একসময় রাস্তায় ফল বিক্রি করা হায়দার এখন জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে

পাকিস্তানের পাঞ্জাবের আজমত শাহ নামক এক ছোট গ্রাম, সেখানেই এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হায়দার আলির। তবে তার স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। তিনি সর্বোচ্চ স্তরে পাকিস্তানের হয়ে খেলতে চেয়েছিলেন। এই চাওয়া এতই তীব্র ছিল যে, লাহোরে চলে আসেন এবং জীবনধারণের জন্য রাতে ওয়েটারের কাজসহ বিভিন্ন ছোটখাটো কাজ করেন। শৈশবে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর হায়দারকে তার চাচা দত্তক নিয়েছিলেন। একজন বাঁ-হাতি ফিঙ্গার স্পিনার হিসেবে হায়দার পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে জায়গা করে নেন এবং ২০১৮ সালে তার অভিষেক হয়। কিন্তু পাকিস্তানের হয়ে খেলার স্বপ্ন সেখানেই থমকে যায়।
ইএসপিএনক্রিকইনফো-র সঙ্গে সাক্ষাতে হায়দার বললেন, ‘আমি পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফর্ম করেছি কিন্তু কী ঘটেছিল তা আর বলতে চাই না। এটাই জীবন, এমনটা হতেই পারে এবং আমি একজন ইতিবাচক মানুষ।’
হায়দার লাহোরেই থেকে যান এবং এমনকি ফলও বিক্রি করেন। কারণ কোভিড-১৯ মহামারি তার আর্থিক সংকটকে আরও তীব্র করেছিল। পরে নিজের ও পরিবারের উন্নত আর্থিক ভবিষ্যতের জন্য ২০২২ সালে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি জমান। চারপাশের অস্থিরতা সত্ত্বেও ক্রিকেটের প্রতি হায়দারের আবেগ মিলিয়ে যায়নি। তিনি এক নতুন স্বপ্নের পিছু ছুটতে শুরু করেন: সংযুক্ত আরব আমিরাতের জার্সিতে খেলা।
আইসিসির তিন বছরের বসবাসের নিয়ম পূরণ করার পর ২০২৫ সালে হায়দার আমিরাতের হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন। নজর কাড়তে বেশি সময় নেননি। শারজাহতে বাংলাদেশের বিপক্ষে তার অভিষেক সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে তার বোলিং ফিগার ৪-১-৭-৩। তার ওই পারফরম্যান্সে কোনো টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে আমিরাত প্রথম দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জেতে। একই বছর তিনি দুবাই ক্যাপিটালসের হয়ে আইএলটি২০। ৩১ বছর বয়সী হায়দার এখন তার প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এবং বিশ্বমঞ্চে বাঁ হাতের খেলা দেখাতে মুখিয়ে আছেন।

হায়দার বললেন, ‘এটি ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চ এবং বিশ্বকাপ খেলা প্রতিটি ক্রিকেটারের স্বপ্ন। আমি এমন অনেক খেলোয়াড়কে দেখেছি যারা দশ বছর ধরে তাদের দেশের হয়ে খেললেও কখনো বিশ্বকাপে খেলেননি। আমরা যদি তারকা হতে চাই এবং আমাদের দেশের জন্য বিশেষ কিছু করতে চাই, তবে আমাদের মাঠে নেমে পারফর্ম করতে হবে। এটি ভারতেই হচ্ছে, যেখানে মানুষ খেলাটিকে অনেক বেশি ভালোবাসে।’
নিউজিল্যান্ডের হয়ে ডানহাতি জুটি ফিন অ্যালেন ও টিম সেইফার্ট ব্যাটিংয়ে ওপেন করতে আসবেন। তাই পাওয়ার-প্লেতে হায়দারের নতুন বল হাতে নেওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জিং ভূমিকা তিনি আইএলটি২০ তে পালন করে অভ্যস্ত। প্রথম ছয় ওভারে তার ৫.৯৩ ইকোনমি রেট আইএলটি২০ তে ন্যূনতম ২০ ইনিংস খেলা সকল বোলারদের মধ্যে সেরা। তিনি বিশ্বকাপে তার পাওয়ার প্লে দক্ষতা দেখানোর জন্য উন্মুখ।
তিনি বললেন, ‘আমি আইএলটি২০, আবুধাবি টি১০ ও আমাদের ইউএইর ঘরোয়া ক্রিকেটেও পাওয়ার প্লেতে বোলিং করেছি। আমি পাওয়ার প্লেতে বোলিং করতে ভালোবাসি এবং অস্ট্রেলিয়া, ভারত বা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলছি কি না তা নিয়ে চাপ নিই না। আমি শুধু বলের দিকে মনোযোগ দিই, ইতিবাচক চিন্তা করি এবং দলের জন্য আমার কী করা দরকার তা বোঝার চেষ্টা করি।’
