‘অভিভাবকহীন’ চট্টগ্রাম বিপিএলের ফাইনালে, মুখ খুললেন আড়ালের নায়করা

বিপিএলের চলমান দ্বাদশ আসর শুরুর আগে থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল চট্টগ্রাম রয়্যালস। পরবর্তীতে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেরদিন সকালে চট্টগ্রাম ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক কাইয়ুম রশিদ বিসিবি বরাবর চিঠি দিয়ে জানান, আর্থিক সমস্যার কারণে তারা বিপিএলে থাকতে চান না। সেই দলটাই কি না গতকাল (মঙ্গলবার) রাজশাহী ওয়ারিয়র্সকে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে চলমান আসরের ফাইনালে উঠেছে।
এর আগে চট্টগ্রাম রয়্যালস ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে কয়েকজন ব্যক্তিকে বাদ দিতে বলেছিল বিসিবি। এরপর তাদের পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান নিয়েও কথা ওঠে। পরবর্তীতে দল প্রত্যাহার চেয়ে সরাসরি আবেদন করেন চট্টগ্রাম ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক। তবে চট্টগ্রাম রয়্যালস ফি এবং ব্যাংক গ্যারান্টি বাবদ বিসিবির সকল পাওনা পরিশোধ করেছিল নিশ্চিত করে জানানো হয়। চট্টগ্রাম রয়্যালস কর্তৃপক্ষের চিঠির প্রেক্ষিতে সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির দায়িত্ব (মালিকানা) বুঝে নেয় বিসিবি।
পরবর্তীতে চট্টগ্রামের প্রধান কোচ হিসেবে মিজানুর রহমান বাবুলকে এবং টিম ডিরেক্টর পদে হাবিবুল বাশার সুমন দায়িত্ব দেয় বিসিবি। এ ছাড়া নাফিস ইকবালকে টিম ম্যানেজার এবং কোচ হিসেবে ছিলেন তুষার ইমরান ও মুমিনুল হক। আসর শুরুর আগেই অভিভাবক হারানো দল চট্টগ্রাম এখন বিপিএলের ফাইনালে। অনেকের কাছে যা স্বপ্নের মতো। দলটির কোচিং স্টাফও যেন স্বপ্নের জগতে আছেন। ফাইনালে পা রাখা দলটির কোচিং স্টাফের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা পোস্টের ক্রীড়া প্রতিবেদক সাকিব শাওন। তুলে ধরেছেন তাদের মনের কথা।
তুষার ইমরান (ব্যাটিং কোচ)
‘অসাধারণ লাগছে, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এই দল নিয়ে যে আসলে ফাইনালে উঠব এটা কল্পনাও করেনি কেউ। আমাদের থেকে কিন্তু কাগজে-কলেমে অনেক ভালো দল বাদ পড়েছে। বিশেষ করে রংপুর (রাইডার্স) কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো দল ছিল। তবে তারা বাদ পড়েছে, আমরা যে ফাইনালে উঠেছি সম্পূর্ণ ক্রেডিট আমি ক্রিকেটারদের দিতে চাই।’
‘ব্যাটিং নিয়ে বলতে গেলে আমরা ভালো করতে পারিনি, সব শেষ চার ম্যাচে। তবে আমরা অপেক্ষা করছিলাম একটা মোমেন্টামের জন্য। এমন উইকেটের জন্য কোন ব্যাটসম্যান উপযুক্ত সেটা আমরা ভেবেছি। সে কারণেই গতকাল আমরা তাহির বেগকে খেলিয়েছি, হারিসকে বসিয়ে। তাহির লম্বা ইনিংস ক্যারি করতে পারে, সোজা খেলতে পারে। (অ্যাডাম) রসিংটন আমাদের দলে যোগ দেওয়ার পর কিন্তু চিত্র বদলে গিয়েছিল। প্রথম ম্যাচ বাদে সবক’টা ম্যাচে সে রান করেছে। হাসান নেওয়াজও ভালো ,শেখ মেহেদীও খারাপ করেনি। এ ছাড়া যে যখন সুযোগ পেয়েছে চেষ্টা করেছে। গতকাল আমরা চেষ্টা করেছি কেবল পাওয়ারপ্লের ভেতর উইকেট না দিতে এবং তাতে সফল হয়েছি। যে কারণে রেজাল্টটা আমাদের পক্ষে এসেছে।’

