‘বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট সঠিক পথেই এগোচ্ছে’

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) ২০০৭ সালের পর প্রথম কোনো নারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন রুবাবা দৌলা। দেশের অন্যতম প্রখ্যাত এই কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব এখন নারী ক্রিকেটের চেয়ারম্যান পদে নিয়োজিত আছেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে মেয়েদের বিপিএল আয়োজন, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ নানা পরিকল্পনা রয়েছে রুবাবার।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে বিসিবির দ্বিতীয় নারী পরিচালক রুবাবা দৌলা কথা বলেছেন ঢাকা পোস্টের ক্রীড়া প্রতিবেদক সাকিব শাওনের সঙ্গে। যেখানে নারী ক্রিকেটের নানা চ্যালেঞ্জ, এইচপি ইউনিট, আন্তর্জাতিক সিরিজ বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
বিসিবির দ্বিতীয় নারী পরিচালক হিসেবে আপনি মেয়েদের ক্রিকেটের দায়িত্ব পেয়েছেন…
রুবাবা দৌলা : এটা আমার জন্য খুবই গৌরবের বিষয়। আমি এখন ক্রিকেটে কনট্রিবিউট করতে পারছি। বিসিবির পরিচালক হিসেবে দেশের ক্রিকেটীয় উন্নয়নে নারী বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে সুযোগ পাচ্ছি। নারী বিভাগ যাতে আরও উন্নত হয়, সেটা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। আমাকে যে দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছে সেটার জন্য আমি খুবই আনন্দিত, একইসঙ্গে গর্বিত।
‘বিশ্বকাপের (জুন) আগে নারী বিপিএলটা সম্পন্ন হয়ে যাবে। এটি সফলভাবে করতে পারলে খুব ভালো হবে আমাদের ক্রিকেটারদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। এখানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদেরও খেলার সুযোগ থাকবে। যা আমাদের ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা বাড়াতেও সহায়ক হবে আশা করি।’
প্রথমবার সরাসরি ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হলেন, এই দায়িত্ব উপভোগ করছেন নাকি চ্যালেঞ্জ বেশি?
রুবাবা দৌলা : আমি অনেক আগে থেকেই ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। যখন আমি গ্রামীণফোনের মার্কেটিং প্রধান ছিলাম, তখন আমরা ক্রিকেটকে স্পন্সর (পৃষ্ঠপোষকতা) করতাম, সেই সময়েও কিন্তু অনেক কাজ করেছি ক্রিকেটের সঙ্গে। মিরপুরে আমাদের যে ক্রিকেট একাডেমিটা আছে, সেটাও কিন্তু গ্রামীণফোন থেকে স্পন্সর করে ইন-অপারেট করেছিলাম। এখন যেহেতু বোর্ডে আছি সেদিক থেকে এখন আরও বেশি কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি।
তিন মাস হলো কাজ করছি। এই সময়ে কিছু কাজ করার সুযোগ হয়েছে ইতোমধ্যে। সর্বশেষ বিশ্বকাপের কোয়ালিফাই রাউন্ডে মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, ‘এ’ দল থাইল্যান্ডে (রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপ) খেলছে এখন। সামনে আমরা কিছু লোকাল সিরিজও করতে চাচ্ছি। এরপর মেয়েদের বিপিএল করব ইনশাআল্লাহ। সবমিলিয়ে নারী ক্রিকেট ভালো দিকেই এগোচ্ছে।
আপনার অধীনেই প্রথম নারী বিপিএল মাঠে গড়াতে যাচ্ছে, বড় সফলতা নিশ্চয়ই?
রুবাবা দৌলা : অবশ্যই এটা আমার জন্য বড় কিছু। তবে আমি শুধু আমার কথা চিন্তা করছি না, আমাদের পুরো নারী ক্রিকেটের কথা ভাবছি। মেয়েদেরকে যাতে আরও বেশি উৎসাহ দিতে পারি। আমরা চাচ্ছি আরও মেয়েরা যেন এগিয়ে আসে ক্রীড়াঙ্গনে এবং বিশেষত ক্রিকেটে। আমরা যদি তাদের জন্য সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাহলে পারফরম্যান্স আরও ভালো হবে। বিপিএলের মতো টুর্নামেন্ট যদি করতে পারি ভালো করবে তারা। ইনশাআল্লাহ যদি সফলভাবে টুর্নামেন্টটা করতে পারি একে বলার মতো একটা উদ্যোগ বলা যেতে পারে।
পুরুষদের বিপিএলে এখন পর্যন্ত ১২টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দেশের জনপ্রিয় এই ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টটি এখনও পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত হতে পারেনি। ফলে নারী বিপিএলে স্বাভাবিকভাবে চ্যালেঞ্জটা আরও বেশি থাকতে পারে। নারী বিপিএল ঘিরে সেই চ্যালেঞ্জটা কেমন?
রুবাবা দৌলা : সামনে (জুন-জুলাই) নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ রয়েছে। তার আগে কিন্তু বিপিএলটা সম্পন্ন হয়ে যাবে। এটা সফলভাবে করতে পারলে খুব ভালো হবে তাদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। এখানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদেরও সুযোগ থাকবে বাইরে থেকে। তাতে করে আমাদের ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতাও বাড়বে আশা করি। চ্যালেঞ্জ থাকলেও এটা তাদের জন্যই ভালো হবে।
টুর্নামেন্টের জন্য পৃষ্ঠপোষক বা ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক কীভাবে মেটানো হবে?
