ভারতের দেওবন্দ শহরে অবস্থিত দারুল উলুম দেওবন্দ ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই দেওবন্দি ইসলামী আন্দোলনের সূচনা। এই প্রতিষ্ঠানের আদলে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
১৮৬৬ সালের ৩১ মে, বৃহস্পতিবার (১৫ মহররম ১২৮৩হিজরি) ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় বিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ। অত্যন্ত সাধারণ ও অনাড়ম্বর পরিবেশে যাত্রা শুরু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠাকালের অনাড়ম্বর যাত্রা দেখে ধারণা করা কঠিন ছিল যে, এই মাদরাসা কয়েক বছরের মধ্যে এশিয়ার ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে।
উনিশ শতকে ব্রিটিশরা শুধু ভারতীয় উপহমাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোই বদলে দেয়নি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেও আমূল ধ্বংস করে নিজেদের আদলে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের আলেমরা ধর্ম ও শরিয়ত রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে যে ভূমিকা রাখেন, তারই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ।
ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল ভারত ও এর অধিবাসীদের সবদিক থেকে নিজেদের রঙে রাঙিয়ে তোলা এবং পুরোপুরি নিজেদের অনুগত করে নেওয়া।
এমন সময়ে আলেম ও শরিয়তের বিধিবিধান সম্পর্কে পারদর্শী মুফতিরা যখন পুরোনো ব্যবস্থার এই বিপর্যয় দেখলেন, তখন তারা ভাবলেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থা রক্ষা করতে না পারলেও অন্তত নিজেদের ধর্ম ও শরিয়তকে রক্ষা করতে হবে। এ চিন্তা থেকেই ১৮৬৬ সালের ৩০ মে দেওবন্দ শহরের ছাত্তেওয়ালি মসজিদে একটি ডালিমগাছের নিচে একজন শিক্ষক ও একজন ছাত্রকে নিয়ে এই মহৎ উদ্যোগের সূচনা হয়।
শিক্ষক ছিলেন মোল্লা মাহমুদ, আর ছাত্র ছিলেন মাহমুদ হাসান। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠানই ভারতের আজহার হিসেবে দারুল উলুম দেওবন্দ নামে পরিচিতি পায়। এর প্রথম ছাত্র মাহমুদ হাসানই ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান নামে পরিচিত হন।
এই শায়খুল হিন্দই ছিলেন রেশমি রুমাল আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতকে স্বাধীন করার জন্য তিনি বহুমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবং হজরত মাওলানা ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কির খলিফা ও উত্তরসূরিও ছিলেন।
ভারতের স্বাধীনাত সংগ্রামে অবদান
ভারতকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে তিনি তুর্কিদের সঙ্গে সহযোগিতারও চেষ্টা করেন। এ কারণে ব্রিটিশরা তাকে ও তার ছাত্র ও সহযোগী শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানিকে বেশ কয়েক বছর মাল্টায় বন্দি করে রাখে। প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার পর অনেক কষ্টে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
শায়খুল হিন্দের বড় একটি কৃতিত্ব হলো, ১৯২০ সালের ২৯ অক্টোবর মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় তিনি দেওবন্দ থেকে আলিগড়ে যান এবং সেখানে জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার ভিত্তি স্থাপন করেন। শায়খুল হিন্দের দোয়া, মহাত্মা গান্ধীর আশীর্বাদ, রইসুল আহরার মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহরের আন্তরিকতা, হাকিম আজমল খান ও ডা. মুখতার আহমদের আত্মত্যাগ এবং এ এম খাজা ও ডা. জাকির হুসাইনের ত্যাগের ফলেই জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়।
দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা শুধু একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ঘটনা ছিল না। এর প্রতিষ্ঠাতা হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতভী ও ইমামুর রব্বানি মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি শুধু ইট-পাথর দিয়ে কোনো জ্ঞানভুবন গড়ে তোলেননি; বরং এই মাদরাসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি তরুণের হৃদয় ও মস্তিষ্কে এমন এক চেতনা গেঁথে দিয়েছিলেন যে, এই প্রতিষ্ঠানকে শুধু ধর্ম ও শরিয়তের রক্ষক হিসেবে এগিয়ে নিলেই হবে না; বরং নতুন চিন্তা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা ও কাজ করার যে প্রবহমান ধারা, তাকে এমন শক্তিতে রূপ দিতে হবে, যাতে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা ও পরাধীনতার চিন্তাধারা নিজেদের অস্তিত্ব হারায়।
ভারতে এই চিন্তার ফলেই অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রাম থেকে গ্রাম, জনপদ থেকে জনপদ, শহর থেকে শহরে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এমন এক প্রাণবন্ত ধারা ছড়িয়ে পড়তে থাকে, পরবর্তী সময়ে দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা লখনউ, মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর, মাদরাসাতুল ইসলাহ সারায়ি মীর, জামিয়া আশরাফিয়া মুবারকপুর, বাকিয়াতুস সালেহাত ভেলোর, মাদরাসা আমিনিয়া দিল্লি ও মাদরাসা ফতেহপুরি দিল্লি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাব্যবস্থা
দারুল উলুম দেওবন্দ ও এই ধারার মাদরাসাগুলোতে শিশুদের জন্য প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায় পাঁচ বছর এবং মাধ্যমিক পর্যায় চার বছর। এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের তালেব বলা হয়। এখানে তাফসির, কোরআনের অনুবাদ, আরবি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস এবং ভূগোল পড়ানো হয়।
এরপর রয়েছে চার বছর মেয়াদি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়। এ পর্যায়ে আকিদা, কোরআনের অনুবাদ, তাফসির, আরবি সাহিত্য এবং উসুলে হাদিস পড়ানো হয়। এরপর আসে উচ্চতর শিক্ষা বা বিশেষায়নের পর্যায়। এ পর্যায়ে শিক্ষার্থী ফিকহ ও ফতোয়া, হাদিস, আরবি ভাষা, তাফসিরসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এই পর্যায় সম্পন্নকারীদের আলেম বা মাওলানা বলা হয়।
বিশেষায়নের ভিত্তিতে তাদের উপাধিও ভিন্ন হয়। ফতোয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞকে মুফতি, তাফসিরে বিশেষজ্ঞকে মুফাসসির এবং হাদিসে বিশেষজ্ঞকে শায়খুল হাদিস বলা হয়।
বিনামূল্যে পাঠদান
এসব মাদরাসা ও তাদের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। শিক্ষার্থীদের আবাসন, খাবার, এমনকি বই ও প্রয়োজনীয় লেখাপড়ার সামগ্রীও বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠান কোনো সরকারি আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করে না; বরং পুরোপুরি অনুদানের ওপর পরিচালিত হয়। ফলে এগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে।
এনটি
