লতিফের প্রয়াণে ‘কাঁদছে’ বিকেএসপি

ক্রীড়াঙ্গনে চলছে একের পর এক শোক। গত পরশু সকালে বিশিষ্ট ভলিবল খেলোয়াড়, কোচ,সংগঠক, ক্রীড়া লেখক মোস্তফা কামালের মৃত্যু খবর দিয়ে যা শুরু হয়েছিল। গতকাল সকালে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন কিংবদন্তী গোলরক্ষক রণজিৎ দাস। আজ বিকেলে ইন্তেকাল করেছেন বিকেএসপির সাবেক মহাপরিচালক ও বর্তমানে বক্সিং ফেডারেশনের সভাপতি লে কর্ণেল আব্দুল লতিফ খান।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু। কর্ণেল হান্নান ছিলেন বিকেএসপির প্রথম মহাপরিচালক। হান্নানের স্থলাষিভিক্ত হয়েছিলেন লতিফ। বছর পাঁচেকের কম সময় বিকেএসপি প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় তার অবদান, পরবর্তী সময়ে বিকেএসপিতে সম্পৃক্ততা, আন্তরকিতা এখনো সবার কাছে সমানভাবে সমাদৃত।
বিকেএসপির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রিন্সিপাল রাফি ইমাম। লতিফের পুরো সময় তিনি বিকেএসপির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখা রাফি লতিফের স্মৃতিচারণ করলেন এভাবে, 'খুবই শৃঙ্খলা ও নীতিবান মানুষ। ঢাকা থেকে তিনি বিকেএসপি আসতেন, কখনো বিলম্ব হয়নি। বিকেএসপি’র অনেক মৌলিক নিয়ম-কানুনই তার সময় করা। শিক্ষার্থীদের মান্নোয়নের জন্য সব সময় চিন্তা করতেন। প্রশাসক হিসেবে যেমন অসাধারণ তেমনি মানুষ হিসেবেও।'
বিসিবির বর্তমান পরিচালক নাজমুল আবেদীন ফাহিমের পেশাগত ক্যারিয়ার শুরু বিকেএসপি থেকেই। ফাহিম যখন বিকেএসপির ক্রিকেট কোচ তখন লতিফ প্রতিষ্ঠান প্রধান। লতিফের প্রয়াণে তিনি বলেন, 'বিকেএসপিতে অনেক ডিজিই এসেছেন। বিকেএসপি একেবারে মনেপ্রাণে ধারণ করেছেন এদের মধ্যে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবেন তিনি। বিকেএসপি ছেড়েছেন তিন যুগ আগে। এখনো কোনো অনুষ্ঠান হলে তিনি সবার আগে হাজির থাকতেন। বিকেএসপির শুরুর দিকে যারা কোচ ছিলেন হকির কাওসার ভাই, নুরুল ভাই সহ ফুটবল, হকি, ক্রিকেটের সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবে তার হাতেই তারা সবাই গড়া। প্রায় আশি বছর বয়সে তার প্রয়াণেও সবাই এতটাই ব্যথি এটাই প্রমাণ করে তিনি কত প্রিয় এবং কত নিবেদিত একজন ছিলেন।'
জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হাসান আল মামুন বিকেএসপির সাবেক শিক্ষার্থী। বিকেএসপির সাবেক মহাপরিচালকের প্রয়াণে তিনি যারপরনাই ব্যথিত, ‘বিকেএসপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেছে তার সময় থেকেই। ডানা কাপে বিকেএসপি দল পাঠানোর কৃত্তিত্ব তারই।'
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ডেনমার্কের বয়স ভিত্তিক টুর্নামেন্টে বিকেএসপি ফুটবল দল চ্যাম্পিয়ন হয়। এটি বাংলাদেশের ফুটবল ও বিকেএসপির বড় অর্জন হলেও ক্রীড়াঙ্গনে ঐ টুর্নামেন্ট আলোচিত বেশি বয়সের খেলোয়াড় খেলানোর। ঐ দলে খেলা হাসান আল মামুন বলেন, ‘২-৩ জন বেশি বয়সের ছিল, সেটা ঠিক কিন্তু ঐ দলে খেলা আমি, সোহেল আল মাসুম পরবর্তীতে জাতীয় দলে খেলেছি। সেই সময় বিকেএসপির তরুণ ফুটবলাররা ডেনমার্ক গিয়েছে। সেখানে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় দেশের ও বিকেএসপির নাম বৃদ্ধি হয়েছে। ঐ চ্যাম্পিয়নের জন্য সুইডেনের গোথিয়া কাপে আমন্ত্রণ এসেছিল। এটা স্যারের দূরদৃষ্টির জন্যই সম্ভব হয়েছে।’
জাতীয় হকি দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুর রশীদ বিকেএসপির অন্যতম কিংবদন্তী। তিনি সরাসরি লতিফের মেয়াদকালকে বিকেএসপির সোনালী সময় বললেন, ‘স্যারের পুরো সময়ই আমাদের ক্যাম্পাস জীবন। খেলোয়াড়, কোচ হিসেবে অনেক দিনই বিকেএসপিতে কেটেছে। আমার দৃষ্টিতে স্যারের সময়ই বিকেএসপির সেরা সময়।’
সামরিক অফিসার লতিফ বিকেএসপি দায়িত্ব পালন শেষে ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে ছিলেন নানাভাবে। ২০০০ সাল পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয় ক্রিকেট দলের ম্যানেজার ছিলেন। ২০০৭ সালে বিসিবি অর্ন্তবর্তীকালীন বোর্ডে সদস্য ছিলেন। ঐ সময় তিনি গেম ডেভলপমেন্টের চেয়ারম্যান হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে ক্রিকেটারদের কমান্ডো ট্রেনিংয়ে পাঠান। পিঠে ওজন ভর্তি ব্যাগ নিয়ে উচু পাহাড়ে উঠছেন আশরাফুলরা এই ছবি ক্রীড়াঙ্গনে এখনো বেশ স্মরণীয়।
সামরিক বাহিনীতে থাকাবস্থায় তিনি বক্সিং, টেনিস সহ নানা খেলা খেলতেন। গত বছর বিভিন্ন ফেডারেশন পুর্নগঠনের পর তাকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বক্সিং ফেডারেশনের সভাপতি মনোনয়ন দেয়। অসুস্থ শরীরেও তিনি ফেডারেশনে বিভিন্ন খেলায় এবং সভায় আসতেন। বেশ কয়েক বছর ধরেই শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। বছর খানেক আগে একমাত্র ছেলের আকস্মিক প্রয়াণে মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। এরপর হাসপাতালই হয়ে উঠে তার দ্বিতীয় বাসা। ঢাকায় এক হাসপাতালে সপ্তাহ খানেক চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তার মেয়ে দেশের বাইরে থাকেন। দেশে পৌঁছানোর পর আগামী পরশু দিন বারিধারা ডিওএইচএস মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। বক্সিং ফেডারেশনের পক্ষ থেকে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় স্টেডিয়ামে ক্রীড়াঙ্গনে মরদেহ এনে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর চেষ্টা চলছে। ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব লে কর্ণেল আব্দুল লতিফ খান (অব) সামরিক কবরস্থানে চিরশায়িত হবেন।
লতিফের মৃত্যুতে বিসিবি, অলিম্পিক, বক্সিং সহ বিভিন্ন ফেডারেশন, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব শোক প্রকাশ করেছে।
এজেড/এইচজেএস