রুবাবা দৌলা : টুর্নামেন্টটি বিদেশি ক্রিকেটারদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। যদি ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা চায় আরকি। মূলত দলের মালিকদের চাওয়া অনুযায়ী হবে। (স্পন্সর বা পেমেন্ট নিয়ে) যখন সিদ্ধান্ত নেব, তখন সব বিষয়ে বিস্তারিত জানাব। অবশ্য ছেলেদের বিপিএলে যেভাবে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি দল কেনে, মেয়েদের বিপিএলেও একইভাবে হবে।
খুব সহজেই নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা পেয়েছে বাংলাদেশ দল…
রুবাবা দৌলা : এটা (ভালো পারফরম্যান্স) আসলে হঠাৎ করেই হয়নি। অনেকদিন ধরে তারা প্রস্তুতি নিয়েছে, ট্রেনিং করেছে। এ ছাড়া তাদের জন্য দক্ষ কোচ, ট্রেনার এবং ফিজিওরা আছেন, ফলাফলেও সবার অবদান অনেক। আমার কাজ হচ্ছে যেসব সুযোগ-সুবিধা দরকার সেটা দেওয়া, পাশাপাশি কী কী পদক্ষেপ আরও বাড়ানো যায় তা দেখা।
জাতীয় দলের কোন ক্রিকেটারের খেলা আপনার ভালো লাগে?
রুবাবা দৌলা : আমি যখন একটা দায়িত্বে আছি আমার কাছে কিন্তু সব ক্রিকেটারই সমান। সব ক্রিকেটারকে সমান চোখে দেখা উচিত। তবে আমাদের বেশ কিছু বিশ্বমানের ক্রিকেটার রয়েছে। মেয়েদের দলেও যেমন আছে, ছেলেদের দলেও রয়েছে। আমি সবাইকে নিয়ে অনেক বেশি গর্বিত। যে কারণে আলাদা করে কারও নাম বলতে চাই না, সবাই আমার জন্য সমান। আমরা আরও মেয়ে চাই নারী ক্রিকেটের জন্য।
নারী ক্রিকেটারদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে কোনো পরিকল্পনা আছে?
রুবাবা দৌলা : হ্যাঁ অবশ্যই, এবার এটা নিয়ে আমার কাজের সুযোগ রয়েছে। আমরা এগুলো নিয়ে স্ট্র্যাটেজিকভাবে বেশকিছু চিন্তা-ভাবনা করেছি। আপনারা দেখেছেন অলরেডি কিছু পরিবর্তন গত বছর বেতনের ক্ষেত্রে হয়েছে, সামনে আরও হবে।
নারীদের জন্য আলাদা একটা একাডেমি ভবন তৈরি সম্ভব কি না…
রুবাবা দৌলা : এ ধরনের বড় যে সিদ্ধান্তগুলো রয়েছে, সেগুলো আমার একার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে চেষ্টা করব এটা নিয়ে তাদের জন্য কিছু করার। তবে আমি এখন এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না, যদি কিছু করি অবশ্যই জানাব।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খুব কম ম্যাচ খেলেন নারীরা, সেটা কীভাবে বাড়ানো যায়?
রুবাবা দৌলা : আমাদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে মোটামুটি খেলা রয়েছে, আন্তর্জাতিক সিরিজ বা ঘরোয়া। এরপরও পুরো বছরজুড়ে যাতে আমরা এরকম ম্যাচের মধ্যে থাকি সেরকম পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। ইতোমধ্যে হোম সিরিজ নির্ধারিত হয়েছে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে, এরপর বিপিএল রয়েছে। ত্রিদেশীয় একটা সিরিজ আয়োজনের জন্যও চেষ্টা করছি।
নারী ক্রিকেটের এইচপি বিভাগ হবে বলে জানা গেছে। সেটি কবে নাগাদ শুরু হবে?
রুবাবা দৌলা : হাই-পারফর্ম্যান্সের জন্য অলরেডি প্ল্যান হয়েছে। আমাদের এইচপির যে কমিটি রয়েছে, তাদের অধীনেই এটা হবে। এমন না যে এটা একদম আলাদা বিভাগ। ছেলেদের যেমন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, মেয়েদের ক্ষেত্রেও একইভাবে হবে আরকি। যোগ্যদের আমরা এইচপিতে জায়গা করে দেব।
আপনি যখন মেয়েদের দায়িত্ব নিলেন এরপরই একটা ঝড় গিয়েছিল নারী ক্রিকেটে, কিছুটা কঠিন মনে হচ্ছিল কি না তখন…
রুবাবা দৌলা : একদমই না, আমার জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ ছিল না। নারী বিভাগের দায়িত্বে আসা আমার জন্য একটা সুযোগ ছিল প্রথমেই বলেছি। খুব সুন্দর করেই এখন চলছে, আমাদের সভাপতির কথা বলতে পারি। এ ছাড়া যারা পরিচালক রয়েছেন, সবাই অনেক সাপোর্ট দিচ্ছেন। নারী ক্রিকেটকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবার সমর্থন রয়েছে।
এসএইচ/এএইচএস