বিজ্ঞাপন

১৬ বছর বয়সেই যেভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষ হয়ে ওঠেন ইবনে সিনা

১৬ বছর বয়সেই যেভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষ হয়ে ওঠেন ইবনে সিনা

মধ্যযুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও দার্শনিক ছিলেন আবু আলী হুসাইন ইবনে সিনা। কয়েক শতাব্দী ধরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার রচনাগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স। বুখারায় বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবন কাটানো ইবনে সিনা ২০ বছর বয়সেই জ্ঞান-বিজ্ঞানে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। বিভিন্ন দেশ ঘুরে তিনি সমসাময়িক আলেম ও জ্ঞানীদের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেন এবং তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। রাজনীতিতেও যুক্ত হন, মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাকে নির্বাসিত ও কারাবন্দি হতে হয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে নাস্তিকতা ও ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগও আনা হয়েছিল।

ইবনে সিনা বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ রচনা করে গেছেন, তার অনেক গ্রন্থ আজও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত। কিছু গ্রন্থ মুদ্রিত হয়েছে, কিছু এখনো পাণ্ডুলিপি আকারে রয়েছে। তার অনেক রচনা কোনো চিহ্ন ছাড়াই হারিয়ে গেছে। তার জীবদ্দশাতেই কিছু বই লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়। আধুনিক সময়ে তার রচনা ফরাসি, চীনা, আইরিশসহ আরও বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

প্রাচ্যে এবং তার ছাত্র ও অনুসারীদের কাছে তিনি শায়খুর রইস ও ইসলামের অ্যারিস্টটল নামে পরিচিত। আর পাশ্চাত্যে তাকে চিকিৎসকদের যুবরাজ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। ইতিহাসবিদেরা তার বুদ্ধিমত্তাকে জার্মান কবি ও চিন্তাবিদ ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোটের মতো তীক্ষ্ণ এবং তার প্রতিভা ও সৃজনশীলতাকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো অসাধারণ বলে বর্ণনা করেছেন। তার অসাধারণ জ্ঞান ও দক্ষতা ইসলামী সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি এমন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানভাণ্ডার রেখে গেছেন, যার ওপর আজও বিশ্ব বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্ভর করা হয়।

জন্ম ও শৈশব

তার নাম হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাসান ইবনে আলী। তিনি ইবনে সিনা নামেই পরিচিত।  ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে (৩৭০ হিজরি) বর্তমান উজবেকিস্তানের আফশানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মায়ের সূত্রে গ্রামের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। মায়ের নাম কোথাও সিতারা, আবার কোথাও ইস্তিনারা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইবনে সিনার বাবা ছিলেন আফগানিস্তানের বালখের বাসিন্দা। পরে তিনি বুখারায় চলে যান এবং খুরমাইথান নামের একটি গ্রামে কাজ শুরু করেন। ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে যখন ইবনে সিনার বয়স পাঁচ বছর তিনি পরিবারের সঙ্গে বুখারায় স্থায়ী হন এবং সেখানে কর আদায়ের হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

জ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধ একটি পরিবারে ইবনে সিনার বেড়ে ওঠা। তাদের বাড়িতে বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল এবং সামানি শাসক নূহ ইবনে মানসুরের সময় রাজদরবারেও পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। নূহ ইবনে মানসুর খোরাসানের আমির নামে পরিচিত ছিলেন। তবে ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর পর পরিবারের সেই প্রভাব কমে যায়।

২২ বছর বয়সে ইবনে সিনা তার বাবাকে হারান। এতে তার জীবন ও অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। বুখারায় থাকা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে এবং তিনি সেখান থেকে চলে যান। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাকে এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়। কখনো তিনি সম্মান ও মর্যাদা পেয়েছেন, আবার কখনো চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রোগীদের চিকিৎসা করে পাওয়া পারিশ্রমিক দিয়েই তাকে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছে।

