বিজ্ঞাপন

কোরআনের প্রতি সাহাবিদের যে ভালোবাসা ছিল

কোরআনের প্রতি সাহাবিদের যে ভালোবাসা ছিল

কোরআন তিলাওয়াত ছিল সাহাবায়ে কেরামের জীবনযাপনের অংশ। সাহাবিদের জীবনী ঘাঁটলে দেখা যায়, নামাজে দীর্ঘ তিলাওয়াত এবং অবসর সময়ে কোরআন নিয়ে বসে যাওয়া; এই দুটি ছিল তাদের প্রায় সবার সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

কোরআনের সঙ্গে সাহাবিদের সম্পর্ক কেমন ছিল, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)। নিজের খিলাফতকালে মুসলিম বিশ্বের জন্য কোরআন সংকলনের কাজ তদারকি করেছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্তেও কোরআন আঁকড়ে ছিলেন। শাহাদাতের আগে যখন তার মদিনার বাড়িটি ঘিরে রেখেছিল বিদ্রোহীদের দল। তখনও তিনি বাড়ির ভেতরে বসে ছিলেন কোরআন কোলে নিয়ে, রেখেছিলেন রোজা। বিদ্রোহীরা যখন প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢোকে, তখনও তিনি তিলাওয়াতে মগ্ন। সেই তিলাওয়াত থামেনি মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত। 

নবীজির শিক্ষা ও একটি সতর্কবার্তা

নবীজি (সা.) বলেছেন, কোরআনের একটি হরফ পড়লেও দশ নেকি মেলে। কোরআন তিলাওয়াতকে উম্মতের সর্বোত্তম ইবাদত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। (সুনানে তিরমিজি)। 

হাদিসে কুদসিতে এসেছে, কোরআন পড়ায় ব্যস্ত থাকার কারণে যে বান্দার দোয়া করার সময় হয় না, আল্লাহ তাকে দোয়াকারীর চেয়েও বেশি দেন। সাহাবিরা এসব কথা শুনেছিলেন সরাসরি নবীজির মুখ থেকে, আর সেটাই হয়ে উঠেছিল তাদের অভ্যাসের ভিত্তি। তবে এই আগ্রহে একটা সীমারেখাও ছিল। নবীজি সতর্ক করেছিলেন, তিন দিনের কমে কোরআন খতম করলে মন দিয়ে বোঝা যায় না, শব্দ ফসকে যায় (সুনানে আবু দাউদ, ১৩৯৪)। এই কারণে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার অনুসারীদের বলতেন, সাত দিনে এক খতম করো, তিন দিনের কমে নয়। প্রয়োজন ও সাধ্যের এই হিসাব মাথায় রাখলে বোঝা যায়, সাহাবিদের কাছে সংখ্যা নয়, পাঠের গভীরতাই ছিল আসল বিবেচনা।

এই ভারসাম্য বজায় রাখতে তারা একটি পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। পুরো কোরআনকে ভাগ করা হতো সাতটি মঞ্জিলে; প্রথম দিনে সুরা ফাতিহা থেকে নিসা, দ্বিতীয় দিনে মায়েদা থেকে তওবা, এভাবে সপ্তম দিনে গিয়ে শেষ হতো কাফ থেকে নাস পর্যন্ত (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৩৯৩)।

কোরআন যাদের প্রতিদিনের রুটিন

হজরত ওমর ফারুক (রা.) সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা.) -এর একটা পর্যবেক্ষণ আছে, তিনি যখনই ঘরে ঢুকতেন, প্রথম কাজ ছিল মুসহাফ খুলে বসা। হজরত আবু বকরের (রা.) অভ্যাস ছিল তাহাজ্জুদের নামাজে দীর্ঘ তিলাওয়াত করা। ফাঁকা সময় পেলেই বসে কোরআন পড়া। 

ইফকের ঘটনায় বর্ণিত আছে, হজরত আয়েশা (রা.)  যখন উটে চড়ে ঘরে ফিরছিলেন, তখন বৈঠকখানায় বসে আবু বকর (রা.) কোরআন পড়ছিলেন; এটাই ছিল তার স্বাভাবিক অবস্থা (মুসনাদে আহমাদ)।

আয়েশা (রা.) নিজেও প্রতিদিন নিজের বিছানায় বসে এক মঞ্জিল কোরআন পড়তেন। হজরত আলী (রা.)-এর ব্যাপারে একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি দৈনিক আট খতম কোরআন পড়তেন । (ইকামাতুল হুদা) 

