ক্ষমা ও মহানুভবতার শিক্ষা দিয়েছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তার জীবন জুড়ে ক্ষমার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। নিজের জীবননাশের চেষ্টাকারীকেও ক্ষমা করেছেন। ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে কারো ওপর প্রতিশোধ নেননি। তবে আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তিযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে আইন বাস্তবায়নে কোনো ছাড় দেননি তিনি।
মহানবীর (সা.) ঘনিষ্ঠ সাহাবি হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, খায়বার যুদ্ধে ইহুদিরা মুসলিমদের কাছে পরাজয় বরণের পর মহানবীর (সা.) কাছে বিষ মেশানো একটি ভেড়ার মাংস নিয়ে এসেছিল এক ইহুদি নারী। তিনি তা থেকে কিছু অংশ খেয়েছিলেন। ওই নারীকে যখন তার সামনে আনা হলো, তখন সাহাবিরা বললেন, আমরা কি তাকে হত্যা করব? নবীজি বললেন, না। আনাস (রা.) বলেন, নবীজির জীবনের শেষ পর্যন্ত তার গলায় সেই বিষ প্রয়োগের প্রভাব দেখেছি আমি। (সহিহ বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ)।
মহানবী (সা.) তখন একই সঙ্গে ছিলেন আল্লাহর নবী এবং ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান। যেকোনো রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বা রাজার জীবননাশের চেষ্টা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। কেউ এমন চেষ্টা করলে বা তার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ধরা পড়লে সাধারণত তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের অভিযোগ আনা হয়। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তি খুব কম ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পায়। অথচ মহানবীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল, ওই নারীকে হত্যা করা যাবে না।
এখানে সেই ভয়াবহ হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পরিচয় নিয়েও কোনো সংশয় ছিল না। ওই নারী নিজেই ভেড়ার মাংস নিয়ে এসেছিল এবং মহানবীকে বলেছিল, সে তার জন্য উপহার হিসেবে প্রস্তুত করেছে।
ওই নারীকে মহানবীর (সা.) সামনে আনা হলে তিনি তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চান। সেই নারী ভেড়ার মাংসে বিষ মেশানোর কথা অস্বীকার করেনি। সে বলেছিল— আমি ভেবেছিলাম, আপনি যদি সত্যিই নবী হন, তাহলে এই বিষ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর আপনি যদি রাজা হন, অর্থাৎ আপনার নবুয়তের দাবি সত্য না হয়, তাহলে আমি আপনাকে সরিয়ে দিয়ে মানুষকে আপনার হাত থেকে রক্ষা করব।
ওই নারী ভেবেছিল সে নবীজির খাবারে বিষ মিশিয়ে নবীজিকে হত্যায় সফল হবে েএবং নিজের সম্প্রদায়ের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পারবে। সে জানত, মহানবী সাধারণত কারও দেওয়া উপহার ফিরিয়ে দিতেন না। খাবার উপহার দিলে তিনি তা থেকে খেতেন এবং অন্য কোনো ব্যবহারযোগ্য জিনিস হলে তা ব্যবহার করতেন। এর মাধ্যমে তিনি উপহারদাতাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতেন।
ওই নারী এটাও জানত, শুধু মহানবীই ওই ভেড়ার মাংস খাবেন না। তার সঙ্গে থাকা সাহাবিদেরও খাবারে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হবে। ফলে তার সঙ্গে থাকা বেশ কয়েকজন সাহাবি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা তার সঙ্গে মারা যেতে পারেন। তার পরিকল্পনার সম্ভাব্য পরিণতি এমনই হতে পারত।
সাহাবি বিশর ইবনুল বারা (রা.) প্রথমে সেই মাংস খান। মহানবী (সা.)-ও এক বা দুই লোকমা খেয়েছিলেন। এরপরই তিনি সাহাবিদের থামার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন— এই মাংস স্পর্শ করো না। এর একটি অংশ আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে যে, এতে বিষ রয়েছে। দএরপর অল্প সময়ের মধ্যেই বিশর ইবনুল বারা (রা.) ইন্তেকাল করেন।
