কদিন আগেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ। বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে সভাপতি করে নতুন ১১ সদস্যের অ্যাড-হক কমিটি গঠন করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)।
নবগঠিত অ্যাড-হক কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য হিসেবে আছেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। উইমেন্স উইং, মেডিকেল এন্ড কপ্লেইন কমিটির দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। বিসিবিতে অন্তর্ভুক্তি, নির্বাচন ও ক্রিকেটের ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি ঢাকা পোস্টের ক্রীড়া প্রতিবেদক সাকিব শাওনের মুখোমুখি হয়েছেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম।
ঢাকা পোস্ট : আইন পেশায় আপনি প্রতিষ্ঠিত নাম। এর মধ্যে বিসিবিতে যুক্ত হলেন। অ্যাড-হক কমিটিতে আপনিসহ আরও বেশ কয়েকজনের অর্ন্তভুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টা কিভাবে দেখছেন?
রাশনা ইমাম: দেখুন, আলোচনা বা সমালোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক কারণ প্রেক্ষাপটটা আপনার দেখতে হবে। কোন প্রেক্ষাপটে আমাদের নিয়োগটা হয়েছে। যে বোর্ড ছিল তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়েছিল এবং অনিয়ম পাওয়ায় বিলুপ্ত করা হয়েছে। ন্যাশনাল স্পোর্টসের ক্ষমতাবলে অনিয়ম পাওয়া গেলে যে কোনো বোর্ডকেই বিলুপ্ত করা যাবে।
সে কারণেই বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং এই অ্যাড-হক কমিটিটা গঠন করে আমাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রেক্ষাপট যখন এটা হয় তখন কিন্তু নানা ধরনের প্রশ্ন উঠবে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে আগের যে কমিটিটা ছিল তাদের সমর্থক যারা ছিল তাদের তো সমালোচনা করাটাই স্বাভাবিক। এটাকে আমি ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনোভাবেই দেখছি না। আমি যে দায়িত্বটা গ্রহণ করেছি সেটা যাতে আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে পালন করতে পারি সেখানেই ফোকাস করছি আপাতত।

ঢাকা পোস্ট : ৩ মাসের জন্য প্রাথমিকভাবে কাজের সুযোগ পেলেন, এখানে কতটা চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
রাশনা ইমাম: তিন মাস আপনি যেটা বললেন যে খুবই লিমিটেড সময় এবং পদ্ধতিগত কিছু সমস্যাও আছে। যেমনটা আমি আগেও বলছিলাম যে হয়রানী মুক্ত একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা, বিশেষ করে আমাকে যে দায়িত্বটা দিয়েছে উইমেন্স উইংয়ের সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সিস্টেমিক কিছু প্রবলেম আছে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে ম্যাচগুলো আয়োজন করতে হবে। সুতরাং চ্যালেঞ্জিং এবং তার সাথে আবার নির্বাচন। একটা সুষ্ঠ নির্বাচন দিতে হবে—চ্যালেঞ্জ রয়েছে অবশ্যই। কিন্তু আপাতত আমার যেটা মনে হচ্ছে আমরা তো দু’বার বসেছি বোর্ডে অলরেডি। সবাই কিন্তু কমিটেড এবং সবাই কাজ করছে যাতে এই দায়িত্বগুলো পালন করতে পারি। তাছাড়া একটা নির্বাচিত বোর্ডের হাতে আমরা দায়িত্বটা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারি।
ঢাকা পোস্ট : আরেকটু খোলাসা করে বললে বিসিবির পরের নির্বাচন করার ইচ্ছা রয়েছে কি না?
রাশনা ইমাম: এখনো সে অর্থে চিন্তা করিনি এই বিষয়টা নিয়ে। সুতরাং বলতে পারছি না ভবিষ্যতে কি করব। সময় সবকিছু বলবে আসলে।
ঢাকা পোস্ট : বিসিবিতে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন?
