যে কৌশলে ভারতকে হারাল দক্ষিণ আফ্রিকা

ধারণা করা হচ্ছিল, নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে নীল ঢেউ উঠবে। কিন্তু সবুজ দেয়ালে আটকে গেল সেই ঢেউ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের ১২ ম্যাচের জয়যাত্রা থামিয়ে সুপার এইটে দারুণ শুরু করল দক্ষিণ আফ্রিকা। গতবারের ফাইনালে অল্পের জন্য জয়বঞ্চিত প্রোটিয়ারা কন্ডিশন ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে এবং তার সদ্ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছে।
ডেভিড মিলারের ৬৩ রানের ইনিংস দক্ষিণ আফ্রিকার ভিত গড়ে দিয়েছিল সত্যি। সেই ভিত আরও শক্ত করে তুলেছিল বোলিং পারফরম্যান্স। লুঙ্গি এনগিডি ও মার্কো ইয়ানসেনের নৈপুণ্যের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে অদম্য ব্যাটিং লাইনআপ খেই হারায়।
প্রোটিয়াদের ট্যাকটিক্যাল এই জায়গায় নেতৃত্ব দিয়েছেন এনগিডি। কোনো উইকেট তিনি পাননি, তবে তার বোলিং ফিগার ছিল চমৎকার। চার ওভারে ১৫ রান দেন। তার বোলিং যেন ‘স্লো পয়জন’ হিসেবে কাজ করেছে, যা ভারতীয় দলকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে দিয়েছে। কালো মাটির পিচ সম্পর্কে বোধোদয় হয়েছিল শুরুতেই। তাই তো প্রথাগতভাবে বলে গতি না তুলে অফকাটার ও স্লোয়ার বল বাউন্সারে ভারতীয় ব্যাটারদের নির্বিষ রেখেছিলেন তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকার অস্ত্র স্লোয়ার বল
ভারতীয় ব্যাটাররা কেবল ব্যাটের মাঝখানে বল লাগাতেই হিমশিম খাচ্ছিল না। তাদের জন্য বাউন্ডারি মারাও বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্কোরবোর্ড থমকে পড়ায় ভারতীয় ব্যাটাররা তাদের খেলার ধরন পরিবর্তন করতে এবং বল মারার জন্য নিজেদের শক্তির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছিল। এই কৌশলটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
লুঙ্গি এনগিডি ভারতকে ধীরগতিতে খেলতে বাধ্য করেন। অন্যদিকে মার্কো ইয়ানসেন তার ৬ ফুট ৮ ইঞ্চির দীর্ঘদেহকে বিধ্বংসীভাবে কাজে লাগান। ২২ রানে ৪ উইকেট তুলে নেন তিনি। ‘হেভি লেংথে’ বল করে অসমান বাউন্স আদায় করে নিচ্ছিলেন। উচ্চতার এই সুবিধা তার স্লোয়ার বলগুলোকে বোঝা আরও কঠিন করে তুলেছিল। ভারতীয় ব্যাটাররা সচরাচর যে উচ্চতা থেকে বল আসতে দেখে অভ্যস্ত, তার চেয়ে অনেক বেশি উঁচু ট্র্যাজেক্টরি থেকে বলগুলো আসছিল। তাছাড়া প্রোটিয়াদের ফিল্ডিং সাজানো হয়েছিল নিখুঁতভাবে। মাঠে খুব কম সুযোগই তারা হাতছাড়া করেছে।
এমনকি ভারতীয় কিংবদন্তি রবিচন্দ্রন অশ্বিনও দাবি করেছেন যে, সূর্যকুমার যাদবের দল এই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অপ্রস্তুত অবস্থায় খেলতে নেমেছিল।
‘ভারতকে শিক্ষা দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। দয়া করে প্রস্তুতি ছাড়া খেলতে আসবে না। আমরা প্রস্তুত ছিলাম না কারণ দক্ষিণ আফ্রিকা আমাদের ব্যাটারদের বিরুদ্ধে কেবল স্লোয়ার ডেলিভারিই করে গেছে। সূর্যকুমার যাদব ২২টি বল খেলেছে, যার মধ্যে ১৭-১৮টিই ছিল স্লোয়ার। সবগুলো বলই ছিল ধীরগতির অথবা ফুল-লেংথ, একটিও ব্যাক-অফ-এ-লেংথ ছিল না। প্রাপ্য কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। দক্ষিণ আফ্রিকা বল হাতে অসাধারণ ছিল। ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে তারা চাপের মুখেও ছিল অবিশ্বাস্য। দক্ষিণ আফ্রিকা আর ‘চোকার্স’ নয়। তারা বদলে গেছে।’, বললেন এই সাবেক স্পিনার।
মিডল অর্ডারের অনবদ্য পারফরম্যান্স
দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম চার ওভারের মধ্যেই ২০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, কিন্তু ডেভিড মিলার ও ডেভাল্ড ব্রেভিস অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তারা ওয়াশিংটন সুন্দর ও বরুণ চক্রবর্তীকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে খেলেছে। বিশেষ করে ভারতের ছন্দ নষ্ট করতে বরুণের ওপর চড়াও হন। প্রোটিয়া অধিনায়ক এইডেন মার্করাম ম্যাচ শেষে জানান, এই জুটি মারমুখী ব্যাটিং থেকে বেরিয়ে এসে মাঝের ওভারগুলোতে কেবল দৌড়ে রান নেওয়া এবং ফাঁক খুঁজে বের করার দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। তাদের ৯৭ রানের বিধ্বংসী জুটি ছিল বেশ কার্যকরী।
দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটার ডেভিড মিলার ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, কীভাবে তিনি ও ব্রেভিস ভারতের বরুণ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে কৌশল সাজিয়েছিলেন। ভারতীয় স্পিনার ৪ ওভারে ৪৭ রান দিয়ে ম্যাচ শেষ করেন।
৩৫ বলে ৬৩ রান করা মিলার বলেছেন, ‘আমার মনে হয় বিষয়টি ছিল এমন যে— যদি সে কোনো খারাপ বল করে, তবে আমাদের নিশ্চিতভাবেই সেটাকে সীমানার বাইরে পাঠাতে হবে। তাই আমরা একটু বেশি আগ্রাসী ছিলাম। আজ রাতে বল খুব একটা স্পিন করছিল না, তাই লাইনের ওপর ভরসা রাখা যাচ্ছিল।’
‘একবার যখন আমরা সেটা বুঝতে পারলাম, তখন ভাবলাম— ঠিক আছে, এখন তাকে আক্রমণ করতে হবে। কারণ সে যে দলের বিপক্ষেই খেলুক না কেন, সে একটি বড় হুমকি। তাই এটি অবশ্যই এমন কিছু ছিল যা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছিলাম।’, ম্যাচ শেষে জানান মিলার।
এফএইচএম/