ঋতুপর্ণায় মুগ্ধতা, নড়বড়ে ডিফেন্স ও পরিকল্পনা-সমন্বয়হীনতা

৪৬ বছর পর আবারও এশিয়ার ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলল বাংলাদেশ। ঋতুপর্ণাদের প্রথম এশিয়ান কাপ নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা ছিল তুঙ্গে। ১২ দলের এশিয়া কাপে আট দল সুযোগ পাবে কোয়ার্টারে। ওই আট দলের ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিক বাছাই, ২০২৭ সালের ফিফা বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ থাকবে। বাংলাদেশের এই সকল সম্ভাবনার পরিসমাপ্তি ঘটেছে উজবেকিস্তানের কাছে গতকাল পার্থে ০-৪ গোলে হেরে। বাংলাদেশকে হারিয়ে এখন উজবেকিস্তান বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের দৌড়ে রয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ঐ সময় ফিফা র্যাংকিংয়ে ৫৫ নম্বর র্যাংকিংয়ে থাকা মিয়ানমারকে মিয়ানমারের মাটিতে হারিয়ে এশিয়া কাপ খেলা নিশ্চিত করে। এর মাস দু’য়েক পর এশিয়া কাপের ড্র হয়। সেখানে বাংলাদেশ শক্তিশালী চীন ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পড়লেও গ্রুপে উজবেকিস্তানকে পায়। উজবেকিস্তান এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে নেপালের বিপক্ষে ড্র করে টাইব্রেকারে মূল পর্বে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপালকে হারিয়ে ২০২২ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
মিয়ানমারকে হারানো বাংলাদেশ উজবেকিস্তানকে হারানোর সামর্থ্য রাখে। উজবেকিস্তানকে হারালে এশিয়া কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা, বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক খেলার হাতছানি ছিল। একটি ম্যাচে এত গুরুত্ব থাকলেও বাংলাদেশ দল ও ফেডারেশনকে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে তেমন পরিকল্পনা করতে দেখা যায়নি। উজবেকিস্তান র্যাংকিং, ইতিহাস, শারীরিক সামর্থ্য ও টেকনিকে বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকলেও ৪ গোলে অন্তত হারতে হতো না।
বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ছিল ডিফেন্স। তিন ম্যাচেই কোচ পিটার বাটলার একাদশে ডিফেন্সে পরিবর্তন এনেছেন। চার কিংবা পাঁচ জন নিয়মিত ডিফেন্ডারের ওপর তিনি ভরসা রাখতে পারেননি। এজন্য তিন ম্যাচেই একাদশে ডিফেন্ডার রদবদল করতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচ অ্যালেক্স ফার্গুসনের একটি উক্তি জগৎ বিখ্যাত,‘স্ট্রাইকাররা ম্যাচ জেতাবে, চ্যাম্পিয়ন হতে ভালো ডিফেন্ডার লাগবে’। ফার্গুসনের সেই উক্তি অনেকটা বাংলাদেশ দলের জন্য প্রযোজ্য। এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ছিল ডিফেন্স। তিন ম্যাচেই কোচ পিটার বাটলার একাদশে ডিফেন্সে পরিবর্তন এনেছেন। চার কিংবা পাঁচ জন নিয়মিত ডিফেন্ডারের ওপর তিনি ভরসা রাখতে পারেননি। এজন্য তিন ম্যাচেই একাদশে ডিফেন্ডার রদবদল করতে বাধ্য হয়েছেন।

