বিজ্ঞাপন

হাফসা বিনতে শিরিন

হাদিস ও ফিকহ চর্চায় নিজের সময়ের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন যে নারী

হাদিস ও ফিকহ চর্চায় নিজের সময়ের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন যে নারী

হিজরি প্রথম শতকের শুরুর দিকের ঘটনা। আনুমানিক ১২ হিজরিতে ইসলামের বীর সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) তখন তীরের মতো দ্রুতগতিতে ইরাক বিজয়ের অভিযানে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে থামানোর যেন কেউ ছিল না। কুফার কাছাকাছি দক্ষিণ ইরাকে অভিযান চালানোর সময় তিনি আইনুত তামর নামের একটি অঞ্চলে পৌঁছান। সেখানে পারস্যের সেনা ও মিত্রদের পরাজিত করে ওই এলাকার দুর্গ অবরোধ করেন। দুর্গের লোকজন আত্মসমর্পণ করলে সেখান থেকে ৪০ জন কিশোরকে বন্দি করা হয়। পরে তাদের মদিনা মুনাওয়ারায় নিয়ে যাওয়া হয়।

মদিনায় তৎকালীন রীতি অনুযায়ী খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও গনিমতের মাল মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করেন। আইনুত তামরের ওই কিশোরদের একজনের নাম ছিল সিরিন। তিনি বিশিষ্ট সাহাবি, মহানবী (সা.)-এর বিখ্যাত খাদেম ও হাদিস বর্ণনাকারী আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর সাহচর্য লাভ করেন। সময়ের পরিক্রমায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সিরিনকে আজাদ করে দেন আনাস (রা.)। পরে তিনি তাকে সাফিয়া নামের এক তরুণীর সঙ্গে বিয়ে দেন। আবু বকর সিদ্দিক (রা.)ও ওই নারীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন।

সিরিন ও সাফিয়া তাকওয়া, ইবাদত ও পরহেজগারির পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। মদিনা মুনাওয়ারায় সাহাবিদের সান্নিধ্যে থাকার পর তারা ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বসরায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। হিজরি প্রথম শতকের প্রথমার্ধে তাদের ঘরে জন্ম নেয় একাধিক ছেলে-মেয়ে। তাদের সন্তানদের মধ্যে অনেকেই হাদিস, তাফসির, ফিকহ, স্বপ্নের ব্যাখ্যা, কিরাআতসহ বিভিন্ন ইসলামী জ্ঞানে খ্যাতি অর্জন করেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে সিরিন।

তবে মুহাম্মদ ইবনে সিরিনের এক বোন ছিলেন, যিনি জ্ঞান, ইবাদত, পরহেজগারিতে বসরা ও আশপাশের অঞ্চলে খ্যাতির দিক থেকে ভাইয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না। তিনি ছিলেন হাফসা বিনতে সিরিন। হিজরি প্রথম শতকে মৃত্যুবরণ করলেও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে এখনো তার নাম উজ্জ্বল। 

কে ছিলেন হাফসা বিনতে সিরিন?

এই পুণ্যময় পরিবারে বেড়ে ওঠেন হাফসা বিনতে সিরিন। তিনি ছিলেন সিরিন ও সাফিয়ার সন্তানদের মধ্যে সবার বড়। সাফিয়ার সন্তানরা হলেন মুহাম্মদ, ইয়াহইয়া, হাফসা, কারিমা ও উম্মে সুলাইম।

নিজের মা এবং বিখ্যাত তাবেয়ি ভাই মুহাম্মদ ইবনে সিরিনের পারিবারিক পরিবেশ সম্পর্কে হাফসা বলেন, তার মা ছিলেন হিজাজের নারী। রং করা কাপড় তার পছন্দ ছিল। মুহাম্মদ যখন মায়ের জন্য কোনো কাপড় কিনতেন, তখন সবচেয়ে নরম কাপড়টিই কিনতেন। কাপড়টি কতদিন টিকবে, সেদিকে তিনি তাকাতেন না। প্রত্যেক ঈদে তিনি মায়ের কাপড় রং করে দিতেন।

হাফসা আরও বলেন, আমি কখনো তাকে মায়ের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখিনি। তিনি মায়ের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতেন, যেন মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছেন। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি যখন মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন, তখন এমন মনে হতো যেন তিনি অসুস্থ। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি তাকে এভাবে দেখলে ভাবতো,  লোকটি হয়তো অসুস্থ।