ইবনে সিনার ব্যক্তিজীবন

ইবনে সিনা মানুষের সঙ্গ উপভোগ করতেন এবং সুস্বাদু খাবার পছন্দ করতেন। প্রতিদিন পড়াশোনা শেষে রাতে তিনি বাদ্যযন্ত্রীদের ডেকে আনতেন, খাবারের আয়োজন করতেন এবং ছাত্র ও প্রিয়জনদের সঙ্গে রাতের কিছু সময় কাটাতেন। তার কবিতাতেও বোঝা যায়, তিনি প্রচলিত অর্থে সংসারবিমুখ বা কঠোর সাধক ছিলেন না।

তার ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ তাকে ইসলামের প্রতি গভীরভাবে অনুগত মুসলিম মনে করেন, আবার কেউ তাকে অবিশ্বাস ও ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। যারা তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, তাদের জবাবে তিনি বলতেন, আমার মতো একজনকে কাফের বলা সহজ বিষয় নয়। আমার ঈমানের চেয়ে শক্তিশালী ঈমান আর নেই। আমি যদি আমার যুগের একমাত্র মানুষ হয়েও কাফের হই, তাহলে পৃথিবীতে আর কোনো মুসলিম নেই।

ইবনে সিনার পাণ্ডুলিপিতে থাকা ব্যাখ্যামূলক চিত্রগুলো প্রমাণ করে, তিনি একজন দক্ষ চিত্রকরও ছিলেন। পাশাপাশি তিনি সাহিত্যিক, কবি ও সংগীতজ্ঞ ছিলেন এবং বীণা বাজাতে পারতেন। তিনি শুধু সংগীত শুনতেন না, এর তাত্ত্বিক বিষয়ও অধ্যয়ন করেছিলেন। আলী ওয়াজেদ খান তার মুতলাউল উলুম গ্রন্থে ইবনে সিনার নামে তাম্বুর বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করেছেন। আবার কেউ কেউ তাঁকেই বীণা আবিষ্কারের কৃতিত্ব দিয়েছেন।

তৎকালীন জ্ঞানচর্চার প্রধান দুটি ভাষা ফারসি ও আরবিতে দক্ষ ছিলেন তিনি। তার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। 
জীবনের শেষ দিকে ইবনে সিনা তার নিজের জীবনের কিছু অংশের স্মৃতিচারণ করেন। তার দীর্ঘদিনের ছাত্র আবু আবদুল্লাহ আল-জুজজানি তা লিখে রাখেন। জুজজানি ২৫ বছরেরও বেশি সময় তার সঙ্গী ছিলেন।

শিক্ষাজীবন

শৈশব থেকেই জ্ঞান শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহী ছিলেন ইবনে সিনা। অল্প বয়সেই তার অসাধারণ মেধার প্রকাশ ঘটে এবং তিনি সমবয়সীদের ছাড়িয়ে যান। নিজের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের বাবা আমার ও আমার একমাত্র ভাইয়ের জন্য একজন কোরআন শিক্ষক এবং একজন সাহিত্য শিক্ষক নিয়োগ করেছিলেন। আমি ১০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই কোরআন মুখস্থ করে ফেলেছিলাম এবং সাহিত্যের অনেক লেখা শিখেছিলাম। এতে শিক্ষকরা খুবই বিস্মিত হয়েছিলেন।

একবার শিক্ষক তার বাবার সামনে তাকে মুখস্থ জ্ঞান যাচাই করেন। তখন ইবনে সিনা শিক্ষককে বিস্মিত করে এক হাজার পঙক্তির কবিতা এবং জ্ঞানী ও চিকিৎসকদের ২০টি পত্র মুখস্থ বলে শোনান।

শৈশবেই তিনি দ্রুত জ্ঞান আয়ত্ত করতে পারতেন। তাই তার বাবা তার জন্য সেরা শিক্ষকদের ব্যবস্থা করেন। আবু বকর আল-খাওয়ারিজমির কাছ থেকে তিনি ভাষা শেখেন। মুহাম্মদ ইসমাইল আল-জাহিদের কাছে ফিকহ অধ্যয়ন করেন। মাহমুদ আল-মাসাহ নামের একজন মুদি ব্যবসায়ীর কাছে গণিত শেখেন। আল-বায়হাকি তাকে গণিত, বীজগণিত ও জবর-মুকাবিলা বিষয়ে জ্ঞানী বলে বর্ণনা করেছেন।