রাশনা ইমাম : আমাদের প্রেসিডেন্ট তামিম ইকবাল আমাকে বলেছেন যে “আপা আপনি স্বাধীনভাবে আপনার যা মনে হয় সেভাবে কাজ করবেন”। এখানে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা বিধিনিষেধ নেই। কোনো সিদ্ধান্ত কারো ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না। এই জিনিসটা আমি অ্যাপ্রিশিয়েট করছি। চেষ্টা করছি আমার নিজের দায়িত্বটা পালনের জন্য।
ঢাকা পোস্ট : এরই মধ্যে কয়েকটি মিটিংয়ে যুক্ত হয়েছেন সব মিলিয়ে কেমন বুঝলেন দায়িত্বটা?
রাশনা ইমাম: নারীর অংশগ্রহণ সর্বক্ষেত্রে বাড়ানোর জন্য কিন্তু আমি অনেক ধরনের অ্যাডভোকেসির সাথে জড়িত ছিলাম। এখন ক্রীড়া স্পেসেও এই কাজটাই করার সুযোগ পেয়েছি যেহেতু নারী বিভাগের দায়িত্বে এসেছি। তারপর ধরেন মেডিকেল ডিপার্টমেন্ট—স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে বহু বছর ধরে আমি জনস্বার্থমূলক মামলা বলেন, অ্যাডভোকেসি ওয়ার্ক বলেন করে যাচ্ছি। সুতরাং মেডিকেল ডিপার্টমেন্টেই ঠিক আমাকে দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছে। আমি যে দায়িত্বগুলো পেয়েছি এগুলো আমার অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে।
আমার এরিয়া অফ ইন্টারেস্ট, আমার এক্সপার্টিজ বলেন দক্ষতা বলেন সবকিছুর সাথেই একটা কানেকশন আছে। বিশেষ করে নারী এবং পুরুষ ক্রিকেটারদের মধ্যে যে ফ্যাসিলিটিস নিয়ে বৈষম্য যে সবসময় আমরা দেখি যে পুরুষ ক্রিকেটাররা প্রাধান্য পায়। যেটা হয়তো একদিনে পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু ছোট ছোট পদক্ষেপ কিন্তু শুরু করা যায়। এই বৈষম্যটা দূরীকরণেও কাজ করতে হবে। এটা হয়তো তিন মাসে আমরা সম্পূর্ণ করতে পারবো না। আগামী নির্বাচিত যে বোর্ড আসবে আশা করি তারা এদিকটাতে দৃষ্টি দেবে। কারণ বৈষম্য দূর না করলে আপনি দীর্ঘ মেয়াদে পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করতে পারেন না। আর আমরা যদি চাই একটা পাইপলাইন ডেভেলপ করতে নারী ক্রিকেটিং ট্যালেন্টের তাহলে তো আমাদের এই ধরনের বৈষম্য সবার আগে অ্যাড্রেস করতে হবে।
ঢাকা পোস্ট : নারী ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন, তারা আপনাকে সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে সেভাবে বলেছে?
রাশনা ইমাম : হ্যাঁ, সবার সাথে বসা হয়েছে। পরিচিত হয়েছি, সবার কথাগুলো শুনেছি। তারা আমাকে সুবিধা বা অসুবিধার কথা জানিয়েছে। এখন আমি চেষ্টা করব সেগুলো নিয়ে কাজ করতে।
ঢাকা পোস্ট : ক্রীড়াঙ্গনে নারী নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ বহু পুরোনো। সম্প্রতি জাহারানা আলমের ইস্যুটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আপনার বিশেষ কোনো ভূমিকা থাকবে কি না?
রাশনা ইমাম: গত বোর্ডকে জাহানারা আলম উনার একটা অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই প্রেক্ষিতে একটা তদন্ত হয়েছিল এবং পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। যে অভিযুক্ত তাকে আমার জানা মতে বিসিবির সব ধরনের কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে অনেকেরই মনে হয়েছে এটা যথেষ্ট ছিল না। এখানে কি আরও কিছু করণীয় আছে কি না, আরও খতিয়ে দেখতে হবে কি না।
তারপর আইনি পদক্ষেপ কি নেওয়া যেত কি না প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে—এটা তো ধরেন একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রশাসনিক ডিসিশন ছিল। আইনি কি কোনো পদক্ষেপ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবি নিতে পারে কি না? এ দিকগুলোতেও তাকাতে চাচ্ছি।

ঢাকা পোস্ট : মহিলা ক্রীড়া সংস্থা রয়েছে। সেখানে সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি?