এই পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন হাফসা। ছোটবেলা থেকেই জ্ঞান অর্জন ও শেখার প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। জীবিত সাহাবিদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনে বেশ আগ্রহী ছিলেন তিনি। তার শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.)। তিনিই তার বাবা সিরিনকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন। তার প্রতি ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতার কারণে সিরিন আনাস (রা.)-এর সঙ্গে বসরায় চলে এসেছিলেন।

সাহাবি উম্মে আতিয়া আনসারিয়া (রা.)-এর কাছ থেকেও ইলম ও হাদিস শিখেছিলেন তিনি। উম্মে আতিয়া আনসারিয়া (রা.) মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধ ও অভিযানে অংশ নিয়েছেন। এসব অভিযানে তিনি চিকিৎসা ও আহতদের সেবার দায়িত্ব পালন করতেন।

উম্মে আতিয়ার কাছ থেকে হাফসা বেশ কিছু হাদিস বর্ণনা করেছেন। বসরায় বসবাসকারী সাহাবি সালমান ইবনে আমির আদ-দাব্বির কাছ থেকেও হাদিস বর্ণনা করেছেন হাফসা।

তার নিষ্ঠা ও উত্তম চরিত্রের কারণে বসরায় বসবাসকারী মহানবী (সা.)-এর দুই সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) ও আবু আলিয়া তার স্বামীর বাড়িতে তার খোঁজখবর নিতে যেতেন। 

প্রসিদ্ধ হাদিসবিদ, মুফাসসির ও ইতিহাসবিদ ইবনে কাসির তার আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে উল্লেখ করেন, উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর সবচেয়ে জ্ঞানী ও দক্ষ ছাত্রীদের একজন ছিলেন হাফসা বিনতে সিরিন। তিনি বলেন, তার ছাত্রীদের মধ্যে আমরাহ বিনতে আবদুর রহমান, হাফসা বিনতে সিরিন ও আয়েশা বিনতে তালহা—এই নারীদের চেয়ে জ্ঞানী আর কেউ ছিলেন না।

জ্ঞানচর্চায় হাফসা এমন উচ্চ মর্যাদা অর্জন করেছিলেন যে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আলেম ও তাবেয়িদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। তিনি বর্ণনা করেন, মুররিক ইবনে মুশমারিজ আল-আজলি তার কাছে আসতেন। তিনি হাদিসের একজন বিশিষ্ট আলেম, নির্ভরযোগ্য এবং শিষ্টাচার ও সহনশীলতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি হাফসার স্বামীর উপস্থিতিতে জ্ঞানচর্চা ও আলোচনা করতে আসতেন।

হাফসা বলেন, মুররিক আমাদের কাছে আসতেন। একদিন তিনি এলেন। আমাকে সালাম দিলেন, আমিও তার সালামের জবাব দিলাম। এরপর তিনি আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমিও তাকে প্রশ্ন করলাম।

প্রসিদ্ধ আলেম ও হাদিসবিশারদ ইমাম জাহাবি হাফসাকে ফকিহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ হাদিস ও ফিকহ—দুই শাস্ত্রেই তিনি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

এর প্রমাণ পাওয়া যায় তার ভাই প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও স্বপ্ন ব্যাখ্যাকার মুহাম্মদ ইবনে সিরিনের বক্তব্যেও। তিনি ছিলেন তাবেয়িদের অন্যতম বড় আলেম। কোরআনের কোনো আয়াত নিয়ে তার কাছে কিছু জটিল মনে হলে তিনি বলতেন, তোমরা হাফসার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো, তিনি কীভাবে আয়াতটি পড়েন।

সিরিনের পরিবারে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট তাবেয়ি, মুহাদ্দিস ও নির্ভরযোগ্য আলেম ছিলেন। তারা সবাই ছিলেন পরস্পরের ভাই-বোন।

