জাবির বিদায় ছিল ‘অবধারিত’, কী কারণে?

রিয়াল মাদ্রিদ চলতি মৌসুমে খুব যে খারাপ অবস্থানে আছে, তা নয়। লা লিগায় শীর্ষ দল বার্সেলোনার চেয়ে চার পয়েন্ট পেছনে, চ্যাম্পিয়নস লিগেও তারা প্রথম আট দলের মধ্যে আছে। ক্রিসমাসের ঠিক আগে আট খেলায় মাত্র দুটি জয়ে কোচ জাবি আলোনসোর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়লেও পরের পাঁচ ম্যাচে টানা জয়ে চাপ কাটিয়ে ওঠেন। এমনকি রোববার বার্সেলোনার কাছে স্প্যানিশ সুপার কাপ ফাইনালে হারলেও তার চাকরি চলে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি শুরুতে সেভাবে লক্ষ করা যায়নি। গতকাল (সোমবার) স্প্যানিশ সময় বিকেলে বোর্ড একটি বৈঠক ডাকে- যেখানে একমাত্র আলোচনার বিষয় ছিল জাবির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ। কোচের ট্যাকটিকস ও অ্যাপ্রোচ নিয়ে নানান দ্বিমতের প্রেক্ষিতে রাতে আসে আকস্মিক ঘোষণা- ‘পারস্পরিক সমঝোতা’য় মাদ্রিদ ক্লাব ছাড়ছেন ৪২ বছর বয়সী কোচ।
শুধু বার্সেলোনার কাছে হারই জাবির চলে যাওয়ার কারণ নয়, তার বিদায়ের সাইরেন বেজেছিল ম্যাচ শেষে কয়েকটি মুহূর্ত পর্যালোচনা শেষে। পুরস্কার বিতরণীর সময় প্রথাগতভাবে বার্সাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার কথা থাকলেও কিলিয়ান এমবাপ্পে তার সতীর্থদের মাঠ ছেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। জাবি তাকে থেকে যেতে বলছিলেন। কিন্তু এমবাপ্পে নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। শেষ পর্যন্ত জাবি মুখ ফিরিয়ে নেন এবং তার দলের সুপারস্টারের দাবি মেনে নিলেন। স্প্যানিশ সুপার কাপ জয়ের পর বার্সেলোনার জন্য কোনো ‘গার্ড অফ অনার’ দেওয়া হয়নি।
অনেকের কাছে এটি ছিল খেলোয়াড়সুলভ আচরণের অভাব, যা জাবির ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একেবারেই যায় না। এটি আরেকটি ব্যাপারও ইঙ্গিত করছিল- দলের নিয়ন্ত্রণ কোচের হাতে নয়, বরং খেলোয়াড়দের হাতে। ওই সময় জাবির মনে কী চলছিল- না, যথেষ্ট হয়েছে।

