সম্পত্তি দান করার পরেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেটি ভোগ করার অধিকার রাখতে পারবেন এমন বিধান রেখে 'ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬' জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পাস হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এই বিল উত্থাপন করলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এটিকে কোরআন-সুন্নাহর বিরোধী বলে প্রতিবাদ করেন। তবে পরে কন্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
দেশের আলেমসমাজ ও ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও আইনটির বিরোধিতা করা হয়েছে। তাদের মতে, মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হলেও এই আইনের মাধ্যমে মূলত কোরআন, সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়াহ নির্ধারিত ফারায়েজ (উত্তরাধিকার) এবং হেবার মূল নীতিকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেকও এ ধরনের শর্তযুক্ত হেবা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মতামত দিয়েছেন। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এক ফতোয়ায় তিনি বলেন, ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে কার কতটুকু সম্পত্তির অধিকার রয়েছে, তা কোরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে নির্ধারিত। ফলে সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক প্রয়োজন বা অন্য কোনো যুক্তির ভিত্তিতে আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত মিরাসের বিধানে পরিবর্তন বা সংশোধনের সুযোগ নেই।
‘এটি একটি সংবেদনশীল বিষয়। ধর্মপ্রাণ মানুষও মানতে চাইবেন না’
শুধু আলেম সমাজ নয়, দেশের সাধারণ ধর্মপরায়ণ মানুষ কোরআন, সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়তের সুনির্দিষ্ট আইনের সংশোধন, পরিমার্জন মানতে চাইবেন না বলে মনে করছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্মমহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবদী। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলছেন, জীবিত ও মৃত মানুষের সম্পদ বন্টনের নিয়ম ও বিধান পবিত্র কোরআনে জানিয়ে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। রাসুলের (সা.) সুন্নাহতে বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এর বাইরে কোরআনের আইনকে কাটছাঁট বা সংশোধন করার কোনো সুযোগ নেই। নতুন আইন কোরআন, সুন্নাহের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি একটি সংবেদনশীল বিষয়। দেশের মানুষ ধর্মপরায়ণ, তারাও কোরআনের আইনের সংশোধন, পরিমার্জন মানতে চাইবেন না।
‘হেবার নিয়ম ও পদ্ধতি আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলে দিয়েছেন, তা না মেনে নিজের পক্ষ থেকে শর্তযুক্ত করে দেওয়ার দায়িত্ব আপনাকে, আমাকে কে দিয়েছে?’ প্রশ্ন রাখেন তিনি।
‘ এর ফলে শরীয়তে নির্ধারিত ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে’
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামী শরীয়তে নির্ধারিত ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং হেবার মুল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলছেন, হেবা হচ্ছে এক ধরনের দান। দানের ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে গ্রহীতা মালিক হয়ে যাবেন এবং ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু নতুন সম্পত্তি আইনে বলা হচ্ছে, হেবা করার পরও দাতা জীবদ্দশায় তা ভোগদখল করতে পারবেন, তার মৃত্যুর পর গ্রহীতা অথবা গ্রহীতা মারা গেলে তার উত্তরসূরিরা মালিক হবেন। তার মতে সংশোধনী আইনের এই দিকটি নিয়ে আপত্তির যথেষ্ট কারণ রয়েছে ইসলামী চিন্তাবিদদের।
কারণটি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এই আইনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো, হয়তো কারো শুধু মেয়ে সন্তান আছে, তিনি মেয়েকে হেবা করে দিয়ে গেলেন, তাহলে তার মৃত্যুর পর ইসলামে মীরাস বন্টনের যে আইন আছে এবং ইসলামের দৃষ্টিতে তার সম্পত্তিতে আরও যারা ওয়ারিস আছেন, তিনি তাদের বঞ্চিত করার একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়ে গেলেন।
সেকশন ১২২ এ (১)-এ বলা হয়েছে, এই বিধান অন্য সব আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে। অথচ একই ধারার উপধারা (৪)-এ বলা হচ্ছে, এটি হেবা বা অন্য কোনো স্বীকৃত হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতা ক্ষুণ্ন করবে না। একটি সুপ্রিমেসি ক্লজ ও একটি সেভিংস ক্লজ একই সেকশনে পরস্পরবিরোধী — বাস্তবে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে কোনটি প্রাধান্য পাবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা আইনে নেই।
আজিজুল হক ইসলামাবদীর মতামতেও একই বিষয় ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, সংশোধিত সম্পত্তি আইনের মাধ্যমে এক সন্তানকে বেশি দিয়ে অন্য সন্তান বা ওয়ারিসদের বঞ্চিত করার একটি সুযোগ রয়ে যাচ্ছে। সম্পদের মালিক মারা গেলে ইসলামী ও দেশীয় আইন অনুয়াযী তার সন্তানেরা এর মালিক হবেন। তাহলে জীবদ্দশায় হেবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে কেন?
