তোপের মুখে শুটিং ফেডারেশনের ক্ষমা ও ভুল স্বীকার

কয়েক মাস ধরেই যৌন হয়রানি সংক্রান্ত অভিযোগে উত্তপ্ত শুটিং অঙ্গন। এক জানুয়ারি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অভিযুক্ত ব্যক্তি ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক জিএম হায়দার সাজ্জাদকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করেছে। আবার ঐ একই দিন আরেক চিঠিতে ফেডারেশন জাতীয় তারকা শুটার কামরুন নাহার কলিকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে। শুটিংয়ের এমন পরিস্থিতিতে আজ ফেডারেশন একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল।
সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আরা খানম (আলেয়া ফেরদৌস) লিখিত বক্তব্য পাঠের পরই সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েন। সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে শুটিং ফেডারেশন লিখেছিল, ‘শুটিং ফেডারেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পরিকল্পিত, উদ্দেশ্য প্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডা, মিথ্যাচার এবং মানহানিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে যা ফেডারেশনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার পাশাপাশি দেশের ক্রীড়া প্রশাসন ও শুটিং ক্রীড়ার স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে।’
সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র সাংবাদিকরা শুরুতেই সাধারণ সম্পাদক আলেয়া ফেরদৌসের কাছে এটির ব্যাখ্যা চান। কোন মিডিয়ার কোন প্রতিবেদন অসত্য কিংবা ভিত্তিহীন। আলেয়া ফেরদৌস এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘শুটারদের মিথ্যা তথ্য পরিবেশন হয়েছে গণমাধ্যমে। সেটা যাচাই বাছাই হয়নি।’ সাংবাদিকরা তাৎক্ষণিকভাবে এটারও প্রতিবাদ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণ পত্রে নিচে লেখা ছিল আরো, ‘আপনার প্রতিষ্ঠানের একজন যোগ্য প্রতিনিধি পাঠিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে সহায়তা করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’ ২০-৩০ বছর ক্রীড়া সাংবাদিকতা করা কোনো সাংবাদিকও ফেডারেশনের আমন্ত্রণপত্রে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতি এমন নজিরবিহীন বার্তা দেখেননি। এই ভাষায় কেন আমন্ত্রণপত্র দেয়া হলো এর ব্যাখায় সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘অফিস থেকে করেছে, আমি ঠিক মতো খেয়াল করতে পারিনি।’ এমন আপত্তিকর বিজ্ঞপ্তির জন্য সাংবাদিকদের তোপের মুখে এক পর্যায়ে ফেডারেশনের সদস্য সারোয়ার হোসেন দুই হাত জোড় করে ক্ষমা চান, ‘ভুল ও দুঃখ প্রকাশ করছি আমরা।’ সাংবাদিক-ফেডারেশন কর্তাদের বাদানুবাদের মুহুর্তগুলো মোবাইলে লাইভ করছিলেন ফেডারেশনে নিযুক্ত দুই একজন। অনুমতি ছাড়া এমন কান্ডের জন্য আবারও জোর প্রতিবাদ করেন সাংবাদিকরা। এজন্য আরেক দফা ভুল ও দুঃখ প্রকাশ করে ফেডারেশন। শুটিং ফেডারেশনে অনেক সংবাদ সম্মেলন হয়েছে কখনো লাইভ হয়নি, এই সংবাদ সম্মেলন লাইভ করার কারণ সাংবাদিকদের কাছে রহস্যজনক লেগেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যানারে ছিল, ‘বিএসএসএফ-এর বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্টের দোসরদের গভীর ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পিত মিথ্যাচার: দালিলিক সত্যের উন্মোচন’। সংবাদ সম্মেলনে দালিলিক কোনো পত্র উপস্থাপন করেনি ফেডারেশন। এই কমিটির একাধিক ব্যক্তি আওয়ামী লীগের আমলেও ছিলেন। এ নিয়ে উল্টো প্রশ্ন হলে সাধারণ সম্পাদকের ব্যাখ্যা, ‘২০১২ সালের আগে ছিলাম, তখন দুর্নীতি হয়নি।’
চার পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যে শুটার তাসমায়াতি এমা, সাবেক শুটার শারমিন আক্তার রত্না, কামরুন নাহার কলির বিভিন্ন অভিযোগকে খন্ডিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। অথচ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গঠনকৃত তদন্ত কমিটি অনেক অভিযোগের সতত্যা পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাজ্জাদকে দশ বছরের জন্য নিষিদ্ধের সুপারিশও করেছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রজ্ঞাপন ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরও কেন এই সংবাদ সম্মেলন সেই প্রশ্ন এসেছে এসেছে ঘুরেফিরে। সাধারণ সম্পাদক সহ উপস্থিত ফেডারেশনের সকলে মিলে বলার চেষ্টা করেছেন, ‘ফেডারেশনের ইমেজ ও সত্য বিষয়গুলো তুলে ধরতেই এই আয়োজন।’

সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জিএম হায়দার সাজ্জাদকে নিয়ে শুটাররা মানববন্ধন, মামলা, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, অলিম্পিকে চিঠি দিয়েছেন। তখন সাংবাদিকরা ফেডারেশনের বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করেছেন প্রায় সময়। অনেক সময় ফেডারেশনের কর্তা ব্যক্তিদের পাওয়া যায়নি। তখন প্রেস কনফারেন্স না করে সাজ্জাদের অব্যাহতির পর প্রেস কনফারেন্স করা এবং শুটারদের অভিযোগ প্রকারান্তরে মিথ্যা বা ভুল উপস্থাপন করে সাজ্জাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার শামিল মনে করেন ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে প্রশ্ন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সাজ্জাদ নয় আমরা শুটিংয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতেই আপনাদের এখানে ডেকেছি। যেন নারীরা শুটিং বা ক্রীড়া বিমুখ না হয়।’
মুখে সাজ্জাদের জন্য নয় বললেও আজও শুটিং ফেডারেশনে সাজ্জাদকে দেখা গেছে। ফেডারেশনের কর্মকান্ড সম্পর্কেও তিনি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। এ নিয়ে সাধারণ সম্পাদকের ব্যাখ্যা, ‘কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতার জন্যই তিনি আজ এসেছেন। ’জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সাজ্জাদকে অব্যাহতি দিয়েছে। শুটারদের তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। সাজ্জাদ সম্পর্কে ফেডারেশনের অবস্থান কি এই বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক বলেন', আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি তার অব্যাহতির বিষয়টি। এখনো কোনো চিঠি পাইনি। তাকে আমরা কর্মকান্ডের বাইরে রাখছি। নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমরা তার ব্যাপারে অবস্থান নির্ধারণ করব।’
ফেডারেশনগুলোর অভিভাবক জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে যুগ্ম সম্পাদক সাজ্জাদকে অব্যাহতি প্রদান করেছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রাপ্তি এখনো স্বীকার করেনি উল্টো সংবাদ সম্মেলনে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ করেছেন তাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান বা ভুল উপস্থাপন। যা এক প্রকার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মতোই। এ নিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক দৌলতুজ্জামান বলেন, ‘তাকে (সাজ্জাদ) অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত চলমান। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ফেডারেশনের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করছে।’ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তিন সদস্য কমিটি করেছিল। সেই কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। সেই কমিটি থাকাবস্থায় আবার মন্ত্রণালয় আরেকটি কমিটি করেছে। মন্ত্রণলায় উর্ধ্বতন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্তের তেমন কার্যকরিতা থাকছে না। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাহীনতা এবং সমন্বয়হীনতাও দৃশ্যমান।
শুটিং গুলি, অস্ত্রের খুব সংবেদনশীল খেলা। শুটিং ফেডারেশনের স্টোর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্টোরের ভিডিও ফুটেজ সাত দিনের বেশি থাকে না। সেই স্টোরের পাসওয়ার্ড সাজ্জাদের কাছে। যেটা সাধারণত সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের কাছে থাকার কথা। এ নিয়ে সাধারণ সম্পাদকের ব্যাখ্যা, ‘সভাপতির নির্দেশক্রমেই সেই পাসওয়ার্ড তার (সাজ্জাদ) কাছে ছিল। ফুটেজ যেন অন্তত তিন মাসের থাকে এটা নির্বাহী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে।’
অলিম্পিক বৃত্তির আওতায় থাকা শুটার কামরুন নাহার কলির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এরপরও কেন কলির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে না এমন প্রশ্নে কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে ঘুরে ফিরে বারবার কলির শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এবং দুই বার শোকজের প্রসঙ্গ এনেছেন। কলির সংস্থা নৌবাহিনী থেকে কলির শাস্তি প্রত্যাহার এবং কলির শোকজের জবাব দেয়া হয়েছে। সেটাও পাননি বলে জানান ফেডারেশনের কর্মকর্তারা।
এজেড/এইচজেএস