হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর শাসনকাল থেকে শুরু হয় ইসলামের বিজয় অভিযান। একের পর এক জনপদে উড়তে থাকে ইসলামের বিজয়ের পতাকা। আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পেরিয়ে সেই অভিযাত্রা পৌঁছে যায় শাম ও রোমান সাম্রাজ্যের ভূখণ্ডে। ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা। সেই উত্তাল সময়েরই এক বিস্ময়কর অধ্যায়—ইয়ারমুকের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ শুধু দুই বাহিনীর সংঘর্ষ ছিল না; এর পরিণতিতে বদলে যায় শামের ইতিহাস।
শামের পরিস্থিতি ও রোমান সাম্রাজ্যের উদ্বেগ
শামের একের পর এক অঞ্চল যখন মুসলমানদের বিজয়ের আওতায় আসতে শুরু করল, তখনই ইতিহাসের মঞ্চে তৈরি হলো এক নাটকীয় মোড়। আজকের সিরিয়া, জর্ডান, ফিলিস্তিন ও আশপাশের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত শাম তখন রোমান সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাহাবিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে এগিয়ে এসে একের পর এক জনপদ অতিক্রম করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা বিজয় করে দামেস্ক। এরপর পতন ঘটে সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিমসেরও।
দামেস্ক ও হিমসের পতনের সংবাদ রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের জন্য ছিল গভীর উদ্বেগের। শামের এই ধারাবাহিক পতন শুধু সীমান্তের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; রোমান সাম্রাজ্যের শাম-অধিকারই তখন প্রশ্নের মুখে। ফিলিস্তিনের বাইতুল মুকাদ্দাস ও কায়সারিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতিও হেরাক্লিয়াসকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করে। শেষ পর্যন্ত তিনি শাম পুনর্দখলের জন্য এক বিশাল বাহিনী সমাবেশের উদ্যোগ নেন।
রোমান সাম্রাজ্যের অধীন বিভিন্ন অঞ্চল ও মিত্রশক্তির কাছেও বার্তা পাঠানো হয়। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সৈন্য এসে এই বিশাল সমাবেশে যোগ দেয়। মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় রোমান বাহিনীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়—কোথাও এক লাখের কাছাকাছি, কোথাও দুই লাখ বা তারও বেশি।
মুসলিম বাহিনীর কৌশল ও রণপ্রস্তুতি
মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন হজরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)। তার কাছে রোমানদের বিশাল সমাবেশের সংবাদ পৌঁছালে তিনি শামের বিভিন্ন ফ্রন্টে অবস্থানরত মুসলিম সেনাপতিদের নিয়ে পরামর্শে বসেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত হয়—বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বিশাল রোমান বাহিনীর মোকাবিলা করা ঠিক হবে না। বরং বিভিন্ন ফ্রন্টের মুসলিম বাহিনী একত্রিত হয়ে একটি কেন্দ্রীভূত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। মুসলিম বাহিনী হিমসসহ কিছু অবস্থান থেকে সরে এসে জাবিয়ার দিকে সমবেত হয় এবং পরে আরও উপযুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রের সন্ধানে ইয়ারমুকের দিকে অগ্রসর হয়। এই সমাবেশ ও স্থান নির্বাচনে হজরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)-এর পরামর্শ বিশেষ গুরুত্ব পায়।
সব মিলিয়ে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩৬ হাজারে। বিপুল রোমান সমরসমাবেশের তুলনায় এ ছিল অতি ক্ষুদ্র এক বাহিনী। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় কখনো কখনো সংখ্যার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সাহস। ইয়ারমুকের সেই ক্ষুদ্র বাহিনীই শেষ পর্যন্ত বিশাল প্রতিপক্ষের বুক চিরে ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়ের মালা।
অবশেষে মুসলিম বাহিনী ইয়ারমুক নদীর তীরবর্তী প্রান্তরে শিবির স্থাপন করে। সামনে বিপুল রোমান সমরসমাবেশ, পেছনে শামের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড।
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল
যুদ্ধের শুরুতে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং যুদ্ধ নিশ্চিত হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ইয়ারমুকের প্রান্তরে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। শুরু হয় লড়াই। প্রতিটি লড়াইয়ে মুসলিম যোদ্ধাগণ প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। এরপর শুরু হয় প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী লড়াই।
একটানা কয়েক দিন প্রচণ্ড লড়াই চলার পর ষষ্ঠ দিনে রোমান বাহিনীর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। তারা পালিয়ে যেতে শুরু করে। ষষ্ঠ দিনের সূর্যাস্তের পূর্বে মুসলিম বাহিনীর পদচুম্বন করে বিজয়।
পরদিন সকালে হজরত খালিদ (রা.) একদল অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে দামেস্কের পথ ধরে পলায়নরত রোমান সেনাপতি বাহানের খোজে অগ্রসর হন এবং নাগাল পেয়ে তাকে হত্যা করেন।
ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম যোদ্ধা শহীদ হন। অপরদিকে রোমান বাহিনীর ৭০ হাজার, মতান্তরে এক লাখ বিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়। ইয়ারমুকে পরাজয়ের ফলে শামে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা ঘটে এবং নতুন ইতিহাসের সূচনা হয়।
ইয়ারমুকে পরাজয়ের পর সম্রাট হিরাক্লিয়াস ভগ্নহৃদয়ে আনাতোলিয়া ত্যাগ করে কনস্টান্টিনোপলের পথে চলে যান। শাম ত্যাগ করার সময় তিনি বলছিলেন, ‘বিদায় হে শাম, বিদায় চিরকালের জন্য। আর কখনো ফিরে আসব না তোমার বুকে। হায়, সবুজ-শ্যামল, উর্বর, কল্যাণে ভরপুর এক ভূখণ্ড শত্রুর হাতে ছেড়ে যাচ্ছি।’
মুসলমানদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধের গল্প শেষ হয়নি। এ যুদ্ধের ফলাফল বয়ে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। শামের মাটিতে সেদিনের বিজয় বদলে দিয়েছিল এ অঞ্চলের ইতিহাস, রাজনীতি ও সভ্যতার গতিপথ। ইয়ারমুকের যুদ্ধ তাই শুধু অতীতের একটি যুদ্ধ নয়, এই যুদ্ধ ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় যার প্রভাব ফিরে আসে হাজার বছর পরও।
