রূপকথার জন্ম দেওয়া জেলে-শহরের ক্লাবটিকে কতটা চেনেন

প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলতে নেমেই জায়ান্ট শিকারে নেমেছে অখ্যাত এক ক্লাব। নরওয়ের বোডো মৎসজীবী বা জেলেদের শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে তাদের নতুন পরিচয় দিয়েছে বোডো/গ্লিমট ক্লাব। ইউরোপসেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায় ৩৬ দলের সঙ্গে যাত্রা শুরু করে তারা শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে। ম্যানচেস্টার সিটি, অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদ ও ইন্টার মিলানকে হারিয়ে রীতিমতো রূপকথার জন্ম দেয় বোডো/গ্লিমট।
চলমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলো শুরু হচ্ছে আজ (মঙ্গলবার) দিবাগত রাত থেকে। দলগুলোর তালিকায় চোখ বুলালে দেখা যায় ইউরোপীয় ফুটবলের ধনী ও ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলো সেখানে জায়গা পেয়েছে– রিয়াল মাদ্রিদ, লিভারপুল, বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ, পিএসজি, ম্যানচেস্টার সিটি…তারই মাঝে অখ্যাত ও ছোট ক্লাব বোডো/গ্লিমটের নামটি আলো ছড়াচ্ছে। উত্তর নরওয়ের প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের একটি মৎস্যশহরের এই সাধারণ ক্লাব ইউরোপের পরাশক্তি ক্লাবগুলোর সঙ্গে লড়াই করার কথা নয়। কিন্তু তারাই চমক দেখিয়ে চলেছে।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বে উঠতে টানা চার জয়ের রেকর্ডে নজর কেড়েছে বোডো/গ্লিমট। ঘরের মাঠে তারা ৩-১ ব্যবধানে হারিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটিকে, এরপর অ্যাওয়ে ম্যাচে ২-১ গোলে জয় পায় অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে। এ ছাড়া প্লে-অফে গত মৌসুমের রানার-আপ ইন্টার মিলানকে হোম ও অ্যাওয়ে দুটিতেই হারিয়ে বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। শেষ ষোলোর প্রথম লেগে আজ তাদের প্রতিপক্ষ পর্তুগালের চ্যাম্পিয়ন স্পোর্টিং সিপি। রূপকথার মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগে যাত্রা চলমান রাখা বোডো/গ্লিমট সম্পর্কে কিছু তথ্য ফুটবলভক্তদের আরও চমকে দিতে পারে।
আর্কটিক সার্কেলের উপর অবস্থিত শহর
নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার উত্তরে আর্কটিক সার্কেলের উপরে অবস্থিত বোডো শহরটি। নরওয়েজিয়ান সাগরের তীরে গড়ে ওঠা বোডো/গ্লিমট চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তরের ক্লাবগুলোর একটি। যেখানে শীতকালে দিনের আলো খুব কম থাকে, কখনও কখনও দিনে সূর্যের আলো পাওয়া যায় এক ঘণ্টারও কম। তাই খেলোয়াড়দের সূর্যালোকের ঘাটতি পূরণে বিশেষ সাপ্লিমেন্ট নিতে হয়।
আবার শীতের সময় এখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা ও বাতাস থাকে। স্পোর্টিং সিপির বিপক্ষে ম্যাচের দিন তাপমাত্রা প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৪ সালে ফুটবলের বাইরে বোডো শহরটি ‘ইউরোপিয়ান ক্যাপিটাল অব কালচার’ হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছিল।
ছোট স্টেডিয়াম ও কৃত্রিম ঘাসের মাঠ
ক্লাবটির হোম গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয় অ্যাস্পমাইরা স্টেডিয়াম, যার দর্শক ধারণক্ষমতা স্রেফ ৮ হাজারের মতো। তবে শহরের উপকণ্ঠে নতুন ১০ হাজার আসনের আর্কটিক অ্যারেনার নির্মাণ চলছে, সেটিও তুলনামূলকভাবে ছোট। অ্যাস্পমাইরা স্টেডিয়ামের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এখানে প্রাকৃতিক ঘাসের বদলে কৃত্রিম ঘাসের মাঠ রয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে– কৃত্রিম ঘাসে বলের গতি ও বাউন্স কিছুটা ভিন্ন হয়। তবে উয়েফা তাদের প্রতিযোগিতায় সেমিফাইনাল পর্যন্ত কৃত্রিম মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
ক্লাবের ভাগ্য বদলে দেন একজন যুদ্ধজয়ী পাইলট