দুবাইয়ে ডেভিড ওয়ার্নার ও রভম্যান পাওয়েলের মতো টি-২০ তারকাদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করার অভিজ্ঞতা হায়দারকে শীর্ষ স্তরে টিকে থাকার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘আইএলটি-২০ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আমাদের এমিরেটস ক্রিকেট বোর্ডকে অনেক ধন্যবাদ এবং বিশেষ করে এটি স্থানীয় ছেলেদের অনেক সাহায্য করে। আমি মনে করি আমি একমাত্র স্থানীয় খেলোয়াড় যে গত তিন বছরে সব ম্যাচ খেলেছি। আমি আইএলটি২০ তে ভালো পারফর্ম করেছি এবং আমাদের দলে অনেক তারকা ছিলেন। প্রথম বছর যখন আমি স্কোয়াডে ছিলাম, আমি কিছুটা নার্ভাস ছিলাম— যেমন আপনার চারপাশে সুপারস্টাররা আছেন।’
ওয়ার্নারের প্রশংসা পেয়ে উচ্ছ্বসিত হায়দার, ‘কিন্তু যখন আমি শারজাহর বিপক্ষে আমার প্রথম ম্যাচ খেলি, আমি সত্যিই ভালো বোলিং করি এবং ডেভি (ওয়ার্নার) আমার কাছে এসে বলেন: ‘তুমিই সেরা এবং তোমার মতো বাঁ-হাতি স্পিনার আমি আগে কখনো দেখিনি’।”
দলের ইংলিশ অধিনায়ককে নিয়ে তার কথা, ‘(স্যাম) বিলিংস, যিনি আমাদের শিরোপা জেতার সময় অধিনায়ক ছিলেন, তিনিও আমাকে অনেক আত্মবিশ্বাস দেন এবং তিনি এখন আমার একজন বন্ধু। এই লিগগুলোতে খেললে এবং এই খেলোয়াড়দের সাথে ড্রেসিংরুম শেয়ার করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।’
হায়দার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তার তৃতীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশকে কুপোকাত করেন। শিশির থাকা সত্ত্বেও হায়দার স্টাম্প বরাবর আক্রমণ করেন এবং নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে দাপট দেখান। তার ইনওয়ার্ড অ্যাঙ্গেল ও ড্রিফট দিয়ে ডানহাতি ব্যাটারদের চাপে ফেলেন।
— UAE Cricket Official (@EmiratesCricket) May 21, 2025
সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে হায়দারের চোখেমুখে উচ্ছ্বাস, ‘বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই স্পেলটি আমার জন্য এবং আমার ক্যারিয়ারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ সেটি ছিল সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ। আমি আমাদের প্রধান কোচ লাল (লালচাঁদ রাজপুত) স্যারের সঙ্গে কথা বলছিলাম এবং তাকে বলেছিলাম যে আমি এই দেশটির জন্য বিশেষ কিছু করতে চাই কারণ এই দেশ আমাকে অনেক কিছু ও সম্মান দিয়েছে। আমি ইউএইর ব্যাজের জন্য খেলি, যা আমাকে সবকিছু দিয়েছে। আমার প্রধান কোচ আমার ওপর অনেক বিশ্বাস রেখেছেন। আমি পাওয়ার প্লেতে বোলিং করেছি এবং তিনটি উইকেট নিয়েছি। হ্যাঁ, একজন বাঁ হাতি স্পিনার হিসেবে এটি আমার জন্য একটি স্বপ্নের স্পেল ছিল।’
আমিরাতের সাবেক বাঁ হাতি স্পিনার ও আইএলটি২০ তে ক্যাপিটালসের স্কাউটিং নেটওয়ার্কের একজন আহমেদ রাজা। তার ও আমিরাত দলের অ্যানালিস্ট মনপ্রীত সিধুর পরামর্শ মেনে চলেন হায়দার, ‘আহমেদ রাজা আমার ভাইয়ের মতো এবং আমি আইএলটি২০ তে তার সাথে অনেক কাজ করেছি।’
হায়দার বলে চললেন, ‘আমি মনপ্রীত স্যারের সাথেও আমার খেলা নিয়ে কথা বলি। তিনি বিভিন্ন কন্ডিশন খুব ভালো বোঝেন। তিনি ভারত ও ইংল্যান্ডের দলগুলোর সাথে কাজ করেছেন। আমি সবসময় আমার বোলিং নিয়ে অনেক প্রশ্ন করে তাদের বিরক্ত করতে থাকব (হাসি)। অবশ্যই লাল স্যার দলের প্রধান ব্যক্তি এবং তিনি এমন খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করতে ভালোবাসেন যারা লড়াকু। আমিরাত দলে অনেক লড়াকু খেলোয়াড় আছে।’
হায়দার নিশ্চিতভাবেই সেই লড়াকুদের একজন। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যিনি কখনো হাল ছাড়েননি এবং তার জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছানোর জন্য লড়াই চালিয়ে গেছেন।
এফএইচএম/