মহানবী (সা.) নিজেও তার পবিত্র জীবনের শেষ পর্যন্ত ওই বিষের প্রভাব অনুভব করেছেন। মহানবীর ইন্তেকাল পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন আনাস (রা.)। তাই বিষমিশ্রিত ওই ভেড়ার মাংসের কারণে মহানবীর শারীরিক অবস্থায় যে পরিবর্তন হয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। ওই নারী নিশ্চয়ই অত্যন্ত শক্তিশালী বিষ ব্যবহার করেছিল, যার প্রভাব এত দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।
বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) ইন্তেকালের কিছুদিন আগে অসুস্থ অবস্থায় বলেছিলেন, খায়বারে খাওয়া ওই বিষমিশ্রিত খাবারের কারণে তিনি তখনও কষ্ট অনুভব করছিলেন। এ কারণে অনেক আলেম মত দিয়েছেন, মহানবীও শহীদের মর্যাদা লাভ করেছেন। অর্থাৎ নবী ও রাসুল হওয়ার সম্মানের পাশাপাশি আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদাও দান করেছেন।
উপরের ঘটনার আলোকে ওই নারীকে ক্ষমা করার ব্যাপারে মহানবীর প্রবণতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সাহাবিরা যখন তাকে হত্যার পরামর্শ দিয়েছিলেন, তখন তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াতে এর প্রকাশ ঘটে। নিজের শত্রুদের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর ও হিংস্র ব্যক্তিকেও ক্ষমা করার সুযোগ থাকলে তিনি তা করতেন।
অধিকাংশ হাদিস ও ইতিহাসগ্রন্থে এ ঘটনাটি এই নিবন্ধে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেভাবেই বর্ণিত হয়েছে। সেখানে ওই নারীর শাস্তি হয়েছিল কি না, তা উল্লেখ করা হয়নি। ওই নারীর নাম ছিল জায়নাব বিনতে হারিস। ইমাম বুখারি তার মূল্যবান সংকলন আল-আদাবুল মুফরাদে এই হাদিসটি ক্ষমাশীলতা অধ্যায়ের অধীনে উল্লেখ করেছেন।
তবে কয়েকজন আলেম উল্লেখ করেছেন, পরবর্তী সময়ে মহানবী ওই নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার প্রথমবারের ক্ষমা এবং পরবর্তী শাস্তির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। মহানবী প্রথমে তার জীবননাশের চেষ্টা করার কারণে নারীটিকে ক্ষমা করেছিলেন। তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় এবং মহানবী বেঁচে যান। যেহেতু হত্যাচেষ্টাটি ব্যক্তিগতভাবে তার ওপর করা হয়েছিল, তাই তাকে ক্ষমা করার অধিকারও একমাত্র তারই ছিল। কিন্তু ওই নারীর শাস্তির কারণ ছিল মহানবীর সাহাবি বিশর ইবনুল বারাকে বিষমিশ্রিত মাংস খাইয়ে হত্যা করা।
ইসলামের সুপরিচিত একটি নীতি হলো, কোনো অপরাধের জন্য মহান আল্লাহ নিজে যখন নির্দিষ্ট শাস্তি নির্ধারণ করেছেন, তখন কেউই এমনকি মহানবী (সা.)-ও সেই শাস্তি মওকুফ করার অধিকার রাখেন না। হত্যার অপরাধ তার অন্যতম উদাহরণ, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
কোনো ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড ঘটালে এবং তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলে কেউ তার শাস্তি মওকুফ বা কমিয়ে দিতে পারেন না। একই নীতি চুরি, ব্যভিচার ও সশস্ত্র ডাকাতির মতো অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এর অর্থ হলো, মহানবী (সা.) তার নিজের ক্ষতি বা জীবননাশের চেষ্টা করা কোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু অন্য কাউকে হত্যা করার অপরাধ তিনি ক্ষমা করতে পারতেন না। কারণ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা তার দায়িত্ব ছিল।
ব্যক্তিগত আঘাত, ক্ষতি কিংবা অপমানের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) কখনো ক্ষমা করতে দ্বিধা করতেন না। তিনি তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ওই ইহুদি নারীকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা করেছিলেন। তবে তার বিষ প্রয়োগে একজন সাহাবি নিহত হওয়ায় ওই নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
এনটি