নিজের সন্তান, ছাত্র ও ছাত্রীদের হাদিস, ফিকহ, নৈতিকতা ও শিষ্টাচারসহ বিভিন্ন ইসলামী জ্ঞান শেখার ব্যাপারে হাফসা বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন তার ছেলে হুজাইল ইবনে আবদুর রহমান আল-বসরী। তার জীবন নিয়ে লেখা ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থগুলোতে প্রায় সবখানেই তার মা হাফসার সঙ্গে তার সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো গ্রন্থে তার পরিচয় দেওয়া হয়েছে হুজাইল ইবনে আবদুর রহমান ইবনে হাফসা বিনতে সিরিন হিসেবে। কারণ তার জ্ঞানী, সাধিকা ও পরহেজগার মায়ের খ্যাতি ছিল ব্যাপক।

হাফসার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তাবেয়ি আয়েশা বিনতে সাদ আস-সাদিয়া আল-বসরিয়াও। তিনি বসরার একজন নির্ভরযোগ্য নারী ছিলেন। বসরার বিশিষ্ট তাবেয়ি হাসান বসরি এবং তার শিক্ষিকা হাফসা বিনতে সিরিনসহ একাধিক বড় তাবেয়ির কাছ থেকে তিনি জ্ঞান ও হাদিস বর্ণনা করেছেন। খতিব বাগদাদি তার আল-মুত্তাফিক ওয়াল-মুফতারিক গ্রন্থে এ তথ্য উল্লেখ করেছেন।

বসরার কাজি এবং হিজরি প্রথম শতকের শেষভাগের প্রসিদ্ধ তাবেয়িদের একজন ইয়াস ইবনে মুআবিয়া আল-মুজানি ছিলেন হাফসার অন্যতম ছাত্র। হাফসা ছিলেন তার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষিকা। অন্য কারও চেয়ে তাকে তিনি বেশি প্রাধান্য দিতেন। এমনকি তার ভাই মুহাম্মদ ইবনে সিরিন কিংবা হাসান বসরিকেও নয়, যদিও তারা হাফসার চেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন।

ইয়াস বলেন, আমি যতজনকে পেয়েছি, তাদের মধ্যে হাফসার চেয়ে কাউকে বেশি মর্যাদা দিইনি। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, হাসান বসরি এবং ইবনে সিরিনকেও নয়? তিনি বললেন, আমি তাদের কাউকেই তার ওপর প্রাধান্য দিই না।

তিনি আরও বলেন, হাফসা ১২ বছর বয়সে কোরআন হিফজ ও তিলাওয়াত সম্পন্ন করেছিলেন এবং ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

হাফসা ঘরের কাজে সহযোগিতার জন্য একজন দাসী কিনেছিলেন। একদিন কেউ সেই দাসীর কাছে তার মনিব হাফসা কেমন, তা জানতে চাইল। দাসী বলল, তিনি খুব ভালো। তবে তিনি একটি বড় গুনাহ করেছেন। কারণ তিনি সারা রাত কাঁদেন ও নামাজ পড়েন।

দাসী মনে করেছিল, হাফসার রাতভর কান্না ও নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের কারণ নিশ্চয়ই তিনি কোনো বড় গুনাহ করেছেন। সে বুঝতে পারেনি, আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রতি তার মনিবের গভীর ভালোবাসাই তাকে এভাবে ইবাদতে নিমগ্ন রাখত।

তার উত্তম চরিত্র, পরহেজগারি ও জ্ঞানের কারণে বহু আলেম ও ইতিহাসবিদ তার প্রশংসা করেছেন। 

জীবনের শেষ ইচ্ছাগুলোর একটি ছিল শহীদের মর্যাদা নিয়ে মৃত্যুবরণ করা। সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করতেন, তুমি কীভাবে মৃত্যুবরণ করতে চাও? তিনি বলতেন, প্লেগে আক্রান্ত হয়ে। কারণ এটি প্রত্যেক মুসলমানের জন্য শাহাদাত।

হাফসার জন্য একটি কাফনের কাপড়ও প্রস্তুত রাখা ছিল। তিনি যখন হজে যেতেন ও ইহরাম বাঁধতেন, তখন সেটি পরতেন। আবার রমজানের শেষ দশক এলে সেটি পরতেন এবং ওই রাতগুলোতে ইবাদতে কাটাতেন।

৭০ বছর বয়সে, আবার কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন হাফসা বিনতে সিরিন। তার জানাজায় বসরার তৎকালীন বড় বড় তাবেয়ি ও ইসলামের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন হাসান বসরি ও মুহাম্মদ ইবনে সিরিন।

এনটি

বিজ্ঞাপন