রিচি বেনোর শতবর্ষী ক্লাবে বেড়ে উঠছেন রাসেল আর্নল্ডের ছেলে

চলতি নারী এশিয়ান কাপের অন্যতম ভেন্যু সিডনির প্যারামাটার কমনওয়েলথ ব্যাংক স্টেডিয়াম। আধুনিক ফুটবল স্টেডিয়ামের চত্বরে রয়েছে ক্রিকেট মাঠ। সবুজ গালিচা ও ছোট্ট সাদা রংয়ের কাঠের বেস্টনিতে ঘেরানো মাঠে যে কোনো ক্রীড়াপ্রেমীর চোখ আটকাবেই।
একেবারে ছোট্ট অবয়বের মাঠ হলেও দুই পাশে তিনটি করে নেট প্র্যাকটিসের পিচ। পিচ কাভারের জন্য উন্নত ব্যবস্থা। সব কিছুই ফুটবল স্টেডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে দেখা যায়। আগ্রহ নিয়ে একটু মাঠের ভেতরে গিয়ে জানা গেল, এটি সিডনির সবচেয়ে পুরোনো ক্লাবের একটি। ১৮৪৩ সালে প্যারামাটা ডিস্ট্রিক ক্রিকেট ক্লাবের জন্ম। ক্লাবের জার্সির লোগোতে সুস্পষ্টভাবে সালের বিষয়টি উল্লেখ করা। রিচি বেনো, বেন ডাকেট, শন অ্যাবটের মতো অনেক প্রসিদ্ধ খেলোয়াড় খেলেছেন এই ক্লাবের হয়ে।

৬৫ বছর বয়স্ক অ্যালন এক সময় এই ক্লাবের হয়ে খেলেছেন, এখন কোচিং করান। সিডনির এই সাবেক ক্রিকেটার প্যারামাটা ক্লাবের সঙ্গে জড়িত পাচঁ দশকের বেশি সময় ধরে। ক্লাবের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে বলেন, ‘আমাদের ক্লাবটি রিচি বেনোর পারিবারিক ক্লাব। রিচির বাবা খেলেছেন, রিচি ও তার ভাই জনও খেলেছেন। রিচির ভাইয়ের সঙ্গে আমি নিজেও খেলেছি। রিচির ভাই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তিন টেস্ট খেলেছিলেন।’
রিচি বেনো অস্ট্রেলিয়া তো বটেই, বিশ্ব ক্রিকেটেরই কণ্ঠস্বর। তার সময়ে সেরা ক্রিকেটারদের একজন ছিলেন। পরবর্তীতে ক্রিকেটের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেন। অসংখ্য ক্রিকেট ম্যাচের ধারাভাষ্য দিয়েছেন। নানা ব্যস্ততা ও খ্যাতির মধ্যেও প্যারামাটা ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল রিচির। অ্যালন বলেন, ‘ক্লাবের মাঠ থেকে রিচির বাসা ত্রিশ মিনিটের দূরত্ব৷ সময় পেলেই এসে তরুণদের অনুশীলন ও খেলা দেখতেন। প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন সবাইকে।’
প্যারামাটা ক্লাব সিডনি প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে খেলে, যেখানে ২০টির মতো দল। এই ক্লাবের খেলোয়াড়দের অনেকেই নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য দলে সুযোগ পান। সেখান থেকে অনেকে বয়সভিত্তিক কিংবা সিনিয়র জাতীয় দলেও খেলেছেন। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া অ-১৯ দলে প্যারামাটা ক্লাবের ৩ খেলোয়াড় ডাক পান। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে এক ক্লাবের তিন জনের ডাক পাওয়া অস্ট্রেলিয়ায় বিশেষ ঘটনাই।