মুমিনুল হক (সহকারী কোচ)
‘আমি শুরু থেকেই বলেছিলাম আমাদের লোকাল যে প্লেয়ারগুলো আছে তারা খুব ভালো। যদিও ব্যাটসম্যান একটু কম ছিল কিন্তু বোলারদের দিকে তাকালে দেখবেন যে, সেরা বোলাররাই আছে। আমাদের আসলে যেটা দুর্বলতা ছিল সেটা হচ্ছে ভালো বিদেশি ক্রিকেটার। সেটা যদি পূরণ হয়ে যায় ভালো করব এটা আগেই বলেছি।’
‘আমরা প্রথম দিন জিতেছিলাম ভালো খেলে। এরপর তিন নম্বর ম্যাচ থেকে আমাদের মনে হয়েছে যে, আমরা আসলে ভালো করতে পারব, বিশ্বাসটা চলে এসেছে। মূলত রসিংটন যোগ দেওয়ার পর দলটার আলাদা (শক্তি) যুক্ত হয়েছিল। দলের সঙ্গে খুব সুন্দরভাবে সেট হয়ে গিয়েছিল সে। দলের পরিবেশ আসলে খুব সুন্দর সবসময়। ম্যানেজার নাফিস খুব ভালোভাবে হ্যান্ডেল করেছে সবকিছু, সুমন ভাই–বাবুল ভাইও রয়েছে। এনালাইসিস্টও খুবই দুর্দান্ত। সবমিলিয়ে একটা ভালো পরিবেশ আছে, যে কারণে ক্রিকেটারদের পারফর্ম করতে সুবিধা হয়েছে।'
হাবিবুল বাশার (টিম ডিরেক্টর)
‘কিছু কিছু কাজ থাকে না জীবনে যেগুলো করলে আসলে প্রচন্ড আনন্দ লাগে? আমার কাছেও আসলে এটা খুব আনন্দের। একদম শুরুর সময়ের কথা যদি বলি আমাদের মাঠে খেলাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেভাবে হোক সম্মানের সঙ্গে যেন শেষ করতে পারি এরকম চিন্তা ছিল। সেখান থেকে এখন ফাইনালে। এই দলটা যখন করা হয়েছিল, তখন আসলে ব্যালেন্সের দিকে নজরটা কম ছিল। বোলিংটা ভালো ছিল, তবে ব্যাটিং ছিল না সেরকম। আমাদের শুরু থেকে অনেক ম্যাচ ছিল, যে কারণে ভালো বিদেশি আনাও কঠিন হয়ে যায়। দ্রুত সময়ের কারণে যতটুকু পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ (করার) চেষ্টা করেছি।’
‘বিসিবি চ্যাম্পিয়ন হলে (বোনাসের) বিষয়টা ভেবে দেখবে আশা রাখি। নরমালি প্রতি ম্যাচ জিতলে দুই লাখ টাকা করে বোনাস দেয়। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে সবাই বোনাসের চেয়ে তাদের পাওনা টাকাটা পেলে আরও বেশি খুশি হয়। বিসিবি কাগজে-কলমে যেতে হয়, এজন্য একটু সময় লাগে। কিন্তু এটা নিয়ে কোনো সমস্যা নাই, সবাই পেয়ে যাবে টাকা। আর অবশ্যই আমরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য খেলব। আর চ্যাম্পিয়ন হতে হলে কিন্তু ভাগ্যেরও কিছু ব্যাপার থাকে, সবাই তো চ্যাম্পিয়ন হতেই আসে। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য যা দরকার সেটা করতে প্রস্তুত রয়েছি।’

নাফিস ইকবাল (ম্যানেজার)
‘একটা কথা আছে না যে “উড়ে এসে জুড়ে বসা”, আমাদের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়েছিল। আমি একটা ছুটিতে ছিলাম, পরে বিসিবি সভাপতি আমাকে ফোন দেন। এরপর মিঠু ভাই, সুমন ভাইরা আমাকে বলেছিল আমি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেই এরপর যোগ দিয়েছিলাম দলটিতে। খেলা শুরুর একদিন আগেই আমাকে জানানো হয়েছিল। যেদিন খেলা আমি তার দুই ঘণ্টা আগে এসে পৌঁছাই, ফ্লাইটের টিকিট করা ছিল না। সে কারণে ট্রেনে করে আসি। ট্রেনার ডালিম ভাই, ফিজিও এনাম ভাইরাও একই অবস্থায় এসেছিল। এরপর প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল আসলে জার্সি রেডি করা, মাত্র দুই সেট ছিল। আমি যেভাবে বলছি আসলে এত সহজ ছিল না। আরও সমস্যার বিষয়– তখন মাত্র দুইটা বিদেশি ছিল দলে। বাকিদের দ্রুত আনার চেষ্টা করি আমরা। সবাই পজিটিভ ছিলাম, আমাদের ইনটেন্ট সত্য ছিল, এ কারণে আলহামদুলিল্লাহ সবার চেষ্টায় এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি।’