এত ঘন তিলাওয়াতের বর্ণনা ইতিহাসে বিরল, তাই সংখ্যাটিকে যাচাইসাপেক্ষ ধরে নেওয়াই সংগত। তবে ইবাদত ও আধ্যাত্মিক সাধনায় আলী (রা.) যে সাহাবিদের মধ্যে আলাদা এক অবস্থানে ছিলেন, সে বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে দ্বিমত নেই।

নবীজির কাছে যার তিলাওয়াত সবচেয়ে প্রিয় ছিল

নবীজি একদিন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে বললেন, আমাকে কোরআন পড়ে শোনাও। ইবনে মাসউদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সামনেই তো কুরআন নাজিল হয়, আমি আপনাকে শোনাব? নবীজি বললেন, আমি অন্যের মুখে শুনতে ভালোবাসি। ইবনে মাসউদ (রা.) সুরা নিসা তিলাওয়াত শুরু করলেন। যখন তিনি ৪১ নম্বর আয়াতে পৌঁছালেন, যেখানে কিয়ামতের দিন প্রতিটি উম্মত থেকে সাক্ষী তলব করার কথা বলা হয়েছে; তখন নবীজির চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন, যথেষ্ট, থামো। (সহিহ বুখারি, ৫০৫০)।

নবীজি নিজে বলেছেন, কোরআন যেভাবে নাজিল হয়েছে, সেভাবে সুন্দর করে পড়ে আনন্দ পেতে চাইলে ইবনে মাসউদ(রা.)-এর মতো করে পড়া উচিত। অন্য একটি হাদিসে তিনি চারজন সাহাবির নাম বলে দিয়েছিলেন, যাদের কাছ থেকে কোরআন শেখা উচিত; আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম (আবু হুজাইফা রা.-এর আজাদকৃত গোলাম), মুয়াজ ইবনে জাবাল ও উবাই ইবনে কাব রা. (সহিহ বুখারি, ৩৭৫৮)। 

হজরত ওমর (রা.) নিজেও স্বীকার করেছেন, তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে উবাই (রা.) তাদের মধ্যে সেরা ছিলেন। (সহিহ বুখারি, ৪১২৯)। নবীজির জীবদ্দশাতেই উবাই রা. পুরো কোরআন হিফজ করে ফেলেছিলেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) -এর একটি ঘটনাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। নবীজি (সা.) খেয়াল করলেন, এই তরুণ সাহাবি ইবাদতে এমনভাবে ডুবে থাকেন যে সংসারের দিকে তাকানোর সময়ও পান না। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিয়মিত আমল কী? তিনি বললেন, দিনে রোজা রাখি, রাতে এক খতম কোরআন পড়ি। নবীজি বললেন, একটু কমাও। তিনি আরজ করলেন, আমি আরও বেশি করার সামর্থ্য রাখি। শেষ পর্যন্ত নবীজি (সা.) সাত দিনে এক খতমের কথা বললেন, তার কমে নয় (সহিহ বুখারি, ৫০৫২)।

হজরত কায়েস ইবনে আবি সাসাআ (রা.)-এর ঘটনাটিও একই ধরনের। নবীজি (সা.)-কে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কত দিনে কোরআন খতম করব? নবীজি (সা.) বললেন, ১৫ দিনে। তিনি বললেন, আমি আরও বেশি পড়ার সামর্থ্য রাখি। শেষে সাত দিনে রফা হলো। বার্ধক্যে যখন সাত দিনে খতম করা আর সম্ভব হচ্ছিল না, তখন তিনি পনেরো দিনে ফিরে গেলেন এবং বলতেন, নবীজির প্রথম প্রস্তাবটাই যদি মেনে নিতাম। (মুজামুল কাবির, ১৮/৩৪৪-৪৫)।

সাহাবিদের জীবন থেকে শিক্ষা

ওপরের বর্ণনাসমূহ থেকে অবগত হওয়া যায়, সাহাবিদের জীবনে যুদ্ধ; শাসনকাজ, পরিবার, জীবিকা, সবকিছুই ছিল। তবু কোরআনের জন্য সময় বের করা ছিল তাদের জীবনযাপনের স্বাভাবিক অংশ। সাহাবিদের যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই সম্পর্কটাই বহু প্রজন্মের মানুষকে কোরআনের কাছে ফিরিয়ে এনেছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করার তাওফিক দান করুন।