ভারতের ছোট এই একাডেমিতে যেভাবে দামি ক্রিকেটার তৈরি হয়

ভারতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আইপিএলে এবার অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা ক্রিকেটারদের মধ্যে আছেন– উইকেটরক্ষক ব্যাটার মুকুল চৌধুরী, কার্তিক শর্মা এবং পেসার অশোক শর্মা। এর মধ্যে ১৯ বছরের কার্তিককে ১৪.২ কোটি রুপিতে চেন্নাই সুপার কিংস কিনে নেওয়ার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এ ছাড়া ২১ বছর বয়সী মুকুল ২.২ কোটি রুপিতে লখনৌ সুপার জায়ান্টসে যোগ দিয়েছেন। সবমিলিয়ে চার ক্রিকেটারই উঠে এসেছেন ভারতের ছোট একটি ক্রিকেট একাডেমি থেকে।
বিজ্ঞাপন
মুকুল-কার্তিক ও অশোক ছাড়া আকাশ সিং ইতোমধ্যে আইপিএলে ১০টি ম্যাচ খেলেছেন। রাজস্থানের জয়পুর শহরের উপকণ্ঠে একটি স্কুলের ছোট মাঠে গড়ে ওঠা ‘আরাবালি ক্রিকেট একাডেমি’তে বেড়ে উঠেছেন এসব ক্রিকেটার। ২০১২ সালে রাজস্থানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার বিবেক যাদব রঞ্জি ট্রফি জয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন, সুযোগ পেয়েছিলেন আইপিএলেও। তবে এর বেশি আগানো হয়নি। কিডনি ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, করোনা সংক্রান্ত জটিলতায় মারা যান বিবেক। যদিও দেখে যেতে পারেননি তার গড়ে তোলা একাডেমি থেকে আইপিএলে ক্রিকেটার ডাক পাওয়ার দৃশ্য।
বিবেক যাদব মূলত নাম কামিয়েছেন কোচ হিসেবে। তার প্রতিষ্ঠিত ‘আরাবালি ক্রিকেট একাডেমি’ রাজ্যের অন্যতম সেরা ক্রিকেট প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে আইপিএলে ডাক পাওয়া ক্রিকেটারদের তেমন প্রথম শ্রেণি, ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ কিংবা ‘এ’ দলেও খেলার অভিজ্ঞতা নেই। ফলে তাদের বড় মঞ্চে সুযোগ পাওয়ার কৃতিত্ব আরাবালি একাডেমিরই। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে বিবেকের ভাই বিকাশ বলেন, ‘ভাই প্রতিভা চিহ্নিত করতে খুবই দক্ষ ছিলেন। কারও মধ্যে কিছু দেখলে শেষ পর্যন্ত তাকে সমর্থন দিতেন, কখনও কখনও প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। তারা নির্বাচিত হয়েছে দেখে তিনি অবাক হতেন না, কিন্তু খুব খুশি হতেন। যেমন হয়েছিলেন আকাশের চুক্তির সময়।’
বিজ্ঞাপন
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় ক্রিকেটের পরিবর্তিত ধারাকে দ্রুত বুঝে নিজেদের পদ্ধতি গড়ে তুলেছে আরাবালি একাডেমি। আইপিএল ঐতিহ্যগতভাবে ক্রিকেটারদের উঠে আসার পথ বদলে দিয়েছে। এখন আর শুধু অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে পারফরম্যান্স বা ঘরোয়া ক্রিকেটের রেকর্ড নয়, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো রাজ্য পর্যায়ের লিগ, প্রতিযোগিতা এবং শীর্ষ একাডেমিগুলোর ওপরও নজর রাখছে। যেমন অশোক শর্মা রাজস্থান রয়্যালসের নেট বোলার হিসেবে ডাক পেয়েছিলেন, সেখানেই কলকাতা নাইট রাইডার্সের তৎকালীন সহকারী কোচ (বর্তমানে প্রধান কোচ) অভিষেক নায়ারের নজরে পড়েন এবং ২০২২ আসরে সুযোগ পেয়ে যান।
আরাবালি শুরু থেকেই খেলোয়াড় তৈরি করেছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের চাহিদা অনুযায়ী। বিকাশের মতে– তার ভাই (বিবেক) বিশ্বাস করতেন, স্থানীয় টুর্নামেন্ট জেতা দীর্ঘমেয়াদে বড় সাফল্য এনে দেয় না। তখনই আসল স্বীকৃতি আসবে, যখন খেলোয়াড়রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। অশোক শর্মা তাদের একাডেমিতে যোগ দেন ১৫ বছর বয়সে। তার লাইন-লেন্থের ধারাবাহিকতা দেখে কোচরা যত দ্রুত সম্ভব পেস বাড়ানোর ওপর জোর দেন। লম্বা গড়নের মুকুলের মধ্যে ‘পিঞ্চ হিটার’ হওয়ার সম্ভাবনা দেখে বড় শট খেলারও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অন্যদিকে কার্তিকের ক্ষেত্রে ছিল ভিন্ন পরিকল্পনা, তার স্বাভাবিক টাইমিং ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ‘রেঞ্জ হিটিং’–এ দক্ষ করে তোলা হয়।

বিজ্ঞাপন
একাডেমির প্রধান কোচ জগসিমরন সিং বলেন, ‘কখনও কখনও সে (কার্তিক) দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ বল পর্যন্ত মারার অনুশীলন করে। পেস, স্পিন, মেশিন– সবরকম আক্রমণের বিপক্ষে। লক্ষ্য একটাই– যত বেশি সম্ভব ছক্কা মারা।’ আরাবালির আরেকটি বড় শক্তি ছিল শুরু থেকেই এখানে আবাসিক ব্যবস্থা চালু আছে, যা রাজস্থানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের আকর্ষণ করেছে। মুকুল ঝুনঝুনু থেকে, কার্তিক ভরতপুর থেকে, আর অশোকের পরিবার থেকেও এসেছে বড় ত্যাগের গল্প।
বিকাশ বলেন, ‘ওদের সবার একটা মিল আছে। তারা সাধারণ, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে। পরিবারের ত্যাগ না থাকলে তারা আমাদের নজরেই আসত না। তাদের জন্য এই চুক্তির অঙ্ক সত্যিই বড় কিছু।’
এএইচএস