বিজ্ঞাপন

স্বর্ণজয়ী ভারত্তোলক ডোপ টেস্টে পজিটিভ

মাবিয়ার অজ্ঞতা নাকি ক্রীড়া চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা

অ+
অ-
মাবিয়ার অজ্ঞতা নাকি ক্রীড়া চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা

ডোপ টেস্ট ক্রীড়াঙ্গনে বহুল প্রচলিত টার্ম। বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াবিদ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডোপ টেস্টে কখনো পজিটিভ হননি। স্বর্ণজয়ী ভারত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হওয়ায় ক্রীড়াঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। 

বিজ্ঞাপন

টেস্ট প্রক্রিয়া ও ফলাফল সম্পূর্ণ নির্ভুল

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সুপরিচিত দুই চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরী ও ইমরানুর রহমান। তারা দুই যুগের বেশি সময় ক্রীড়াঙ্গনে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। স্পোর্টস মেডিসিনের অধ্যাপক ইমরানুর রহমান টেস্ট প্রক্রিয়া ও ফলাফল সম্পর্কে বলেন,‘এটা একেবারে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া হয়। এক সঙ্গে দু’টি স্যাম্পল নেওয়া হয়। একটি পজিটিভ হলে আরেকটি স্যাম্পল পরীক্ষা করা হয়। বিশ্বজুড়ে ওয়াডার সার্টিফাইড ল্যাব রয়েছে ২০ টির বেশি। সেখানে এগুলো পরীক্ষা হয়, ফলে নমুনা; ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই।’
ইমরানের সঙ্গে একইমত পোষণ করে বিসিবির চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরী বলেন,‘ওয়াডার ডোপ টেস্ট খুবই বিশ্বাসযোগ্য। তাদের প্রতিটি প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ।’

ঘরোয়া ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন একজন

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে আইসিসি ক্রিকেটারদের ডোপ টেস্ট পরীক্ষা করে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও নিয়মিত ডোপিং করে। জাতীয় ক্রিকেট লিগে একজন ডোপ টেস্টে পজিটিভও হয়েছিলেন। বিসিবির চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরী বলেন,‘বিপিএল, এনসিএল অধিকতর গ্রহণযোগ্য করতে আমরা নিয়মিত ডোপ টেস্ট করি। কোনো বছর ১০ জন আবার কখনো ২০ জনও। অনীক নামের এক ক্রিকেটার ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়েছিল জাতীয় ক্রিকেট লিগে। ওয়াডা থেকেই সেই খেলোয়াড়ের শাস্তি হয়েছিল।’ 

বিপিএল ও জাতীয় ক্রিকেট লিগে ডোপ টেস্ট হলেও ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে এখনো হয়নি। একটি পরীক্ষা বেশ ব্যয়বহুল বলে জানান দেবাশীষ, ‘একটি পরীক্ষার জন্য ৬০০-৭০০ ডলারের মতো ব্যয় হয়। বিসিবি’র সামর্থ্য থাকায় হয়তো প্রতি বছর এটি করা হচ্ছে। খেলোয়াড়দের সচেতনতা ও খেলার মান বজায় রাখতে।’

অন্য খেলায় তুলনামূলক টেস্ট কম

বিজ্ঞাপন

স্প্রিন্ট, ভারত্তোলন, সুইমিং এই জাতীয় খেলাগুলোতে মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডোপ টেস্টের পজিটিভের ঘটনা বেশি ঘটে। বাংলাদেশে অবশ্য এই জাতীয় খেলায় টেস্টের পরিমাণ খুব কম। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন এন্টি ডোপিং নিয়ে কাজ করছেন চিকিৎসক শফিকুর রহমান। তিনি ঘরোয়া পর্যায়ে ডোপিং নিয়ে বলেন,‘এটি ব্যয়বহুল হওয়ায় সব সময় সব খেলায় করা যায় না। অলিম্পিকের অধীনে বাংলাদেশ গেমস-যুব গেমসে এটি করা হয়। অন্য ফেডারেশনের খেলাগুলোতেও মাঝে মধ্যে করা হয় যখন ফান্ডিং থাকে আবার বছরে রেন্ডমলিও হয় মাঝে মধ্যে।’

বাংলাদেশ গেমস ও যুব গেমস দুই থেকে চার বছর পরপর হয়। ২০০২ সালের পর মাঝে ১১ বছর বাংলাদেশ গেমস হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ঘরোয়া পর্যায়ে ডোপ টেস্ট সেভাবে অনুপস্থিতই ছিল। 

‘অলিম্পিক ও খেলোয়াড়ের মধ্যে দূরত্ব’

সাবেক জাতীয় বক্সিং চ্যাম্পিয়ন সুর কৃষ্ণ চাকমা। তিনি সাফ, কমনওয়েলথ একাধিক গেমসে খেলেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তার মনে হয়েছে অলিম্পিক এসোসিয়েশন ও খেলোয়াড়দের মধ্যে খানিকটা দূরত্ব রয়েছে। তিনি বলেন,‘প্রতি গেমসের আগে একটা ক্লাস হয় ডোপিং নিয়ে। সেই ক্লাসে বিভিন্ন ধারণা ও তথ্য দেওয়া হয় কিন্তু সেটাই যথার্থ নয়।’ সেটা যথার্থ কেন নয় সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি,‘ক্রিকেট ছাড়া অন্য কোনো ফেডারেশনে স্থায়ী চিকিৎসক নেই। একজন খেলোয়াড় অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। অলিম্পিকের চিকিৎসকরা কখনো আমাকে জিজ্ঞেস করেনি কি ওষুধ খাচ্ছি বা কি অবস্থা। শীর্ষ পর্যায়ের অ্যাথলেটদের অবশ্যই অলিম্পিকের চিকিৎসকের তত্ত্বাবধায়নে রাখা উচিত। গেমসের এক মাস আগে সেমিনার যথেষ্ট নয়।’