বোডো/গ্লিমট ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও নরওয়ের লিগে তারা চ্যাম্পিয়ন হতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় লেগেছে। ২০১৭ সালে ক্লাবের ব্যাকরুম স্টাফে মানসিক প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন সাবেক ফাইটার পাইলট বর্ন ম্যানসভার্ক। লিবিয়ায় বোমা হামলা মিশনের আগে তার স্কোয়াড্রনের জন্য যে মানসিক প্রস্তুতির কৌশল তিনি তৈরি করেছিলেন, সেটিই তিনি ফুটবল দলে প্রয়োগ করেন। তার কৌশলে খেলোয়াড়রা নিজেদের অনুভূতি খোলামেলা প্রকাশ, প্রস্তুতি ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা এবং মানসিক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বুঝতে পারে।
এ ছাড়া কোচ কেজেটিল নুটসেনের নেতৃত্বে বোডো/গ্লিমট ওই পদ্ধতি পুরোপুরি গ্রহণ করে। উদাহরণস্বরূপ– যেমন দলে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অধিনায়ক নির্বাচন বা গোল হজম করার পর সবাই মিলে আলোচনা করে একতা বজায় রাখা। দ্রুত সময়েই এর ফল মিলতে শুরু করে। ২০২০ সালে বোডো/গ্লিমট প্রথমবার নরওয়েজিয়ান লিগ জেতে এবং পরবর্তী পাঁচ মৌসুমের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয় তিনবার। গত মৌসুমে তারা রানার-আপ হয়। ইউরোপীয় মঞ্চেও সাফল্য আসে– গত মৌসুমে ইউরোপা লিগ সেমিফাইনালে উঠে শেষ পর্যন্ত টটেনহ্যামের কাছে হেরে যায়। এরপর প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও জায়গা পায় বোডো/গ্লিমট।
তারকাবিহীন দল
সাধারণত ইউরোপের নামকরা ক্লাবগুলোর পেছনে কাড়ি কাড়ি বিনিয়োগ করেন ধনকুবেররা। তবে বোডো/গ্লিমট কোনো ধনী বিনিয়োগকারী বা মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেরের অর্থে পরিচালিত ক্লাব নয়। তাই তুলনামূলক কম পরিচিত নরওয়ে ও ডেনমার্কের খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত দলটি। সম্প্রতি নরওয়ে জাতীয় দলে এই ক্লাব থেকে মাত্র দু’জন খেলোয়াড় ডাক পেয়েছেন। দলের প্রধান স্ট্রাইকার ২৫ বছর বয়সী ডেনিশ ফরোয়ার্ড কাসপার হগ, যদিও এখনও ডেনমার্ক জাতীয় দলে তার অভিষেক হয়নি। আক্রমণভাগের আরেক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় জেন্স পিটার হগ, ২০২০ সালে তিনি এসি মিলানে যোগ দিলেও ব্যর্থ হয়ে ২০২৪ সালে আবার বোডো/গ্লিমটে ফিরে আসেন।
তবে কোচ নুটসেনের অধীনে বোডো/গ্লিমট শুধু রক্ষণাত্মক নয়, বরং দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেই বড় দলগুলোকে চমকে দিচ্ছে। অ্যাস্পমাইরা স্টেডিয়ামে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষেও তারা দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখায়।
আয় বাড়ছে, কিন্তু ইউরোপের বড় ক্লাবের তুলনায় অনেক পিছিয়ে
২০১৭ সালে বোডো/গ্লিমটের কর্মচারী ছিল প্রায় ৪০ জন এবং বাজেট ছিল মাত্র ৪.২ মিলিয়ন ইউরো। গত বছর তাদের আয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮০ মিলিয়ন ইউরোতে, এরমধ্যে ইউরোপা লিগ থেকে ২৬ মিলিয়ন ইউরোর বেশি এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সবচেয়ে সফল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ ২০২৫ সালে আয় করেছে ১ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি। ২০২৬ সালের জন্য বোডো/গ্লিমট প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউরোর বাজেট পরিকল্পনা করেছে, তবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে যত দূর এগোবে আয়ও তত বাড়বে।
চলমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আরও বড় ইতিহাস গড়ার সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে বোডো/গ্লিমটের সামনে। যদি তারা স্পোর্টিংকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে, তবে তাদের প্রতিপক্ষ হবে প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ দল আর্সেনাল অথবা ২০২৩-২৪ মৌসুমের জার্মান চ্যাম্পিয়ন বায়ার লেভারকুসেন।
এএইচএস