তিনি আরও বলেন, যার সন্তান নেই তার সম্পদ বন্টনের নিয়মও কোরআনে বলা আছে, তাহলে এখানে নতুন করে আইন করার প্রয়োজনীয়তা আসছে কীভাবে?
রাজধানীর বসুন্ধরার ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ এবং মারকাযুল ফিকরিল ইসলামীর প্রিন্সিপাল মুফতি আরশাদ রাহমানী ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয়েছে। পারিবারিক আইন, উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ নিয়ে ফতোয়া আকারে বিস্তারিত মতামত পরবর্তীতে জানাবো। তবে জাতীয় মসজিদের খতিবের ফতোয়াটি দেখেছি এবং তার সঙ্গে কথা হয়েছে, সম্পত্তি হস্তান্তরে সংশোধনী আইনটি শরীয়াহ আইনের বিরোধী বলেই মনে হয়েছে।
‘উত্তরাধিকার আইন কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত, তাই নতুন গবেষণার সুযোগ একেবারেই সীমিত’
আইএফএ কনসালটেন্সির সহ-প্রতিষ্ঠাতা মুফতি ইউসুফ সুলতান বলেন, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের নীতিমালা বিশদভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেহেতু কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত, তাই এখানে ইজতিহাদ ও নতুন গবেষণার সুযোগ একেবারেই সীমিত। সেই বিবেচনায় এই বিষয়টিকে আমাদের অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে দেখতে হবে। এটি সাধারণ হেবার মতো কোনো বিষয় নয়।
তিনি বলেন, আলোচ্য ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, দাতা দান করবেন কিন্তু ভোগদখল নিজের কাছে সংরক্ষণ করবেন। অর্থাৎ দানের সঙ্গে একটি শর্ত যুক্ত হচ্ছে। চার মাজহাব ঘেঁটে মোটা দাগে যা পাওয়া যায় তা হলো, এ ধরনের শর্ত হয় বাতিল, নয়তো মুফসিদ। এর ফলাফল হলো, শর্ত বাদ হয়ে যাবে কিন্তু দান বহাল থাকবে, অর্থাৎ দান পুরোপুরি কার্যকর হবে আর শর্তটি কার্যকর হবে না।
‘আলোচ্য প্রস্তাব অনুযায়ী ধারা ১২২ এ(৩) অনুযায়ী দাতার ভোগাধিকার সম্পত্তির সঙ্গে লেগে থাকবে, ফলে গ্রহীতা কাগজে কলমেও এর উপর স্বাধীনভাবে লেনদেন করতে পারছেন না। ফলে এটি এমন একটি হেবা যেখানে কোনোভাবেই কোনো অধিগ্রহণ ঘটছে না। সুতরাং হেবা পরিপূর্ণ হচ্ছে, এ কথা বলার সুযোগ থাকছে না’ বলে মতামত মুফতি ইউসুফ সুলতানের।
‘ধর্মীয় স্পর্শকাতরতার বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি’
নতুন উত্তরাধিকার আইন প্রণয়নে সরকার পক্ষ বেশ তাড়াহুড়ো করেছেন বলে মনে করছেন, আইএফএ কনসালটেন্সির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এবং জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকার সহকারী মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ব্রিটিশ শাসনামলেও সম্পত্তি হস্তান্তর, উত্তরাধিকার ও বিবাহ ক্ষেত্রে ধর্মীয় মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান সরকার এই আইন প্রণয়নে যে পরিমাণ তাড়াহুড়া করেছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। অবাক করা বিষয় হলো, কর্তৃপক্ষকে এই আইনের ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা সম্পর্কে অবগতও করা হয়েছিল, তবুও তারা বিষয়টি আমলে নেয়নি।
‘আইনটির মধ্যে আইনগত ফাঁক (গ্যাপ) রয়ে গেছে’
তিনি বলেন, আইনটির মধ্যে এমন কিছু আইনগত ফাঁক (গ্যাপ) রয়ে গেছে, যা আমাদের রীতিমতো বিস্মিত করেছে। সেকশন ১২২ এ (১)-এ বলা হয়েছে, এই বিধান অন্য সব আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে। অথচ একই ধারার উপধারা (৪)-এ বলা হচ্ছে, এটি হেবা বা অন্য কোনো স্বীকৃত হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতা ক্ষুণ্ন করবে না। একটি সুপ্রিমেসি ক্লজ ও একটি সেভিংস ক্লজ একই সেকশনে পরস্পরবিরোধী— বাস্তবে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে কোনটি প্রাধান্য পাবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা আইনে নেই।