 স্বর্ণজয়ী ভারত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হওয়ায় ক্রীড়াঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা।

‘দায়’ অ্যাথলেটেরও

ভারত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত শারীরিক অসুস্থতার জন্য অর্থোপেডিক্সের চিকিৎসক দেখিয়েছিলেন। সেই চিকিৎসকের পরামর্শক্রমেই তিনি ওষুধ সেবন করেছিলেন। সেই ওষুধ তিনি সেবন করতে পারবেন কি না সেটা অলিম্পিকের চিকিৎসককে জানিয়েছেন কি না কিংবা অলিম্পিকের চিকিৎসক সেটা জেনেছেন কি না এই নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে। এখানে পরস্পর বিরোধী কথা এবং ক্রীড়াঙ্গনের ক্রীড়া চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও ডোপ টেস্টে পজিটিভ সেটা প্রমাণিত। অ্যাথলেটের শরীরে এটি পাওয়ায় তাকে এই দায় নিতেই হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন খেলায় তিনি জানবেন না সেটা তেমন গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছেন অনেকে।

ওয়াডা ওষুধের তালিকা কি অ্যাথলেটরা জানেন?

ওয়ার্ল্ড এন্টি ডোপিং এজেন্সি (ওয়াডা) প্রতি বছর জানুয়ারিতে ওষুধের তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকা সম্পর্কে বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের ধারণা কমই। এ নিয়ে সুর কৃষ্ণ চাকমা বলেন,‘ওয়াডা একটা অ্যাপ রয়েছে সেখানে ওষুধের তালিকা ও বিবরণ থাকে। এই অ্যাপ অনেকেই জানে না আবার জানলেও সেভাবে ব্যবহার করে না।’ 
ওষুধের পাশাপাশি খাবারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের মাধ্যমেও অনেক সময় ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার ঘটনা ঘটে। খাবার নিয়ে খানিকটা অনুযোগ করে সুর কৃষ্ণ বলেন,‘অ্যাথলেটদের অনেক পরিশ্রম হয়। সেই ঘাটতি পূরণের জন্য সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন। সেই সাপ্লিমেন্ট অনেকগুলো ওয়াডা অনুমোদিত হলেও আমাদের অনেক অ্যাথলেট ভয়ে সেগুলো খায় না। ফলে শরীরে ঘাটতি থেকে যায় এবং পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ে। 

অলিম্পিক খতিয়ে দেখবে কি 

মাবিয়ার নিষিদ্ধ ঘোষণা পুরো ক্রীড়াঙ্গন কাঁপিয়ে দিয়েছে। মাবিয়া ডোপ টেস্ট পজিটিভ কিন্তু কেন হলো সেটা কি খতিয়ে দেখবে অলিম্পিক এসোসিয়েশন। অলিম্পিকের মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানা সামনে আরো বেশি গুরুত্ব ও সচেতনতার কথা বলেছেন তবে মাবিয়ার চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করে বিষয়টি আরো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। ক্রিকেট ছাড়া অন্য কোনো ফেডারেশনে স্থায়ী চিকিৎসক নেই। ফুটবল বাদে অন্য ফেডারেশনের সেই সামর্থ্যও নেই। অলিম্পিক এসোসিয়েশনের সেই সামর্থ্য এবং ওয়াডার সঙ্গে আইওসির চুক্তি থাকায় তাই অলিম্পিকের দায়িত্ব অনেকটা বেশি। 

ডোপ কেন বড় শাস্তি

খেলাধুলা শৃঙ্খলা শেখায়। সেই শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা পরিপন্থী ডোপ। শক্তিবর্ধক ওষুধ বা খাবার গ্রহণের মাধ্যমে শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এতে অন্য অ্যাথলেটের চেয়ে নিজেকে এগিয়ে রাখার সুযোগ থাকে। যা খেলার স্পিরিট পরিপন্থী। এজন্য ডোপ টেস্ট পজিটিভধারীদের শাস্তি দিয়ে ক্রীড়াঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয় যেন অন্যরা এ রকম পথে না হাঁটে। 

ডোপ টেস্টে পজিটিভ হলে সেই খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক তো নয়ই ঘরোয়া খেলাও খেলতে পারেন না। এক কথায় বলতে ক্রীড়াঙ্গন থেকে অনেকটা নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে হয়। এত কঠিন সাজা দেওয়ার নেপথ্যে যেন কোনো ক্রীড়াবিদ এ পথে না হাটে। 

খেলাধুলা শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার বিষয়। ডোপ শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা পরিপন্থী। শক্তিবর্ধক ওষুধ বা খাবার গ্রহণের মাধ্যমে শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন যা অন্য অ্যাথলেটদের চেয়ে এগিয়ে রাখে। খেলার স্পিরিট বজায় রাখতে ওয়াডা এন্টি ডোপিং কর্মসূচি চালায়। এরপরও পদকের লোভে বা কখনো অজ্ঞাত কারণে খেলোয়াড়েরা এই অপরাধে জড়ায়। 

এজেড/এফআই