এরপর আবু আবদুল্লাহ আন-নাতালি নামে এক ব্যক্তি বুখারায় আসেন, যিনি দার্শনিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইবনে সিনা তার কাছে যুক্তিবিদ্যার ইসাগুজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলের আল-মাজেস্তি এবং জ্যামিতির কিতাবুল আনাসিরের প্রাথমিক অংশ পড়েন। পরে তিনি নিজেই বইটির বাকি অংশ আয়ত্ত করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার শিক্ষকের চেয়ে জ্ঞানে এগিয়ে যান। তখন শিক্ষক তার বাবাকে পরামর্শ দেন, যেন তাকে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত না রেখে শুধু জ্ঞানচর্চায় মনোযোগী হতে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার প্রতি ইবনে সিনার আগ্রহ এতটাই প্রবল ছিল যে তিনি নিজে নিজেই বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণা করতেন। তিনি বলেন, জ্ঞানের দরজাগুলো আমার সামনে খুলে যেতে শুরু করল। সে সময়ের নিজের অবস্থা বর্ণনা করে তিনি বলেন, যখনই আমি অল্প সময়ের জন্য ঘুমাতাম, ঘুমের মধ্যেও জেগে থাকা অবস্থায় যেসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করতাম, সেগুলোই স্বপ্নে দেখতাম। এমনকি অনেক সমস্যার সমাধানও স্বপ্নের মধ্যে আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যেত।

এভাবেই নিজের যুগে জ্ঞান, মেধা ও রচনার জন্য ইবনে সিনা পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৮ বছর বয়স না পেরোতেই তাকে ছোট জ্ঞানী নামে অভিহিত করা হয়। ২১ বছর বয়সে তিনি তার যুগের প্রচলিত জ্ঞানগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেন এবং শায়খুর রইস উপাধি লাভ করেন। এরপর গ্রন্থ রচনা তার কাছে অত্যন্ত সহজ ও দ্রুত সম্পন্ন করার মতো কাজে পরিণত হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দর্শনচর্চা

১৫ বছর বয়সের আগেই ইবনে সিনা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৬ বছর বয়সে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন এবং নিজের যুগের অন্যতম খ্যাতিমান চিকিৎসকে পরিণত হন। 

ইতিহাসবিদ ইবনে খাল্লিকান তার সম্পর্কে বলেন, তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান এমনভাবে আয়ত্ত করেছিলেন যে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাচীন ও পরবর্তী চিকিৎসকদের ছাড়িয়ে যান। তিনি ছিলেন তুলনাহীন। 

চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার সময় তিনি কোনো রাত পুরোপুরি ঘুমাননি। কোনো বিষয় তার কাছে জটিল মনে হলে তিনি অজু করে জামে মসজিদে যেতেন, নামাজ পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, যেন বিষয়টি সহজ করে দেওয়া হয় এবং এর জটিলতা তার কাছে খুলে যায়।

ইবনে সিনার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে বুখারার সুলতান তাকে দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য ডেকে পাঠান। তখন তার বয়স মাত্র ১৭ বছর। যে চিকিৎসায় অন্য চিকিৎসকেরা ব্যর্থ হয়েছিলেন, ইবনে সিনা তাতে সফল হন। এরপর সুলতান তাকে নিজের ঘনিষ্ঠ করে নেন এবং রাজকীয় গ্রন্থাগার ব্যবহারের অনুমতি দেন।

ইবনে সিনা বলেন, এই গ্রন্থাগারে প্রবেশ করে মনে হলো, আমি যেন এমন এক বিশাল জগতে প্রবেশ করেছি, যা জ্ঞান ও বিদ্যায় পরিপূর্ণ।

একসময় সেই গ্রন্থাগারে আগুন লেগে যায়। তখন তার বিরোধীরা অভিযোগ করে, ইবনে সিনাই গ্রন্থাগারে আগুন দিয়েছেন, যাতে সেখানে সংরক্ষিত জ্ঞানের একমাত্র অধিকারী তিনি হতে পারেন এবং অন্য কেউ এর জ্ঞান থেকে উপকৃত হতে না পারে।