এটা কি পদত্যাগ ছিল? না। পরিকল্পনা করে যে তাকে দলছাড়া করা হলো, তাও সম্ভবত নয়। জাবি নিজেও ভাবেননি নিয়োগের সাড়ে সাত মাস পর এভাবে চলে যেতে হবে।
রিয়াল তাদের অফিশিয়াল বিবৃতিতে এই বিদায়কে ‘পারস্পরিক সমঝোতা’ হিসেবে বর্ণনা করলেও এটি যেন অবধারিত ছিল। বোর্ড সভায় তাকে এবং তার প্রতিনিধিদের যেসব কারণ দেখানো হয়েছে, সেগুলো ছিল অস্পষ্ট।
বেয়ার লেভারকুসেনে তিনি যেভাবে সফল হয়েছিলেন, তা এখানে বাস্তবায়ন করতে পারেননি। দলের শারীরিক সক্ষমতা আদর্শ পর্যায়ে ছিল না। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত উন্নতি হয়নি এবং তারা কোচের জন্য খেলছিলেন না।
ক্লাব বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে প্যারিস সেন্ট জার্মেই এবং লা লিগায় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে পরাজয়গুলোও কারণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অথচ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও লা লিগায় শিরোপা জয়ের আশা তারা বাঁচিয়ে রেখেছে ভালোভাবে। কোপা দেল রেতেও পরের রাউন্ডে উঠেছে। গত অক্টোবরে বার্সাকেও তারা হারিয়েছিল লিগে। তাহলে আর কী কারণ থাকতে পারে? সংকট?
আসল সংকটটি ছিল তার ওপর প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের আস্থার অভাব। পেরেজ কখনোই তার কোচের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারেননি। রিয়ালের কোচ হওয়া যে কতটা চ্যালেঞ্জিং তা জানতেন তিনি। এমনকি ফল ভালো করলেও। তবে মাদ্রিদে শুরু থেকেই জাবি নিজেকে একা অনুভব করেছেন খেলোয়াড়দের মুখ ফিরিয়ে রাখার কারণে।
তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে জাবির পরামর্শ আমলে নেয়নি। একজন কোচ আসার পর থেকে দলে আধিপত্য দেখান। কিন্তু মাদ্রিদ তার কর্তৃত্ব শুরু থেকে দমিয়ে রেখেছিল। তিনি মার্টিন জুবিমেন্ডির মতো একজন মিডফিল্ডার চেয়েছিলেন, যা ক্লাব উপেক্ষা করেছে। রক্ষণে ইনজুরি থাকলেও কোনো সমাধান দেওয়া হয়নি। নতুন খেলোয়াড় মাস্তানতুয়োনোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেননি।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে নিয়ে সংকট থেকে মূলত তার শেষের শুরু। ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের ফর্ম পড়ে যাওয়া এবং তার কোচকে দোষারোপ করার প্রবণতা ছিল। এল ক্লাসিকোতে বদলি হওয়ার পর জাবির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন মাঠেই, পরে তিনি সবার কাছে ক্ষমা চাইলেও কোচের কাছে চাননি। চুক্তির আলোচনা স্থগিত রাখা হয় জাবির সঙ্গে কী ঘটে তা দেখার জন্য। এমবাপ্পে দলের প্রয়োজনে খেলার চেয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এক বছরে ৫৯ গোলের রেকর্ড ছোঁয়ার দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন।

জাবি কখনোই খেলোয়াড়দের এটা বোঝাতে সক্ষম হননি যে তার পদ্ধতিটিই সঠিক ছিল। আর সেই কারণেই, তিনি তার লেভারকুসেন দলের বৈশিষ্ট্য হাই-প্রেস, খেলার গতি এবং পজিশনাল ফুটবল রিয়ালের দলে প্রয়োগ করতে পারেননি। রিয়াল ঐতিহাসিকভাবেই এমন একটি ক্লাব যেখানে কোচের দর্শনের চেয়ে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত প্রতিভা এবং ক্লাবের প্রচলিত ধারাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। জাবি চেয়েছিলেন, সেই সংস্কৃতি বদলে একটি আধুনিক দলগত কাঠামো তৈরি করতে, যা করতে গিয়ে তিনি একাকিত্বে ভুগতে শুরু করেন, যার প্রভাব পড়ল তার চাকরিতে।
জাবি এখন সিদ্ধান্ত নেবেন, তিনি কি বিশ্রামে যাবেন নাকি অন্য কোনো মিশনে। যারা তাকে চেনেন, তারা মনে করছেন যে তার এই চলে যাওয়াটা তার জন্য এক ধরনের স্বস্তি। ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো থেকে একটা বার্তা স্পষ্ট- আগামী মৌসুমে তাকে পেলে অনেকে খুশি হবে। অন্যদিকে রিয়াল আবারো প্রমাণ করল যে, তারা এমন এক ক্লাব যারা ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। যেখানে কোচকে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয় এবং আড়ালে তার বিদায়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
পরবর্তী কোচ হিসেবে আসছেন কাস্তিয়া কোচ আলভারো আরবেলোয়া। কিন্তু জাবির মতো কিংবদন্তি যেখানে ক্লাবের সংস্কৃতি বদলাতে পারেননি, সেখানে আরবেলোয়ার জন্য কাজটা প্রায় অসম্ভব।
এফএইচএম/