বিজ্ঞাপন

মহানবীর (সা.) প্রতি দরুদ পাঠের ৫ উপকারিতা

মহানবীর (সা.) প্রতি দরুদ পাঠের ৫ উপকারিতা

মহানবীর (সা.) প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম একটি মাধ্যম দরুদ পাঠ। মহানবী (সা.) নিজেই আমাদেরকে দরুদ পাঠ করতে ও দরুদ পাঠের পদ্ধতিশিখিয়েছেন।

এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার প্রতি কীভাবে সালাম জানাতে হয় আমরা তা জানি। কিন্তু কীভাবে আপনার প্রতি সালাত বা দরুদ পাঠ করব? তখন তিনি তাদের দরুদে ইবরাহিম শিক্ষা দেন।

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আালি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিমা,ওয়া আলা আালি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আালি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা, ওয়া আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।

অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইবরাহিম ও ইবরাহিমের পরিবারবর্গের প্রতি রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি বরকত দান করুন, যেমন আপনি ইবরাহিম ও ইবরাহিমের পরিবারবর্গের প্রতি বরকত দান করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। (সহিহ বুখারি)

আরবি একটি প্রবাদে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো কিছুকে ভালোবাসে, সে তাকে বেশি বেশি স্মরণ করে।

মহানবীর (সা.) প্রতি দরুদ পাঠের পাঁচটি উপকারিতা নিচে তুলে ধরা হলো: 

১. অধিক সওয়াব 

নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন। (সহিহ মুসলিম)

দরুদ পাঠের মাধ্যমে যে অধিক সওয়াব লাভ হয়, এই হাদিসে মহানবী (সা.) সেই কথা তুলে ধরেছেন। 

ইমাম নাসায়ির আরেক বর্ণনায় এসেছে, দরুদ পাঠের সওয়াব শুধু দশগুণ রহমত লাভের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয় এবং আল্লাহর কাছে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ দরুদ পাঠ মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

আরেক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন, তার দশটি গুনাহ মুছে দেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করেন। (সুনানে নাসায়ি)

২. দুনিয়া ও আখিরাতে নবীজির নৈকট্য লাভ

মহানবী (সা.)-কে ভালোবাসার অর্থ হলো দুনিয়ায় আত্মিকভাবে এবং আল্লাহর ইচ্ছায় আখিরাতে শারীরিকভাবে তার নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষা।

এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার প্রতি সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে। (সুনানে তিরমিজি)

মহানবীর (সা.) জীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, তিনি আমাদের জন্য অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। নিজের চেয়ে উম্মতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের প্রতি তার নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে।

যদিও আমাদের চোখ কখনো প্রিয় নবী (সা.)-কে দেখেনি, তবু আমাদের হৃদয় তার নৈকট্য কামনা করে। তাই বেশি বেশি দরুদ পাঠ মহানবীর (সা.) প্রতি আমাদের ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়। আর ভালোবাসার মাধ্যমে হৃদয়ের সঙ্গে প্রিয় নবীর আত্মিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়।

৩. অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দূর হয়

জীবনের বিভিন্ন বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে চলতে গিয়ে মানুষ কখনো উন্নতি, কখনো সংকোচন, কখনো ভারসাম্য আবার কখনো ভারসাম্যহীনতার মধ্য দিয়ে যায়। মহানবীর (সা.) বলেছেন, নিয়মিত দরুদ ও আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়াবি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে পারে। উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে—

তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করি। আমার দোয়ার কতটুকু অংশ আপনার প্রতি দরুদের জন্য নির্ধারণ করব? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করতে পার।

আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করতে পার। তবে যদি বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, অর্ধেক? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করতে পার। তবে যদি বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, দুই-তৃতীয়াংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করতে পার। তবে যদি বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, আমি যদি আমার সব দোয়া আপনার প্রতি দরুদ পাঠে ব্যয় করি? তিনি বললেন, তাহলে তোমার দুশ্চিন্তা দূর করে দেওয়া হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (সুনানে তিরমিজি)

হৃদয় যখন নিয়মিত জিকির বা আল্লাহর স্মরণে থাকে, তখন অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিজের ভেতর স্থিরতা তৈরি করা সহজ হয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়া ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। হৃদয় ও মন যখন স্থির থাকে, তখন মানুষ নিজের চিন্তাগুলোকে গুছিয়ে নিতে পারে এবং বিষয়গুলোকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ পায়।

৪. দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়ে

মহানবীর (সা.) সাহাবি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে আটকে থাকে। নবীর প্রতি দরুদ পাঠ না করা পর্যন্ত এর কোনো অংশ ওপরে ওঠে না। (সুনানে তিরমিজি)

নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আমাদের সব দোয়া শোনেন এবং অন্তরের গভীরতম কথাও জানেন। তবে কিছু বিষয় আমাদের দোয়া কবুলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেমন হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া কিংবা আন্তরিকতাহীনভাবে দোয়া করা। নবীজির (সা.) প্রতি দরুদ পাঠ দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

দরুদ পাঠের মাধ্যমে আমরা যেমন নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করি, তেমনি একই সঙ্গে আল্লাহর ভালোবাসাও অর্জনের চেষ্টা করি। দরুদ পাঠের মাধ্যমে আমরা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মেনে তার নৈকট্য লাভেরও চেষ্টা করি।

নবীজি (সা.) নিজেই আমাদের দোয়া করার একটি পদ্ধতি শিখিয়েছেন। এক হাদিসে তিনি বলেছেন— তোমাদের কেউ যখন দোয়া করবে, সে যেন প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করে। এরপর নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করে। তারপর সে যা ইচ্ছা দোয়া করবে। (সুনানে তিরমিজি)

৫. হৃদয় পরিশুদ্ধ হয়

মানুষের হৃদয় তার নিজের প্রতিচ্ছবি। হৃদয় পবিত্র হলে তার সৌন্দর্য স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আচরণে প্রকাশ পায় এবং তখন চারপাশের সৌন্দর্যও তার চোখে ধরা পড়ে।

জীবনের পথচলায় হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। আর হৃদয় পরিশুদ্ধ করার অন্যতম মাধ্যম হলো নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা এবং তার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।

নবীজির (সা.) প্রতি দরুদ পাঠ একটি ইবাদত। আর আল্লাহ তায়ালা ও তার প্রিয় নবী মুহাম্মদ(সা.) যে ইবাদতে সন্তুষ্ট হন, তা মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে।

বর্তমান সময়ে আমরা বিভিন্ন ব্যস্ততায় নিজেদের জড়িয়ে ফেললেও নবীজির (সা.) সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার কোনো সুযোগই আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়। নিঃসন্দেহে নবীজি (সা.), তার আদর্শ ও শিক্ষা সবসময় আমাদের সঙ্গে রয়েছে।

এনটি