বিজ্ঞাপন

ইসলামের প্রথম সামরিক অভিযানের সূচনা যেভাবে

ইসলামের প্রথম সামরিক অভিযানের সূচনা যেভাবে

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর কিছুটা স্থির হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমেই নতুন সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেন। এই সমাজই পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। এসব ভিত্তির মধ্যে ছিল মসজিদ নির্মাণ, মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মদিনার ইহুদিদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন। ওই চুক্তিতে প্রত্যেক পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এরপর নবগঠিত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সীমান্ত সুরক্ষার জন্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুরু করেন নবীজি (সা.)। তিনি বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট সামরিক দল ও অভিযান পাঠাতে থাকেন। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার গতিবিধি মোকাবিলা করা। কারণ কুরাইশরা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল।

মদিনার আশপাশের গোত্রগুলোর সঙ্গে শান্তিচুক্তি, সাহাবিদের নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং শারীরিক ও সামরিকভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করাও এসব অভিযানের উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল। ইসলামে যুদ্ধের অনুমতি সংক্রান্ত আয়াত নাজিল হওয়ার পরই এসব কার্যক্রম শুরু হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদের যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো, কারণ তাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায্য করার ক্ষমতা রাখেন। (সুরা হজ, আয়াত : ৩৯)

এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর সাহাবিরা নিশ্চিত হন যে সামনে যুদ্ধ হতে পারে। এর আগে তাদের যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাই তারা নিজেদেরকে যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এভাবেই আরব উপদ্বীপে মূর্তিপূজা ও শিরকের শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামের জোরালো সংগ্রামের সূচনা হয়। এর নেতৃত্বে ছিল মক্কার কুরাইশরা।

এই প্রেক্ষাপটেই হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে সিফুল বাহর অভিমুখে সারিয়্যায়ে হামজা পাঠানো হয়। হিজরতের পর এটিই ছিল মদিনা থেকে পরিচালিত প্রথম সামরিক অভিযান এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম সামরিক পতাকা প্রদান।

সারিয়্যায়ে হামজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ

সিরাত ও যুদ্ধাভিযানের ইতিহাসবিদরা বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম যে পতাকা প্রদান করেন, তা ছিল তার চাচা হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের (রা.) জন্য। হিজরতের সাত মাস পর, প্রথম হিজরি সালের রমজান মাসে এই অভিযান পাঠানো হয়।

পতাকাটি ছিল সাদা। এর বাহক ছিলেন হামজার মিত্র আবু মারসাদ আল-গানাভি (রা.)।  রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সঙ্গে ৩০ জন মুহাজিরকে পাঠান। এ দলে কোনো আনসারি ছিলেন না। তাদের মধ্যে আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ, আবু হুযাইফা ইবনে উতবা, আবু হুযাইফার মুক্তদাস সালেম এবং যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) ছিলেন।

তাদের দায়িত্ব ছিল শাম থেকে মক্কার দিকে ফিরে আসা কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলা আটকানো। কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন কুরাইশদের অত্যাচারী নেতা ও অন্যতম প্রধান অপরাধী আবু জাহল। তার সঙ্গে ছিল ৩০০ জন লোক। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, কাফেলায় ১৩০ জন আরোহী ছিল।

সারিয়্যাটি আল-ঈস এলাকার দিক দিয়ে সিফুল বাহরে পৌঁছে কাফেলাটির মুখোমুখি হয়।

দুই পক্ষই যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ হয়। এমন সময় মুজদি ইবনে আমর আল-জুহানি সেখানে উপস্থিত হন। তিনি ও তার গোত্র একই সঙ্গে দুই পক্ষেরই মিত্র ছিলেন। তাই তিনি উভয় পক্ষের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ান। তিনি ন্যায়সংগত অবস্থান নেন এবং কোনো পক্ষের প্রতি পক্ষপাত দেখাননি। শেষ পর্যন্ত তিনি দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ঠেকাতে সক্ষম হন।

এরপর কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলাটি মক্কার পথে রওনা হয় এবং সারিয়্যাটি মদিনায় ফিরে আসে।

এরপর একের পর এক সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ সংঘটিত হতে থাকে। এই ধারাবাহিকতার পর মাত্র এক বছর পর বদর যুদ্ধে ইসলামের সামরিক তৎপরতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।

কুরাইশের প্রতি এই অভিযানের বার্তা

যাই হোক, এই অভিযান হামজা (রা.) ও তার সঙ্গে থাকা মুহাজিরদের সাহস ও দৃঢ়তার প্রমাণ দেয়। নবীজির (সা.) নির্দেশ বাস্তবায়নে নিজেদের জীবন ও রক্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন তারা। কারণ তিনি তাদের এমন কাজের দায়িত্বই দিতেন, যাতে ইসলামের বিজয়, মুসলমানদের মর্যাদা এবং তাদের কল্যাণ নিহিত ছিল।

সংখ্যায় কম হওয়া সত্ত্বেও তারা কাফেলার সঙ্গে থাকা কুরাইশের মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ হয়েছিলেন। তাদের তুলনায় কুরাইশদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ গুণ। তবু মুসলমানরা পিছিয়ে যাননি বা দ্বিধা করেননি। তারা কুরাইশদের বুঝিয়ে দেন, মক্কায় মুসলমানদের যে অসহায়ত্ব, নির্যাতন ও জুলুম করা হয়েছে তা আর ফিরে আসবে না।

একই সঙ্গে মুসলমানরা কুরাইশদের জানিয়ে দেন, তাদের বাণিজ্য কাফেলার পথ—যা ছিল তাদের জীবনধারার প্রধান ভিত্তি, সম্পদ, শক্তি ও প্রভাবের উৎস—এখন তাদের জন্য আর নিরাপদ নয়। আগের মতো নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগও আর নেই।

তাই কুরাইশদের উচিত ছিল তাদের বেপরোয়া আচরণ, ঔদ্ধত্য ও অহংকারের পরিণতি উপলব্ধি করা এবং ইসলামের বিরোধিতা ও এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করা। মুসলমানদের নিজেদের মতো থাকতে দেওয়া এবং তাদের কোনোভাবে উসকানি বা ক্ষতি না করে তাদের প্রতিপালকের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।

এনটি