বয়স মূলত একজন মানুষের জীবনযাত্রার দীর্ঘতার প্রমাণ বহন করে। বয়সের সাথে সাথে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ে। তবে কমে আসে শরীরের শক্তি, একসময় একবারে ক্ষয় হয়ে যায়।
ইসলামের দৃষ্টিতে বয়স্ক বাবা-মায়ের যত্ন
বাবা-মায়ের সেবাকে সর্বোচ্চ মর্যাদার চোখে দেখা হয়েছে ইসলামে। মা-বাবার সেবা শুধু দায়িত্ব নয়, ইবাদত এবং মহান আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জনের পথ। পবিত্র কোরআনে বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান ও যত্নের বিষয়ে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সূরা আল-ইসরায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, আপনার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং বাবা-মায়ের সাথে সৎব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদেরকে উফ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না, বরং তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলো।
এই আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের পরই বাবা-মায়ের প্রতি দয়া ও করুণার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ও প্রবীণদের সেবার ওপর জোর দিয়েছেন। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রবীণদের সাথে তার আচরণ ছিল অনুকরণীয়।
বয়স্ক বাবা-মায়ের সেবা করার ৪টি উপায় তুলে ধরা হলো—
১. শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয় সহায়তা
বাবা-মায়ের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় টিকাদান এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া হাঁটাচলার জন্য সহায়ক সামগ্রী এবং বাথরুমে পিছলে পড়া রোধী ম্যাট বা রেইলিং বসানোর মতো প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এর মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা ও স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধি পায়।
প্রবীণদের সামগ্রিক ভালো থাকার জন্য তাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখা অপরিহার্য। সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগে ভুগছেন। তাই ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে তাদের বই পড়া, ধাঁধা মেলানো বা স্থানীয় মসজিদে স্বেচ্ছাসেবীর মতো বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে যুক্ত রাখা যেতে পারে।
তবে স্বাস্থ্যগত অবনতি বা মনস্তাত্ত্বিক কারণে অনেক প্রবীণ নিজেদের গুটিয়ে নেন। এ ক্ষেত্রে সন্তানদের উচিত তাদের সাথে নিয়মিত সময় কাটানো এবং অর্থপূর্ণ আলোচনায় যুক্ত রাখা। এতে তারা শারীরিক বা মানসিক সমস্যা সত্ত্বেও নিজেদের মূল্যবান মনে করবেন।
২. ধমীয়, আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা ও সহায়তা
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের আধ্যাত্মিক সংযোগ গভীর হয়, এর মাধ্যমে তারা মনে প্রশান্তি লাভ করেন। প্রবীণদের জন্য ধর্মীয় চর্চা মানসিক শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।
বাড়িতে জামাতে নামাজের ব্যবস্থা করা বা কোরআন তিলাওয়াতের আয়োজন তাদের পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক বন্ধন দৃঢ় করে। তাদের ইসলামী বই, আলোচনা বা ভিডিও দেখার সুযোগ করে দেওয়া এবং মসজিদে সামাজিক কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
৩. আর্থিক দায়িত্ব
বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়া একটি যৌথ দায়িত্ব। আর্থিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক ভাইবোন থাকলে নিজেদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা করে সুষম বণ্টন করা উচিত। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সেবাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বাবা-মায়ের সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং বাবা-মায়ের অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।
৪. সমসাময়িক বিষয়ে সচেতনতা ও সুরক্ষা
প্রবীণদের সুরক্ষায় একটি বড় পদক্ষেপ হলো প্রতারণা বা স্ক্যাম সম্পর্কে তাদের সচেতন রাখা। প্রবীণদের প্রায়ই আর্থিক প্রতারণার লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তাই সাধারণ প্রতারণামূলক কৌশলগুলো সম্পর্কে তাদের সতর্ক রাখা প্রয়োজন।
ডিজিটাল যুগে প্রবীণদের ডিজিটাল শিক্ষা দেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেটের সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার শিখলে তারা আত্মবিশ্বাসের সাথে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারবেন এবং বিভিন্ন অনলাইন প্রতারণা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন।
এনটি