এরপর চিকিৎসকদের যুবরাজ হিসেবে পরিচিত ইবনে সিনার দর্শনচর্চার যাত্রা শুরু হয়। দর্শনের গভীর বিষয় বুঝতে হলে প্রথমে তাকে প্রকৃতিবিজ্ঞান অধ্যয়ন করতে হয়। তবে অ্যারিস্টটলের মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যা তাকে বেশ সমস্যায় ফেলে। তিনি বইটি ৪০ বার পড়েন, এমনকি এর বিষয়বস্তু তার মুখস্থ হয়ে যায়। তবু তিনি এর প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারেননি। পরে আল-ফারাবির একটি গ্রন্থ পড়ার পর বিষয়টি তার কাছে পরিষ্কার হয়।

পেশাজীবন

শায়খুর রইস ইবনে সিনা কর্মজীবন শুরু করেন বুখারার সুলতান নূহ ইবনে মানসুরের দরবারে লেখক ও চিকিৎসক হিসেবে।

১০০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি খোরেজমের রাজধানী কারকানজে চলে যান। সেখানে শাহ আলী ইবনে মামুনের প্রাসাদে ফকিহ ও জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে বসবাস করেন।

এরপর তিনি জুরজানে যান। সেখানে কারাগারে যাওয়ার আগে স্থানীয় আমিরের কাছে পৌঁছে চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেন এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করেন। সেখানে শিরাজি নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি তার জন্য নিজের বাড়ির পাশে একটি বাড়ি কিনে দেন। সেখানে কিছু সময় তিনি ছাত্রদের পাঠদান করেন।

পরে তিনি তেহরানের কাছাকাছি রাই শহরে যান। তখন নিজের খরচ চালানোর মতো অর্থও তার কাছে ছিল না। তাকে রাজা মাজদুদ্দৌলার দরবারে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর তিনি কাজভিনে চলে যান এবং চিকিৎসাসেবা দিয়ে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করেন।

১০১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি হামাদানে যান। সেখানকার আমির আবু তাহের শামসুদ্দৌলা তাকে রাজদরবারের চিকিৎসক ও প্রধান মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি দিনের সময় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতেন এবং রাত কাটাতেন জ্ঞানচর্চায়। তবে তার মন্ত্রিত্বে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সন্তুষ্ট ছিল না। তারা তাকে আটক করে হত্যার দাবি জানায়। ফলে তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর তাকে আবার মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে আমিরের মৃত্যুর পর তিনি সেই পদ ছেড়ে দেন।

এরপর প্রায় ১৪ বছর তিনি ইসফাহানের আমির আলাউদ্দৌলার অধীনে কাজ করেন। দিনের বেলা তিনি চিকিৎসক ও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে দরবারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। শুক্রবার রাতে শহরের আলেম ও জ্ঞানীদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। আর রাতের বাকি সময় ছাত্রদের সঙ্গে কাটাতেন। আমিরের সামরিক অভিযান ও বিভিন্ন ভ্রমণেও তিনি তার সঙ্গে থাকতেন। এসব ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর কাজ সম্পন্ন করেন।

মৃত্যু

৪২৮ হিজরির রমজান মাসের প্রথম শুক্রবার (১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে) প্রায় ৫৮ বছর বয়সে মারা যান ইবনে সিনা। ইতিহাসবিদ ইবনে আসির তার আল-কামিল গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তিনি ইসফাহানে মারা যান। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, তিনি ইরানের হামাদানে মারা যান এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। সে সময় তিনি হামাদানের আমিরের সঙ্গে সফরে ছিলেন। আবার কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা যান।

ইবনে সিনার মৃত্যুর কারণ ছিল কোলিক রোগ, যা তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্য ও অন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। রোগটির চিকিৎসায় তিনি অতিরিক্ত মাত্রায় ইনজেকশন ও ওষুধ গ্রহণ করতেন। এর ফলে তার অন্ত্রে ক্ষত সৃষ্টি হয়।

তার মৃত্যুর সময় সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি গোসল করেন, তওবা করেন, নিজের কাছে থাকা সম্পদ দরিদ্রদের মধ্যে দান করেন, যাদের প্রতি জুলুম করেছিলেন তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেন, নিজের দাসদের মুক্ত করে দেন এবং প্রতি তিন দিনে একবার পুরো কোরআন খতম করতেন।

এনটি

বিজ্ঞাপন