল্লাহর ওপর নিখাদ ঈমান ও ভরসার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সন্তান হারানোর সীমাহীন কষ্টের মাঝেও ইয়াকুব (আ.)-এর মনে মানবিক আশঙ্কা ও সতর্কতা, একইসঙ্গে ছিল আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের ওপর তার বিষয়ে তেমনই বিশ্বাস করব, যেমন বিশ্বাস আগে করেছিলাম তার ভাইয়ের ব্যাপারে? সুতরাং আল্লাহই সর্বোত্তম রক্ষক এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়াময়।

এই আয়াত আমাদের এক পরম সত্য শিক্ষা দেয়—মানুষ হাজার চেষ্টা বা উপায় অবলম্বন করলেও মূল রক্ষক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। 

স্মৃতির ক্ষত ও ছেলেদের প্রতি নবী ইয়াকুবের জবাব

ইয়াকুব (আ.)-এর ছেলেরা যখন ছোট ভাইকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার আকুতি জানিয়ে বলেছিল, আমরা অবশ্যই তার রক্ষক হব, তখন তাদের এই প্রতিশ্রুতি ইয়াকুব (আ.)-এর পুরনো ক্ষতকে আবার তাজা করে তোলে। অনেক বছর আগে হজরত ইউসুফকে (আ.) নিয়ে যাওয়ার সময়ও তারা ঠিক একই কথা বলেছিল।

ছেলেরা সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিলেও পিতার মন তা মেনে নিতে পারছিল না। তিনি অতীত ভুলে যাননি। তাই তাদের কথায় সায় না দিয়ে তিনি তাৎক্ষণিক ও সরাসরি জানতে চান, আমি কি ইউসুফের মতো তাকেও তোমাদের হাতে সঁপে দেব? তোমরা আগেও তাকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করেছ, তবে এবার কেন আমি ভুল করব?

আল্লাহই সর্বোত্তম রক্ষক

সন্তানদের কথার জবাবে ইয়াকুব (আ.) স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো মানুষের ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায় না। ভরসা শুধু আল্লাহর ওপরই রাখা যায়, যিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন।

মুফাসসিরদের মতে, ইয়াকুব (আ.) বিশ্বাস করতেন আল্লাহ যদি কাউকে রক্ষা করেন তবে কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ যদি রক্ষা না করেন তবে হাজার পাহারা দিয়েও কাউকে বাঁচানো সম্ভব নয়।

বিখ্যাত তাফসিরকার ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন, এই আয়াতের মাধ্যমে ইয়াকুব (আ.) মহান আল্লাহর দয়া ও নিজের বার্ধক্য-দুর্বলতার কথা স্মরণ করে আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করবেন এবং ইউসুফসহ তার সন্তানদের আবার মিলিয়ে দেবেন।

আসলে ইয়াকুব (আ.) অন্তরে আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। তিনি জানতেন, আল্লাহ যাকে মনোনীত করেন তাকে তিনি সঠিক পথ দেখান এবং নেয়ামত পূর্ণ করেন।

আল্লাহর নাম 'আল-হাফিজ' ও তার সীমাহীন দয়া

কোরআন মজিদে একক শব্দ হিসেবে হাফিজ বা রক্ষক শব্দটি একবারই এসেছে, যা সুরা ইউসুফের এই আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বহুবচন হিসেবে শব্দটি দুইবার এবং আল হাফিজ বা পরম রক্ষক শব্দটি তিনবার এসেছে।

উলামায়ে কেরামের মতে, আল্লাহর এই নামের প্রতি ঈমান আনার মূল কথা হলো—বান্দা তার দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় ক্ষতি থেকে একমাত্র আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে। পরম রক্ষক হিসেবে আল্লাহর প্রতি ইয়াকুব (আ.)-এর এই দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের শেখায় যে, জীবনের প্রতি পদে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা এবং তার ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখাই হলো বিপদে আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় উপায়।

একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেছেন আল্লাহর অসীম দয়ার কথা। মানুষের দয়া সীমাবদ্ধ ও শর্তসাপেক্ষ হলেও আল্লাহর রহমত অফুরন্ত। বিপদের মেঘ যতই ঘন হোক না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে বিশ্বাস রাখতে হবে যে তিনিই সর্বোত্তম দয়ালু— এটাই মুমিনের আসল বৈশিষ্ট্য।

এনটি