অ-১৯ দলে ওপেনার স্যামুয়েল নিতিশ প্যারামাটা ক্লাবেরই খেলোয়াড়। গতকাল বাংলাদেশ ম্যাচ শুরুর আগে বিকেলে বেশ এক নিবিষ্ট মনে প্র্যাকটিস করতে দেখা গেল লঙ্কান বংশোদ্ভুত নিতিশকে। বিকেলের অনুশীলনে লঙ্কানদের পাশাপাশি ভারত,পাকিস্তানের কয়েকজন ক্রিকেটার দেখা গেল প্যারামাটা ক্লাবে।
শ্রীলঙ্কান বংশোদ্ভুত নিতিশ অ-১৯ পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। সদ্য সমাপ্ত অ-১৯ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সবচেয়ে বেশি রানও তার। নিজের এই উত্থানের পেছনে ক্লাবকে কৃতিত্ব দিলেন অনেক, ‘আমার আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া পর্যায়ে সাফল্যের প্রায় পুরোটাই ক্লাবের জন্য। কোচিং স্টাফ, ফ্যাসিলিটি সব কিছুই দারুণ। এই ক্লাবে সব খেলোয়াড়-কোচের সম্পর্ক আন্তরিক। সকল খেলোয়াড়দের মধ্যেও হৃদ্যতা রয়েছে যা অন্য অনেক ক্লাবেই নেই।’
নিতিশের বাবা লঙ্কান তারকা ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় ছিলেন। প্যারামাটা ক্লাবে খেলেন লঙ্কান সাবেক তারকা ক্রিকেটার রাসেল আর্নল্ডের ছেলে আকাশ আর্নল্ড। বাবার মতোই তিনি বাঁ হাতে ব্যাট ও ডান হাতে বল করেন।
শ্রীলঙ্কার সাবেক ক্রিকেটারদের অনেকেই অস্ট্রেলিয়া এসে থিতু হন পরবর্তী জীবনে। রাসেল আর্নল্ডের ছেলে সিডনিতেই বসবাস করেন। ধারাভাষ্য ও ব্যস্ততা না থাকলে রাসেলও সিডনি আসেন। প্যারামাটায় এসে উপকৃত হওয়ার কথা বললেন আকাশ, ‘আমাদের দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের চেয়ে এখানকার সুযোগ সুবিধা অনেক অনেক বেশি। একটি ক্লাবেই একাধিক নেট, অত্যন্ত সুন্দর আউটফিল্ড, উইকেট। যা উপমহাদেশে খুবই কম।’

রাসেলের ছেলের তথ্য অনুযায়ী শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটার সামারারিরা, অস্ট্রেলিয়ান কোচ ডেভ হোয়াটমোর ছাড়াও পাকিস্তানের সাবেক পেসার ওয়াকার ইউনুসও সিডনি থাকেন। তার বাসা থেকে নাকি ৫ মিনিটের দূরত্ব।
আকাশ তার সতীর্থ নিতিশকে নিয়ে বেশ আশাবাদী, ‘নিতিশ কিছু দিনের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলবে। এটা আমি নিশ্চিত। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আমি শ্রীলঙ্কা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার যে কোনো একটি দলের হয়ে খেলতে পারি।’
রাসেল আর্নল্ড সাবেক ক্রিকেটার হলেও এখন ধারাভাষ্যকার হিসেবে বেশি সমাদৃত। সেই সূত্রে বাংলাদেশেও তার বাবার যাতায়াত সম্পর্কে জানা, ‘বাবা তো আপনাদের বিপিএলেও কমেন্ট্রি করে। সময় পেলে বাবার কমেন্ট্রি শুনি। বাবা সব সময় খেলোয়াড়দের সম্পর্কে তথ্য নিতে আগ্রহী থাকেন। এজন্য তিনি খেলা ও খেলোয়াড় নিয়ে খুব ভালো কানেক্টেড করতে পারেন।’
মাঠের এক কোণে ছোট্ট একটি প্যাভিলিয়ন রয়েছে। যার নাম ক্লাবের সাবেক খেলোয়াড় ডন ওয়ালাটারসের নামে। এর কারণ সম্পর্কে বলেন, ‘এই ক্লাবের সাবেক খেলোয়াড় ডন ১৯৬৫ সালে তার অভিষেক টেস্টে ১৫৫ রান করেছিলেন। পরের টেস্টেও তিনি সেঞ্চুরি করেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৭৫ ম্যাচ খেলেছিলেন। তার কীর্তির জন্যই স্ট্যান্ডটার নাম।’

শতবর্ষী ক্লাব অনেক অর্জন ও ইতিহাসের স্বাক্ষী। ক্লাবের অনেক কিছুই আর নেই বললেন অ্যালন, ‘নব্বই সালের দিকে রাগবির একটি লিগ ম্যাচে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা হয় ৷ এতে ক্লাবের ট্রফি ও অনেক কিছু ভাঙচুর হয়। অনেক ঐতিহাসিক জিনিস নষ্ট হয়েছে। এরপর ৩০ বছরের কিছু স্মারক এই স্ট্যান্ডে রয়েছে। আমাদের ক্লাবের এখন সেই রকম আনুষ্ঠানিক অফিস কার্যালয় নেই।
একটি জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট ক্লাব প্যারামাটা। সেই ক্লাবের মাঠ কত সুন্দর, নেট সুবিধাও দারুণ, এক কোণে কিংবদন্তির নামে স্ট্যান্ড। বাংলাদেশে ক্রিকেট জনপ্রিয় খেলা ও বোর্ডের ফান্ডে হাজার কোটি টাকা থাকলেও এমন সংস্কৃতি ও ব্যবস্থা এখনো গড়ে উঠেনি।
এজেড/এফএইচএম