‘সমাধানের সুযোগ আছে এখনো’
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী নিয়ে আলেমদের সঙ্গে আলোচনার ও বিবেচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন, হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী।
তিনি বলছেন, বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক এই বিষয়ে ফতোয়া দিয়েছেন। হেফাজতে ইসলাম, আমাদের দল খেলাফত মজলিসসহ অন্যান্য ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো এ নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলেমদের সঙ্গে আরও আলোচনার মাধ্যমে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমাধান বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকার পক্ষকে। কিন্তু আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই ইতোমধ্যে সংসদে আইন পাশ হয়ে গেছে। তবে যেহেতু আইন কার্যকর হওয়ার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, রাষ্ট্রপতির হাতে যাওয়ার আগে সরকার পক্ষ ও আলেমদের পরস্পর বিরোধী অবস্থানে না গিয়ে এখনো সমাধান ও পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়ে গেছে মনে করছেন তিনি।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীতে অপষ্টতা রয়েছে মন্তব্য করে মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম বলেন, আইনে ভোগাধিকারের কোনো সংজ্ঞা নেই। যেমন, বসবাস, ভাড়া বা আয়, লিজ দেওয়ার অধিকার, রক্ষণাবেক্ষণের দায়। এসবের মধ্যে কোনটি এর অন্তর্ভুক্ত হবে আর কোনটি হবে না, তা নির্ধারিত নয়। দাতা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু ভোগ করবেন আইনে তার সীমারেখা স্পষ্ট নয়। একটি নতুন সম্পত্তি-স্বত্ব তৈরি করা হচ্ছে, অথচ তার বিষয়বস্তু অস্পষ্ট।
‘নাম যা-ইহোক না কেন এটি চরিত্রগতভাবে হেবাই’
মুফতি আবদুল্লাহ মাসুমের মতে, প্রস্তাবিত আইনটির সঙ্গে ইসলামে স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের নির্দেশনারও সংঘর্ষ রয়েছে। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রী যদিও আইনি ভাষায় বলতে চেয়েছেন যে, এটি হেবা নয়। কিন্তু আইনে স্পষ্টভাবেই গিফট শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, আর ইসলামী আইন বিশারদদের কাছে নাম যা-ই দেওয়া হোক না কেন এটি চরিত্রগতভাবে হেবাই। তবে এর কাঠামোতে যেহেতু ইউজফ্রাক্ট আজীবনের জন্য নিজের কাছে রেখে দেওয়ার শর্ত করা হয়েছে, তাই কার্যত এটি উইল বা ওসিয়তের রূপ নিয়ে নেয়।
তিনি বলেন, ইসলামী আইনের বিশ্লেষণে এখানেই একটি জটিলতা তৈরি হয় — একে হেবা বলতে গেলে গ্রহীতাকে পূর্ণ দখল বুঝিয়ে দিতে হবে, যাতে আইনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়ে যাবে। আবার একে ওসিয়ত বলতে গেলে, ওয়ারিশের অনুকূলে ওসিয়ত করা যায় না — তাতেও আইনের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। মূলত ইসলামী আইন বিশারদগণ এই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানটিই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে চেয়েছেন।
আইনটির ইতিবাচক-নেতিবাচক আলোচনার দিক নিয়ে তিনি বলেন, এই আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথাও বলা হচ্ছে। সেগুলো সত্য হতে পারে, নাও হতে পারে। তবে আমার কাছে এর একটি ইতিবাচক দিকও আছে বলে মনে হয়েছে। তা হলো, অনেক পিতা-মাতাই জীবদ্দশায় তাদের সম্পত্তি ছেলে-মেয়ে সকলের মাঝে ভাগ করে দিতে চান, তবে নিজের জন্য সীমিত হলেও একটা ভোগের অধিকার রেখে দিতে চান। এ জন্য আইনবিদ ও বিজ্ঞ আলেমদের সমন্বয়ে একটি বৈঠক হওয়া প্রয়োজন।
এনএফ/এনটি
