বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশের অটল অবস্থান, বাহবা দিলেন ইংলিশ ধারাভাষ্যকার

এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দর্শকের ভূমিকায় বাংলাদেশ। এর আগে ২০০৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মেগা ইভেন্টে এই প্রথম তাদের খেলা হচ্ছে না। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ভারত থেকে নিজেদের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিতে বিসিবির দাবি মানেনি আইসিসি। বাংলাদেশের বদলে নেওয়া হয় স্কটল্যান্ডকে। ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকা বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন ইংলিশ ধারাভাষ্যকার নাসের হুসেইন।
বাংলাদেশ অবশ্য হুট করেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেনি। শুরুটা হয়েছিল মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে। কলকাতা নাইট রাইডার্সকে তাকে ৯.২০ কোটি রুপিতে দলে নেওয়ার পর ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের চাপের মুখে বিসিসিআই নির্দেশনা দেয় মুস্তাফিজকে বাদ দিতে। সেটাই অনুসরণ করে কলকাতা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পুরো বাংলাদেশ দল, কোচিং স্টাফ, সমর্থক ও সাংবাদিকদের ভারতে অবস্থানকালে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যম স্কাই ক্রিকেটের পডকাস্ট অনুষ্ঠানে আরেক সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল আথারটনের সঙ্গে আলোচনা বলেছেন নাসের হুসেইন। সাবেক এই ইংলিশ ক্রিকেটার বলেন, ‘বাংলাদেশ যেভাবে নিজেদের অবস্থানে অটল ছিল আমার বেশ ভালো লেগেছে। তারা নিজেদের ক্রিকেটার ফিজের (মুস্তাফিজ) পাশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এই সঙ্কট কোত্থেকে শুরু হয়েছে তাও মনে রাখতে হবে। (মুস্তাফিজুর) রহমান কলকাতার হয়ে আইপিএল খেলছে বা সে স্কোয়াডে ছিল এবং ব্যাখ্যাতীতভাবে হুট করে বিসিসিআই বলল, বাংলাদেশ ও ভারতের চলমান পরিস্থিতির কারণে তাকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত থেকেই বিষয়টি এতদূর এলো।’

৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। যার সপ্তাহখানেক আগে পাকিস্তান জানিয়েছে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি খেলবে না তারা। প্রথমে এর কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে না জানালেও, গতকাল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ বলেছেন, ‘আমরা টি-২০ বিশ্বকাপ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছি যে, আমরা ভারতের বিপক্ষে খেলব না। কারণ খেলার মাঠে কোনো রাজনীতি হওয়া উচিত নয়। আমরা খুবই বিবেচনামূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আমাদের সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের পাশে থাকা উচিত। আমি মনে করি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কট ছিল উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।’
পাকিস্তানের সামনে এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না বলে দাবি নাসির হুসেইনের। তিনি বলেন, ‘একইভাবে পাকিস্তানকেও ভালো লেগেছে, যদিও জানি এটা রাজনৈতিক, তবু ভালো লেগেছে বাংলাদেশের পাশে থেকেছে পাকিস্তান। কোনো একটা পর্যায়ে কাউকে তো বলতে হবে, “যথেষ্ট রাজনীতি হয়েছে, এখন কি আমরা ক্রিকেট খেলায় ফিরতে পারি?” এমন পরিস্থিতি সত্যিই খুব হতাশাজনক। ক্রীড়া, ক্রিকেট এবং রাজনীতি সবসময়ই পারস্পারিক জড়িয়ে। ক্রীড়া ও রাজনীতির মধ্যে একটা যোগসূত্র সবসময়ই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই যোগসূত্র ক্রমে বাড়ছে এবং বাড়ছেই।’
ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটেও রাজনীতির প্রভাব অবশ্য আরও আগে থেকেই দেখা যাচ্ছিল। সর্বশেষ এশিয়া কাপে পিসিবি ও এসিসি (এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল) সভাপতি মহসিন নাকভির কাছ থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত। এর আগে হাত না মেলানোর মতো ক্রিকেটের স্পিরিট ভাঙার নজিরও দেখা যায়। সেসব প্রসঙ্গ টেনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই ইংলিশ ধারাভাষ্যকার, ‘আগে খেলা ও রাজনৈতিক অবস্থান ছিল ব্যতিক্রম, কিন্তু এখন এটাই যেন স্বাভাবিক। স্রেফ রাজনীতি ও রাজনীতিবিদরাই নন, এখন ক্রিকেটাররাও…(একই কাজ করছে)। গত দুয়েক বছরে ক্রিকেটারদের যেভাবে দেখেছি, সত্যিই হতাশাজনক। হাত মেলাচ্ছে না, ট্রফি নিচ্ছে না। আগে বিভিন্ন দেশ ও জাতিকে একতাবদ্ধ করত ক্রিকেট, এখন এটি মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করছে।’

এর আগে ভারতকে নিরাপত্তাজনিত কারণে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আইসিসি অনুমতি দিলেও, বাংলাদেশের বেলায় ভিন্ন রায় দিয়েছে। এমন দ্বিচারি সিদ্ধান্ত নিয়ে নাসের হুসেইন বলেন,‘আপনি বাংলাদেশকে যেভাবে দেখবেন, পাকিস্তান এবং ভারতকেও একইভাবে দেখতে হবে। এখন ভারতীয় সমর্থকেরা চিৎকার দিয়ে বলতে পারে, ‘আমাদের টাকা আছে..।” কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বের বিষয়টিও জড়িত। যদি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকেন, তাদের ক্রিকেট হ্রাস পাবে। ফলে অতীতে ভারত-পাকিস্তানের যেসব দারুণ লড়াই আমরা দেখেছি বা ভারত-বাংলাদেশের, তা একতরফা হয়ে ওঠে, এখনও সেটাই হচ্ছে।’
এএইচএস