তিন ম্যাচেই ডিফেন্সের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক আফিদা খন্দকার। উত্তর কোরিয়ার ম্যাচে অধিনায়কের ভুলেই বাংলাদেশ দুটি গোল হজম করেছে। গতকাল উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ডিফেন্সের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে ক্রমশ। নবীরনের মতো তরুণের ওপর প্রথম ম্যাচে আস্থা রাখলেও পরবর্তীতে আবার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন বাটলার।
জাতীয় দলের পরীক্ষিত ডিফেন্ডার ছিলেন মাসুরা পারভীন। ২০২৪ সালে কাঠমান্ডু সাফের পর থেকে কোচের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে তার। সম্প্রতি ফুটসাল চ্যাম্পিয়ন ও ভুটান লিগে দারুণ পারফরম্যান্স করার পরও কোচ তাকে ডিফেন্সের জন্য প্রয়োজন মনে করেনি। মিডিয়া ও ফুটবলসংশ্লিষ্ট অনেকেই ডিফেন্সের ঘাটতি অনুভব করে মাসুরার বিষয়টি বললেও কোচ বরাবরই এড়িয়ে গেছেন। শুধু মাসুরা নন সাবিনা, কৃষ্ণার মতো অভিজ্ঞ এবং স্কিলফুল খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলার জন্য কোচ বিবেচনায় আনেননি। ফুটবল বা টেকনিক্যাল বিষয়ের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত ইগোর ব্যাপারটি বড় হয়ে দাঁড়ায় শেষ পর্যন্ত।
সাবিনা, মাসুরার মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারকে ক্যাম্পে ডেকে পরখ করার প্রয়োজন মনে করেননি বাটলার। অথচ সুইডিশ প্রবাসী আনিকাকে নিজে অনুশীলন না করিয়ে মূল স্কোয়াডে রেখেছেন। দুই সপ্তাহ অনুশীলন করিয়ে এশিয়া কাপের তিন ম্যাচেই খেলিয়েছেন। যদিও কোনো ম্যাচেই পারফরম্যান্স চোখে পড়ার মত ছিল না।
জাতীয় দলের পরীক্ষিত ডিফেন্ডার ছিলেন মাসুরা পারভীন। ২০২৪ সালে কাঠমান্ডু সাফের পর থেকে কোচের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে তার। সম্প্রতি ফুটসাল চ্যাম্পিয়ন ও ভুটান লিগে দারুণ পারফরম্যান্স করার পরও কোচ তাকে ডিফেন্সের জন্য প্রয়োজন মনে করেনি। শুধু মাসুরা নন সাবিনা, কৃষ্ণার মতো অভিজ্ঞ এবং স্কিলফুল খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলার জন্য কোচ বিবেচনায় আনেননি। ফুটবল বা টেকনিক্যাল বিষয়ের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত ইগোর ব্যাপারটি বড় হয়ে দাঁড়ায় শেষ পর্যন্ত।
এশিয়া কাপের মতো আসরে খেলতে হলে যে পরিকল্পনা দরকার সেটা বাংলাদেশের বাস্তবিকভাবেই ছিল না। প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল অনেক। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ মাত্র চারটি ম্যাচ খেলেছে। থাইল্যান্ডে দুটি আর ঢাকায় মালয়েশিয়া ও আজারবাইজানের বিপক্ষে। বাফুফে নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ ও ফাহাদ করিম একেক সময় একক কথা বললেও বাস্তবায়ন হয়নি অনেক কিছুই। জাপান, নিউজিল্যান্ড নানা জায়গায় ক্যাম্প, অনুশীলনের কথা বলে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া এসেছে টুর্নামেন্টের দশ দিন আগে। কোচ বাটলারের পরামর্শে সব হচ্ছে ফেডারেশন কর্তারা এটা বললেও কোচ সেটা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আবার কোচ বাটলারও অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেননি তাদের এমন ভাষ্যও পাওয়া যায়।
ডিসেম্বরে সাফ ক্লাব চ্যাম্পিয়নশীপে জাতীয় দলের ফুটবলাররা নাসরিনের হয়ে খেলতে চেয়েছিল। কোচ বাটলারের কারণে সেটা হয়নি। সাফে ভারত, নেপাল ও অন্য দেশের ফুটবলারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে না দিলেও সপ্তাহ তিনেক পর ঘরোয়া লিগে ঠিকই সায় দিয়েছেন বাটলার। ঐ লিগ আয়োজনে ফেডারেশন কর্তারাও আগ্রহী ছিলেন আর্থিক সংস্থান থাকায়। মিশন অস্ট্রেলিয়া নামে ইনফিনিক্স স্পন্সর পেলেও ঢাকায় ত্রিদেশীয় সিরিজ আয়োজন ছাড়া আর কিছু করতে দেখা যায়নি। ঘরোয়া লিগ থামিয়ে জাতীয় দলের এশিয়া কাপ প্রস্ততির সময় তিনি নেপালে সাফ অ-১৯ দল নিয়ে যান। সেই সফরের যৌক্তিকতা আদৌ খুঁজে পাওয়া যায় না।

কোচ বাটলারের হাই লাইন ডিফেন্স বরাবরই প্রশ্নের মুখে ছিল। বাংলাদেশের সামর্থ্য ও পারফরম্যান্স অনুযায়ী উজবেকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ ৪ গোল হজমের দল নয় সেটা নিয়ে যখন সমালোচনা হওয়ার কথা সেখানে উল্টো তিনি ম্যাচের পর দায়িত্ব ছাড়ার ইঙ্গিত দেন। যেখানে ফেডারেশনের সঙ্গে তার চুক্তি রয়েছে ২০২৬ সাল পর্যন্ত। এমনকি সামনের মাসেই আরেকটি জুনিয়র এশিয়া কাপ। কোচের এমন মন্তব্য ফুটবলারদের জন্য অবশ্যই মানসিক পীড়াদায়ক। পেশাদারিত্বের বুলি আওড়ানো বাটলার অনেক কর্মকাণ্ডই অপেশাদার।
প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল অনেক। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ মাত্র চারটি ম্যাচ খেলেছে। থাইল্যান্ডে দুটি আর ঢাকায় মালয়েশিয়া ও আজারবাইজানের বিপক্ষে। বাফুফে নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ ও ফাহাদ করিম একেক সময় একক কথা বললেও বাস্তবায়ন হয়নি অনেক কিছুই।
বাটলার বাস্তবিক বিষও তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের ফুটবলারদের অনুশীলনের জন্য ভালো মাঠ নেই। সুযোগ সুবিধার অনেক ঘাটতি। এশিয়ান পর্যায়ে ভালো পারফরম্যান্স করতে হলে সরকার ও ফেডারেশনকে নারী দলের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতেই হবে। চীন, উত্তর কোরিয়া ও উজবেকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশ সব দিক থেকেই পিছিয়ে। এরপরও ফুটবলাররা মাঠে নিজেদের সেরাটা দিয়েছেন। গেম সেন্স, ডেডিকেশন, পাসিং ও ম্যাচ টেম্পারমেন্টে বাংলাদেশ এশিয়া কাপ খেলার যোগ্য সেটা ফুটবলাররা দেখিয়েছেন পুরোপুরি। বিশেষ করে মারিয়া, মনিকা, ঋতুপর্ণা অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছেন। তারা এশিয়ান মানের ফুটবলার সেটা প্রমাণ করেছেন।
বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দল ১৯৮০ সালের পর এশিয়া কাপ খেলতে পারেনি। বাংলাদেশ নারী দলের ক্ষেত্রে যেন পরবর্তী এশিয়া কাপ অনেক বছর অপেক্ষা করতে না হয় এজন্য ফেডারেশনের সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। ঋতুপর্ণারা অভিষেক আসরে তিন ম্যাচ হারলেও মুগ্ধতা ছড়িয়ে সম্ভাবনা সৃষ্টি করে আফসোসে শেষ করেছেন। এজন্য দায় মূলত কোচ-ফেডারেশনের সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনাহীনতা।
এজেড/এফআই