রাশনা ইমাম : এটা এখনো ভেবে দেখিনি। দেখি সামনে চিন্তা করব। আপাতত যে দায়িত্বে রয়েছি সেটা নিয়ে ভাবছি। তবে যেটা হয় যে লিডারশিপ পজিশনে ধরেন এই সংস্থাগুলোতে ফেডারেশন গুলোতে আপনি যত নারীদের সংখ্যা বাড়াবেন ততই কিন্তু নারী ক্রীড়াবিদের অংশগ্রহণও আপনি বাড়াতে পারবেন। কারণ আমি যেভাবে একজন নারীর সমস্যাগুলো বুঝতে পারব তা হয়তো একজন পুরুষ বুঝে উঠতে পারবে না। এবং আমার যে ইন্টারেস্টটা থাকবে পরিবেশটা বদলানোর জন্য তা হয়তো সবসময় একজন পুরুষের থাকবে না।
ঢাকা পোস্ট : মেডিকেল বিভাগেরও দায়িত্বে আপনি, অনেক ফিজিও ট্রেনারদের বেতন অনেক বছর ধরে বাড়েনি। এটা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেবেন কি না?
রাশনা ইমাম : মেডিকেল ডিপার্টমেন্টের সাথেও বসা হয়েছে এবং উনাদের কিছু সমস্যার কথা আমার সাথে শেয়ার করেছেন। ধরেন মেডিকেল সাপ্লাই যে দরকার হয় এইটা তো একটা প্রসেসের মাধ্যমে আসতে হয়। এই প্রসেসটা আমি শুনলাম যে অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং জটিল—মানে এত সময় লেগে যাচ্ছে এটা পাস হয়ে আসতে যে অনেক সময় দেখা যায় ডিপার্টমেন্টের লোকজন নিজেরা টাকা দিয়ে কিনে ফেলছে পরে বাজেট জমা দিচ্ছে। এখানে আমাদের কাজ করার সুযোগ আছে। এমনভাবে করতে হবে যেন দ্রুত এই বাজেটরি অ্যাপ্রুভালগুলো নেয়া হয়। আর আপনি যেটা বললেন ফিজিও—উনারা তো মেজর স্টেকহোল্ডারস, ফিজিওথেরাপিকে তো কোনোমতে আমরা ছোট করে দেখতে পারি না। এটা তো সরাসরি শারীরিক সুস্থতার এবং ক্রিকেটারদের সক্ষমতার সাথে জড়িত। তো অবশ্যই এদিকে আমরা যতটুকু পারি করব। এরপর আমি প্রত্যাশা করব নির্বাচিত যে বোর্ড আসবে এদিকে নজর দেবে।
ঢাকা পোস্ট : কোনটা চ্যালেঞ্জিং আইন পেশা নাকি ক্রিকেট বোর্ডের দায়িত্ব?
রাশনা ইমাম : আইন পেশায় আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্র্যাকটিশনার। সেখানে ভিন্নরকম চ্যালেঞ্জ। এখানকার (বিসিবি) চ্যালেঞ্জগুলোও আরেক রকম। এখানে যেরকম গভার্নেন্স একটা বড় ইস্যু। আইন পেশায়ও ধরেন আমি অনেক কর্পোরেট বোর্ডে বসেছি। গভার্নেন্স নিয়ে অনেক ধরনের কাজ করা হয়েছে। খুব কমপ্লিমেন্টারি লাগছে তাও মনে হচ্ছে একটু ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ, একই না। তবে এক জায়গায় বেশ ব্যতিক্রম আছে। এখানে হয়তো আলোচনা সমালোচনার সম্মুখীন আরও বেশি হতে হচ্ছে যেহেতু এটা পাবলিক ফেসিং একটা কাজ। সব মিলিয়ে চেষ্টা করছি আমি আমার সর্বোচ্চটা দেওয়ার। বাকিটা দেখা যাক।
এসএইচ/এফআই