‘জার্সির কাজসহ সবকিছু নতুন করে করাটা কঠিন ছিল। এজন্য আমি সেন্টু ভাইয়ের কোম্পানি স্পোর্টস এন্ড স্পোর্টসকে ধন্যবাদ দিতে চাই। বিশেষ করে আরও একজনের নাম নিতে চায় মামুন ভাই। উনি দ্রুততম সময়ে এসব করে দিয়েছেন সুন্দরভাবে। মানে ওভার ফোনে ডিজাইনিং এবং সবকিছু করা একদিনের মধ্যেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটা ভালো মানুষ হওয়া, আমার সবসময় টার্গেট থাকে যেন একটা ভালো মানুষ হতে পারি। পাশাপাশি কাজটা যদি ভালোভাবে করতে পারি আরকি। সবার চিন্তা-ভাবনায় ঢুকে যেন তাদের কমফোর্ট জোনটা দিতে পারি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা, আমি আমার চেষ্টার কমতি রাখি না।’
মিজানুর রহমান বাবুল (প্রধান কোচ)
‘(হ্যাটট্রিক শিরোপা জয় নিয়ে) একজন কোচ হিসেবে যতবারই আসলে ফাইনাল খেলতে পারবেন ততবারই কিন্তু ভালো লাগাটা বেশি থাকবে। চট্টগ্রাম দলে কাজ করে ফাইনালে তুলতে পেরেছি এটা নিজের কাছেও আনন্দের বিষয়। যে পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছিলাম সেটা থেকে এই পর্যায়ে আসতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। নামের পাশে আসলে হ্যাটট্রিক শিরোপা যোগ হবে কি না এটা সময় বলবে। নসিবে থাকলে হবে আমরা আমাদের চেষ্টার কমতি রাখব না। সব কিছুর ক্রেডিট আসলে ক্রিকেটারদের, তারা ভালো খেলেছে বিধায় এখন কথা বলতে পারছি।’

‘আমার কাজটা ছিল– ছেলেদের এক সুঁতোয় গাঁথা। সবার মধ্যে একটা বন্ডিং তৈরি করে দেওয়া, সেটা আমি শুরু থেকে চেষ্টা করে গিয়েছি। এই দলটাতে যে ছেলেরা আছে সবাই আমার পরিচিত, তাদের ছোটবেলা থেকেই চিনি, একসঙ্গে কাজ করেছি। পরিচিত হওয়ার কারণে একসঙ্গে মিশতে সময় লাগেনি। যারা বিদেশি আছে এরা বড় নামের নয়, কিন্তু কার্যকরী। দলের জন্য ক্রিকেটারদের ফিলিংস তাদের বুঝিয়েছি। যেন শেষ পর্যন্ত দলের জন্য লড়ে যায়।’
‘শেখ মেহেদীর গেম সেন্সটা অনেক ভালো। এই প্রশংসা করতেই হবে, যদিও সে মাঠের মধ্যে একটু অ্যাগ্রেসিভ থাকে। সব মানুষ তো একরকম হয় না, একেকজন একেক রকম। তার এই জিনিসটাও ভালো লাগে, ভবিষ্যতে আরও শিখবে এই জায়গাগুলো আরও পরিষ্কার হবে। কখন কাকে বলে দিতে হবে এটা সে ভালো জানে, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত সে নিতে পারে। এই মুহূর্তে আমরা নিজেদের নিয়ে চিন্তা করতে চাই। অন্য দলকে নিয়ে চিন্তা করি না, কে জিতবে কে হারবে এটা তো বলা যাবে না। যে–ই আসুক আমরা আমাদের সেরা ক্রিকেটটা খেলব। (দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে মুখোমুখি সিলেট-রাজশাহী) দুই দলের জন্য আসলে শুভকামনা থাকল।’
এসএইচ/এএইচএস
